ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো জালিয়াতি করে টিআরপি বাড়াচ্ছে?

বিজয় বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১১, ২০২০
ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো জালিয়াতি করে টিআরপি বাড়াচ্ছে?

টিভির পর্দায় চোখ। টিআরপি বাড়ানোর জন্য মরীয়া চ্যানেলগুলো।

টিভির পর্দায় চোখ। টিআরপি বাড়ানোর জন্য মরীয়া চ্যানেলগুলো।
ভারতের টেলিভিশন চ্যানেলগুলির টিআরপি বা টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট জালিয়াতির একটি বড়সড় ঘটনা সামনে এনেছে মুম্বাই পুলিশ।

তারা বলছে, কোনও নির্দিষ্ট চ্যানেল দেখার জন্য দর্শকদের টাকা দেয়া হত।

এই জালিয়াতিতে ইংরেজি খবরের চ্যানেল রিপাবলিক টিভিও আছে বলে পুলিশের দাবী।

চ্যানেলটির প্রধান সম্পাদক অর্ণব গোস্বামী অবশ্য এই জালিয়াতিতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে পুলিশকে ক্ষমা চাইতে বলেছেন।

মুম্বাই পুলিশ বলছে, হানসা নামের যে সংস্থাটি টিভি চ্যানেলগুলির জনপ্রিয়তা মাপার জন্য দর্শকদের বাড়ির টিভি সেটে একটি ছোট যন্ত্র বসিয়ে দেয়, তাদের দায়ের করা অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে এই বড়সড় জালিয়াতি চক্র ধরতে পেরেছে।

দুটি মারাঠি চ্যানেলের কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং রিপাবলিক টিভিকে জেরা করা হবে।

মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনার পরমভির সিং বলছেন, হানসা নামের একটি এজেন্সি, যারা মানুষের বাড়ির টিভি সেটে জনপ্রিয়তা মাপার যন্ত্র বসিয়ে দেয়, তাদের কয়েকজন কর্মী গোপন নথি চ্যানেলগুলির কাছে পাচার করে দিচ্ছিলেন।

ওই সংস্থাটির অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়েই পুলিশ এই জালিয়াতির খোঁজ পেয়েছে।

‘নিরক্ষর ব্যক্তিদের বাড়িতেও চলে ইংরেজি খবরের চ্যানেল’

মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনার পরমভির সিং
ছবির ক্যাপশান,মুম্বাইয়ের পুলিশ কমিশনার পরমভির সিং,

পরমভির সিংয়ের কথায়, “আমরা যখন সেই সব বাড়িতে যোগাযোগ করেন, যাদের তথ্য হানসা সংস্থার প্রাক্তন কর্মীরা পাচার করে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ, ওই সব বাড়ির লোকেরাই জানায় যে টিভি চ্যানেলের প্রতিনিধিরা তাদের প্রতিমাসে প্রায় পাঁচশো টাকা করে দেয় রিপাবলিক টিভি চ্যানেলটি চালিয়ে রাখার জন্য।

‍”অদ্ভুতভাবে এমন বাড়িও আমরা পেয়েছি, যারা হয়ত নিরক্ষর, কিন্তু তাদের বাড়িতেও ইংরেজি খবরের চ্যানেল চলছে – সে তারা বাড়িতে থাকুন বা না থাকুন।”

“অর্থ দিয়ে টিআরপিতে কারসাজি করা হচ্ছিল। এটা স্পষ্টতই বিশ্বাসভঙ্গ এবং ৪২০ ধারা অনুযায়ী জালিয়াতি,” জানাচ্ছিলেন পুলিশ কমিশনার মি. সিং।

যেভাবে টিভি চ্যানেলের জনপ্রিয়তা মাপা হয়

আগে এ সি নিয়েলসন সংস্থা ভারতের টিভি চ্যানেলগুলির জনপ্রিয়তা মাপার কাজ করত। কিন্তু সেই ব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি থাকায় বেশ কিছু বছর ধরে টিভি চ্যানেলগুলি মিলে বিএ আরসি বা বার্ক নামে একটি সংস্থা তৈরি করে, যারা জনপ্রিয়তা পরিমাপ করে।

