মুর্শিদের সহবতের টানে একদিন: সৈয়দ মবনু

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১২, ২০২০
মুর্শিদের সহবতের টানে একদিন: সৈয়দ মবনু

বিজয়বাংলা অনলাইন;
আত্মায় আত্মা টানে কিংবা আত্মার বিচ্ছেদে হয় আত্মা নিঃসঙ্গ। তাই মাঝেমধ্যে নিজকে একেবারে বন্ধুশূন্য মনে হয়। মনে হয় পালক হলে আকাশে উড়ে যেতাম। বাংলাদেশের পথে-প্রন্তরে ঘুরে ঘুরে প্রিয়জনদেরকে দেখে আসতাম। পালক নেই বলে মাঝেমধ্যে নিজকে খুব বন্ধি মনে হয়। মনে হয় আত্মাটি আটকে আছে মাটির পিঞ্জিরায়। মুক্তির চেষ্টা করি, পথ খুঁজি। মুক্তির সন্ধ্যানে বড়-ছোট অনেক মানুষের কাছে যাই। যেভাবে যে বলে সেইভাবে মুক্তির জন্য সাধনা করি। মাঝেমধ্যে আউল-বাউলও হই। তবু মুক্তি লাভ হয় না। মাঝেমধ্যে মনে হয় মানুষ কোনদিন পূর্ণাঙ্গ মুক্তি লাভ করতে পারে না। তবু মানুষ মুক্তির জন্য তরপাতে থাকে। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে কিছু থামলেই নিজকে নিঃসঙ্গ লাগে, খুব একা মনে হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বয়স আমার উনপঞ্চাশের ঘরে। একদিন অতিক্রম করলেই হয়ে যাবে পঞ্চাশ। মানে অর্ধশত বছর জীবন থেকে চলে যাচ্ছে। পুরাতন হিসাবের খাতায় লাভ-ক্ষতি কিছু-ই বুঝি না। যারা লাভ দেয় তারা কিংবা যারা ক্ষতি করে তারা সবই যেন আমায় ভালোবাসে মনে হয়। শত্রু-মিত্র উভয়ের প্রেম আমাকে আপ্লুত করে এবং সামনে যেতে সাহায্য করে।
৫ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে ভালো লগছিলো না। ভাবছিলাম এমন কোথাও যাই যেখানে গেলে আত্মায় কিছু শান্তি মিলে। ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে নিজেই ড্রাইভ করে রওয়ানা দেই মৌলভী বাজারের দিকে, উদ্দেশ্য বরুনায় যাওয়া। সাথে রেঙ্গার সাহেবের নাতিন জামাই মাওলানা কবির খান ও আমার নাতি কামাল উদ্দিন। বরুনার সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ষাট-সত্তর বছরের। শায়খুল ইসলাম মাওলানা সৈয়দ হোসাইন আহমদ মাদানী (র.)-এর খলিফা মাওলানা লুৎফুর ররহমান বর্ণভী (র.) হলেন আমার বাবা আলহাজ্ব সৈয়দ আতাউর রহমান সাহেবের মুর্শিদ। মুর্শিদ মানে শুধু কথায় নয়, আমার বাবা একেবারে ফানায়ে শায়েখ বলতে যা বুঝায় তা। আমার বাবার সামনে কেউ তাঁর শায়খের বিরুদ্ধে কথা বললে মনে হতো মেরে ফেলবেন। শায়েখ শামস তিবরিজী (র.)-এর সাথে মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (র.)