ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা, একটি প্রাণবন্ত মসজিদের অবকাঠামো

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ১১, ২০২০
আবু তালিব মোহাম্মদ মোনাওয়ার
ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা ভুমিকা: পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা উত্তম স্থান মসজিদ। তাই মসজিদ আল্লাহর ঘর হিসেবে বিবেচিত। মসজিদে মুসলিমগণ দ্বীনের মূলভিত্তি সালাত দৈনিক পাঁচ বার আদায় করে থাকে। দ্বীনের মূল ভিত্তি আদায়ের স্থান বিধায় দ্বীনের অন্যান্য কার্যাবলী সম্পাদনেও মসজিদের ভুমিকা প্রাসঙ্গিক ও অনস্বীকার্য। মসজিদের সাথে মুসলমানদের সম্পর্ক অন্যান্য ধর্মাবলস্বীদের সাথে তাদের পুজা-অর্চানার মন্দির-গীর্জার মত নয়;বরং মসজিদের সাথে মুসলিমদের দৈনন্দিন জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি মুসলমানের মিলন মেলা,যেখানে তারা প্রতিদিন পাঁচবার মিলিত হয়ে রবের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক খোঁজ-খবর রাখে এবং ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলে। ফলশ্রুতিতে তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও ভালবাসার আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সমাজে এবং একটি সুশীল সমাজ গড়ে উঠে। মসজিদ নির্মাণের বিনিময়ে পুরস্কার সরূপ রাসূলুল্লাহ (স:) জান্নাতের ঘর নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন। عن ابن عباس من بنى لله مسجدا قدر مفحص قطاة بنى الله له بيتا فى الجنة -أخرجه أحمد، صحيح
অর্থাৎ- ইবনে আব্বাস (রা:) থেকে বর্ণিত,যে ব্যক্তি আল্লাহ সন্তুষ্টির নিমিত্তে পাখির ডিম পাড়ার স্থান পরিমান মসজিদ নির্মাণ করবে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করবেন। (আহমাদ,সহীহ)
মসজিদের পানে যারা যারা ছুটে যায় তাদের জন্য প্রতিটি কদমের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান, মর্যাদা ও গুনাহ মাফের ঘোষনা দিয়েছেন।
عن بريدة أن النبى -صلى الله عليه وسلم- قال من تطهر فى بيته ثم مضى الى بيت من بيوت الله يقضى فريضة من فرائض الله كانت خطواته إحداها تحط خطيئة والأخرى ترفع درجة. -أخرجه مسلم
অর্থাৎ- বুরাইদা (রা:) থেকে বর্ণিত,নিশ্চয় রাসূল (সা:) বলেন: যে ব্যক্তি তার বাড়ীতে পবিত্রতার অর্জন করল অত:পর ফরজ ইবাদত আদায়ের উদ্দেশ্যে আল্লাহর ঘরে (মসজিদে) গেল তার এক কদমের বিনিময়ে গুনাহ মার্জনা হবে এবং অপর কদমের বিনিময়ে মর্যদা বৃদ্ধি পাবে। শুধু তাই নয়;বরং মসজিদে যেতে অভ্যস্ত ব্যক্তিকে ইমানদার হিসেবে সাক্ষ্য দিতেও রাসূল (সা:) নির্দেশ দিয়েছেন।
عن أبي سعيد قال قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- اذا رأيتم الرجل يعتاد المسجد فاشهدوا له بالإيمان قال الله تعالى: ( إنما يعمر مساجد الله من آمن بالله واليوم الآخر -أخرجه الترمذي وأحمد
অর্থাৎ- আবু সাঈদ (রা:) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল (সা:) বলেছেন যখন তোমরা দেখ কোন ব্যক্তি মসজিদে যেতে অভ্যস্ত তখন তার জন্য ইমানের সাক্ষ্য দাও। অত:পর তিনি কুরআনের আয়াতটি তিলাওয়াত করেন:
– إِنَّمَا يَعْمُرُ مَسَاجِدَ اللَّهِ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَلَمْ يَخْشَ إِلَّا اللَّهَ ۖ فَعَسَىٰ أُولَٰئِكَ أَن يَكُونُوا مِنَ الْمُهْتَدِينَ
তারাই হতে পারে আল্লাহর মসজিদের আবাদকারী (রক্ষাণাবেক্ষণকারী ও সেবক) যারা আল্লাহ ও পরকালকে মানে,নামায কায়েম করে,যাকাত দেয় এবং আল্লাহকে ছাড়া আর কাউকে ভয় করেনা। তাদেরই ব্যাপারে আশা করা যেতে পারে যে,তারা সঠিক পথে চলবে।
(সুরা তাওবাহ ১৮) (আহমদ,তিরমিজী)
মসজিদের আবাদ শুধু মাত্র মসজিদ নির্মাণ নয়;বরং মসজিদে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্য যাওয়া,মসজিদে গিয়ে তিলাওয়াত করা ও কুরআন শিক্ষা দেওয়া, মসজিদের দারসে বসা ইত্যাদিও মসজিদ আবাদের মৌলিক উপকরণ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মসজিদের ভুমিকা: ইসলামের প্রাথমিক যুগে সমাজ পরিবর্তনে মসজিদের ভুমিকাই ছিল প্রধান। মসজিদ ছিল একই সাথে দাওয়াতী কাজের প্রাণকেন্দ্র এবং রাষ্ট্রীয় ভবন। দাওয়াতী কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালনা করা হত। বিভিন্ন বিষয়ের পরামর্শ ও সিন্ধান্ত গ্রহণ এখানেই সম্পাদন করা হত। বিভিন্ন দেশ ও এলাকা থেকে আগত প্রতিনিধি ও মেহমানদেরকে রাসূল (সা:) মসজিদেই স্বাগত জানাতেন। সাহাবায়ে কিরামের সাথে মসজিদেই তিনি মিলিত হতেন এবং তাদের শিক্ষাদান করতেন। এক কথায়: মসজিদ ছিল তৎকালীন মুসলিম সমাজের যাবতীয় কাজের কেন্দ্রস্থল। ইসলামী সমাজে মসজিদের ভুমিকা:
একটি মসজিদ ইসলামী সমাজে বিভিন্নভাবে অবদান রাখতে পারে। এ প্রসঙ্গে শায়খ আতিয়্যার উক্তিটি উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘সাত জন ব্যক্তির আরশের ছায়া লাভ’ সম্বলিত হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: “মুসলিম সমাজে কিছু মানুষ (বিশেষতঃ যুবক) আছে যারা আল্লাহর আনুগত্য করে। এ সব যুবকের অন্যতম গুণ হচ্ছে তারা দৈনিক পাঁচবার মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে করতে তাদের হৃদয়টা মসজিদের সাথে মিশে যায়, এ সকল মুসল্লী স্বাভাবতই মসজিদের অভ্যন্তরে পারস্পরিক পরিচিত হয় এবং কখনো কারো অবর্তমানে তার খোঁজ-খবর জানতে অভ্যস্থ হয়। এভাবে বারংবার সাক্ষাৎ ও খোঁজ-খবরের মাধ্যমে তাদের মাঝে এক প্রকার ভালবাসা সৃষ্টি হয় যা শুধু আল্লাহ তা’য়ালার সন্তুষ্টির নিমিত্তেই। মসজিদে জামাতবদ্ধভাবে সালাত আদায় আর মুসল্লীদের পারস্পরিক ভালবাসার একটা ইতিবাচক প্রভাব সমাজে প্রতিফলিত হয়”।
তাদের মধ্যকার ভালবাসার কারণেই সামাজিক কর্মকান্ডে হিংসা-বিদ্বেষ, কলহ ইত্যাদি দূর হয়ে যায়। অনুরূপভাবে ব্যক্তিগত জীবনেও অপরাধ প্রবণতা কমে যায়। কেননা যে রবের নির্দেশ পালনার্থে একজন ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যস্ততাকে এড়িয়ে দৈনিক পাঁচবার মসজিদে যেতে সক্ষম সেই রবের সন্তুষ্টির জন্যই অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা তার অন্তরে জাগ্রত হয়। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন:
إن الصلاة تنهى عن الفحشاء والمنكر
অর্থাৎ- নিশ্চয় সালাত অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। (সুরা আল আনকাবুত ৪৫)
মসজিদে গিয়ে ঈমান নবায়ন, সৎকাজ সম্পাদন এবং অন্য কাজ থেকে বিরত থাকার অনুভুতি ও মানসিকতা পোষণ করার জন্য মসজিদে তা’লীমের আসর থাকা খুবই জরুরী।