এই ব্যবস্থায় সারা দেশে প্রায় ৪৪,০০০ মানুষের বাড়িতে টিভির ভেতরে একটি ছোট যন্ত্র – যাকে ‘পিপল মিটার’ বা ‘ব্যারোমিটার’ বলা হয় – সেটি লাগিয়ে দেওয়া হয়। ওই যন্ত্র থেকেই তথ্য পাওয়া যায় যে কোন বাড়িতে কোন চ্যানেল কতক্ষণ ধরে দেখা হচ্ছে।

ভারতের সরকারী প্রসারণ সংস্থা – প্রসার ভারতীর প্রাক্তন প্রধান জহর সরকার বলছিলেন, “সারা দেশে প্রায় লাখ তিনেক পরিবারকে বাছা হয় আর্থ সামাজিক অবস্থানসহ আরও নানা বিষয়ের ওপরে ভিত্তি করে। সেখান থেকে কম্পিউটার বেছে নেয় ৪৪,০০০ বাড়ি – যেখানে ব্যারোমিটার বসানো হবে।

“প্রতিবছর ওই বাড়িগুলির এক তৃতীয়াংশ বদলে ফেলা হয়। ওই বাড়িগুলি কাদের, এটা বার্কের লোকেরাও জানে না। কম্পিউটার-ভিত্তিক ওই তালিকা বেশ কয়েকটি এজেন্সির কাছে যায়। তাদের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মিটার লাগিয়ে দেয়। জালিয়াতিটা এই পর্যায়েই করা হয়েছে মনে হচ্ছে।

“এখন এটা আমি জানি না যে পুলিশ কত বাড়িতে যোগাযোগ করেছিল। সেটা যদি ৫০-১০০ হয়, তাহলে মোট টি আর পি-র ওপরে খুব একটা বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। কিন্তু সংখ্যাটা যদি কয়েক হাজার হয়, তাহলে বিষয়টা নিশ্চই খুব চিন্তার,” মন্তব্য জহর সরকারের।

প্রচারমাধ্যমকে কি মানুষ আর বিশ্বাস করবে?

টিআরপি বা টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট দিয়ে টিভি চ্যানেলের জনপ্রিয়তা মেপেই বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে তুলে ধরা হয়।

যে চ্যানেল বা নির্দিষ্ট চ্যানেলের যে অনুষ্ঠান যত জনপ্রিয়, বিজ্ঞাপনদাতারা সেখানেই টাকা দেন।

মুম্বাই পুলিশ বলছে এই জন্যই জালিয়াতির মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়েছে, সেটাও অপরাধী কার্যকলাপ থেকে প্রাপ্ত অর্থ।

বিজ্ঞাপন দাতারা ছাড়াও সাধারণ মানুষও সেই চ্যানেল বা অনুষ্ঠান দেখতে চান স্বাভাবিকভাবে, যেগুলি জনপ্রিয়।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত অনেকের কাছেই এটা জানা ছিল যে টিআরপিতে কারসাজি করা হয়ে থাকে।

কিন্তু সেটা পুলিশী তদন্তের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে শুধু নির্দিষ্ট কয়েকটি চ্যানেলের নয় – গোটা সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই এখন মানুষ প্রশ্ন তুলতে পারেন বলে মন্তব্য করছিলেন ঢেঙ্কানলের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ মাস কমিনিউকেশনসের সহকারী অধ্যাপক সম্বিৎ পাল।

তার কথায়, “এই ঘটনার দুটো দিক আছে। এক তো টিআরপি-তে জালিয়াতি করা হলে সেটা সরাসরি বিজ্ঞাপনদাতাদের ওপরে প্রভাব ফেলবে। তারা অ্যাড দিতে চাইবে না।

“আর সাধারণ মানুষ তো সামাজিক মাধ্যম এবং ডিজিটাল মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তের পরে এমনিতেই বলে যে মূলধারার গণমাধ্যমে সবসময়ে সত্যি খবর দেখানো হয় না। এখন তাদের সেই সন্দেহটা আরও বাড়বে।

“তারা একটা সন্দেহ করার সুযোগ পেয়ে গেল যে টিভি চ্যানেলগুলো নিজেদের জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেই যদি সত্য কথা না বলে, তাহলে তারা যে অন্যান্য খবরের ক্ষেত্রে সত্যি কথা বলছে, তার প্রমাণ কি?” বলছিলেন মি. পাল।