-এর যে সম্পর্ক ছিলো সে রকম না হলেও একেবারে কম ছিলো না । তিনি প্রায় আমাদের বাসায় কিংবা বাড়িতে আসতেন। আমি ছোটবেলা তাঁকে আমাদের বাড়িতে দেখেছি। তিনি জীবনের শেষ ইতিকাফ করেছেন আমাদের গ্রাম সৈয়দপুরের দরগাহে হযরত শাহ শামসুদ্দিন (র.) জামে মসজিদে। তিনি প্রায় বলতেন, বাংলাদেশের মধ্যে সৈয়দপুর আমার খুব প্রিয় জায়গা, যেখান থেকে বের হওয়ার সময় আমি বারবার পিছন ফিরে দেখি। (রেকর্ড করা বয়ান থেকে)। তিনি যেদিন ইন্তেকাল করেন এর আগে তিনি বেশ অসুস্থ্য হয়ে যান। তখন মোবাইল কিংবা টেলিফোনের তেমন উন্নত ব্যবস্থা ছিলো না। তাঁর অসুস্থ্যতাকে মানুষ প্রচার করে মারাগেছেন বলে। আমার বাবা ও খলিফায়ে মাদানী হাফিজ মাওলানা আব্দুল করিম শায়খে কৌড়িয়া (র.) এবং আরও কেউ কেউ এক সাথে বরুনায় যান। গিয়ে দেখা যায় তিনি বেঁচে আছেন। বাকিরা চলে আসেন, তখন শায়েখ মৃত্যুমুখি ছিলেন বলে আমার বাবা থেকে যান। পরে শায়েখ ইন্তেকাল করলে তাঁকে জানাজা, কাপন, দাফন শেষে বাবা সিলেট ফিরেন। এর বেশ পরে বাবা মুরিদ হয়েছিলেন আরিফবিল্লাহ ছানি শাহজালাল হযরত হাফিজ মাওলানা আকবর আলী, ইমাম দরগাহ মসজিদ-এর কাছে। তবে বরুনার সাথে সম্পর্ক আগে যেমন ছিলো খুবই গভীর, বর্তমানেও রয়েছে। বাবা তো এখন অসুস্থ্য। সেদিন গোলমুকাপনের শায়েখ মাওলানা আব্দুস শহিদ সাহেব এসেছিলেন, তিনিও শায়খে বর্ণভীর শিষ্য, বাবার পির ভাই। মুর্শিদের আলোচনায় আমি প্রশ্ন করি তাঁর কি মুর্শিদের কথা স্মরণ হয়? তিনি বলেন, ‘স্মরণ তো হয়ই, প্রায় স্বপ্নেও দেখি।’ এতটুকু বলে তিনি কাঁদতে থাকেন।
৬ ফেব্রুয়ারি সকালে বাবার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে বরুনার দিকে যাত্রা শুরু করি শায়খে বর্ণভীর বড় ছেলে ওয়ালিকুল শিরোমনি শায়খুল হাদিস মাওলানা খলিলুর রহমান সাহেবের দরবারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে । তিনি আমার মুর্শিদ, তিনি আমার গুরু। যখন গাড়ি নিয়ে বাসা থেকে বের হই তখনই অনুভব করতে থাকি প্রেমিক-প্রেমিকার মিলনের আনন্দ। ধীরে ধীরে অশান্ত মনে শান্তি আসতে থাকে। মোগলাবাজারের রেঙ্গা মাদরাসার সামন থেকে মাওলানা কবির খানকে উঠানোর সময় হাজিগঞ্জের হাফিজ মাওলানা জাকারিয়ার সাথে দেখা হয়। কিছু সময় কথা বলে আমি আবার গাড়িতে উঠি এবং মৌলভী বাজারের দিকে চালাতে থাকি। মৌলভী বাজার শহরে স্বাদ মিষ্টি ঘরে গিয়ে থামি। কিছু দই খরিদ করি, কপি পান করি এবং আমার খুব ঘণিষ্ট্য বন্ধু কোরাস সম্পাদক মুজাহিদ আহমদ আসে, কিছু সময় কথা বলি। কথা হয় যাওয়ার সময় কোরাসের অফিসে দেখা হবে। মুজাহিদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বরুনার দিকে চলতে থাকি। জুহরের নামাজ শেষে আমরা বরুনায় গিয়ে পৌঁছি। মাওলানা লুৎফুর রহমান শায়খে বর্ণভীর ছেলেদের চারজন। তারা হলেন মাওলানা খলিলুর রহমান, মাওলানা রশিদুর রহমান ফারুক, মাওলানা সালিকুর রহমান, মাওলানা ওলিউর রহমান। আমার সাথে তাদের সকল ভাইয়েরই সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে মাওলানা খলিলুর রহমান তাদের সবার মধ্যে ভিন্ন।