বড় হুজুর (রহঃ)ও তাঁর সমাজ বিপ্লব

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ১৬, ২০২০
বড় হুজুর (রহঃ)ও তাঁর সমাজ বিপ্লব

-হাফেজ মুহাম্মদ নূরুজ্জামান

গরুর গাড়িতে চড়ে বড় হুজুর আমাদের বাড়ি এসেছিলেন _ আমার স্মৃতিতে বড় হুজুরকে এটাই প্রথম দেখা । এরপর জীবনে তাকে বার বার দেখেছি ভয় আর শ্রদ্ধার বিনম্র দৃষ্টিতে । ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রাহ. এর অন্যতম সহযোদ্ধা ছিলেন হযরত বড় হুজুর রাহ. । সংগত কারণেই ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রা. এর জীবনী-গ্রন্থ লিখতে গিয়ে আমাকে অসংখ্যবার বড় হুজুর রা. এর সান্নিধ্য নিতে হয়েছে। তার সোহবত, হেদায়েতের বাণী এবং আদর্শের স্ফটিক স্বচ্ছ স্রোতধারার কলস্বরা ধ্বনি এখনও ঝংকৃত হয় আমার হৃদয়ে ।

এক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ঠ, অন্যায়-অবিচার, মানবিকতা আর মানুষের বিরদ্ধে যুদ্ধ বিগ্রহের সময়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছেন বাংলার ইতিহাসে স্মরণকালের প্রজ্ঞাবান, সুপন্ডিত, কিংবদন্তিতুল্য প্রবাদ-পুরুষ আল্লামা সিরাজুল ইসলাম বড় হুজুর রাহ.। গত শতাব্দীর সপ্তম দশকের দিকে উপমহাদেশের এক প্রান্তিক অঞ্চল বি বাড়িয়ার এক গ্রামে এ শতবর্ষী ইসলামী পন্ডিতের জন্ম। যিনি তাঁর মা এবং বাবাকে হারান অতি অল্প বয়সে।

আধুনিক প্রাইমারী শিক্ষা শেষ করে একে একে শিক্ষার প্রতিটি স্তর পেরিয়ে তৎকালীন উপমহাদেশের ইসলামী জ্ঞানকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পরিসমাপ্তি করেন ।

শিক্ষাজীবন শেষে পাঠদানের জীবন শুরু করেন বি-বাড়িয়া জামেয়া ইসলামিয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা থেকে। জীবনের শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত এই মাদ্রাসাতেই কাটিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ বছর। এই দীর্ঘ-কালীন শিক্ষকতাও পৃথিবীর ইতিহাসে অল্প এবং হাতে গোনা।

তিনি তারঁ সুযোগ্য পরিচালনার মাধ্যমে বহু আকাবিরের স্মৃতিধন্য এ জামিআ‘কে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও একটি সুপরিচিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে সফল হন । তারঁ নিরলস অবদানে এ মাদ্রাসাটি নিছক গতানুগতিক প্রতিষ্ঠান না হয়ে অত্র অঞ্চলের একটি দ্বীনি তাহজীব, চেতনা সংরক্ষণের দূর্গ হিসেবে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের নিকট অতীতের প্রতিটি ইসলামী আন্দোলন- সংগঠনে এই মাদ্রাসার অগ্রণী ভূমিকা সর্বজনবিদিত। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ইসলাম-বিরোধী শক্তির আতংকের নাম হচ্ছে জামেআ ইউনুছিয়া ।

এছাড়াও বড় হজুর তার নিজ বাড়ি ভাদুঘরে গোড়াপত্তন করেছেন জামেআ সিরাজিয়া দারুল উলুম নামক আরেকটি সুবিশাল প্রতিষ্ঠান । এবং পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এ অঞ্চলের শতাধিক মাদ্রাসার; ইন্তেকালের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ।

নাম সিরাজুল ইসলাম হলেও তারঁ জীবনব্যাপী সচ্ছতা, নিরহংকার, খুলুসিয়্যাত ও কুরআন-হাদীসের একনিষ্ঠ অনুসরণ এবং দাওয়াত ও তাবলীগের যুগান্তকারী ভূমিকার জন্য মানুষজন তাকেঁ “বড় হুজুর” নামেই সমধিক চিনে থাকে ।

তিনি ছিলেন সকল প্রজ্ঞা আর ইবাদতের গুনাবলীর সাথে একজন ভাল মানুষ। নিস্তরঙ্গ জলের মতো সুশীতল আর নিরহংকারী । ইসলামের সার্বজনীন পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। ধীরে ধীরে তিনি পরিণত হয়েছিলেন গণমানুষের তাজ-এ। হিন্দু-মুসলমান সকলেই ছুটে আসত তার কাছে । নিত জীবন চলার দিক নির্দেশনা। কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াতেন না বলেই তিনি একজন অন্য ধর্মের মানুষের কাছেও ছিলেন আদর্শের পিরামিড- আর সম্বোধনে “বড় হুজুর”।

“বড় হুজুর” কর্মক্ষম থাকাবস্থায় দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত স্থানে কুরআনের তাফসির করে বেড়াতেন। বলা হয়ে থাকে এদেশে সর্বপ্রথম সাধারণের মাঝে বড় হুজুর-ই কুরআন তাফসীরের প্রচলন করেন। বর্তমান সময়ে প্রচলিত অনেক ওয়ায়েজ যেভাবে সুরের সংযোগ ঘটিয়ে কল্পিত কিচ্ছা কাহিনী বর্ণনা করে জনগনকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন; বড় হুজুর ছিলেন তার ব্যতিক্রম ।

তিনি সাধারণের বোধগম্য ভাষায় কুরআন-হাদীস থেকে বয়ান করতেন । মানুষ তারঁ বয়ান শুনার জন্য পাগল হয়ে থাকত । লক্ষ লক্ষ মানুষ বড় হুজুরের বয়ান শুনে নিজেদের জীবনকে পরিবর্তন করেছেন । হেদায়েতের স্রোতধারায় অবগাহন করেছেন । শতাধিক বছরেও হযরত যেভাবে কোরআনের তাফসীর করেছেন তাতে মুগ্ধ যৌবনের সাহসী প্রাণ বলা ছাড়া সম্বোধনের আর কিছু মনে পড়ে না। চাতক পাখির মতো তার কোরআনের মাহফিল শুনেছেন হাজার হাজার নারী-পুরুষ মুসুল্লী। যার কারণে তার আরেক পরিচিত নাম “মোফাস্সির হুজুর”।

মানুষের এই আবেগ ও আনুগত্যকে পুজিঁ করে তিনি চাইলে দুনিয়ার জীবনে অনেক বৈষয়িক উন্নতি লাভ করতে পারতেন । কিন্তু তিনি একজন সত্যিকার নায়েবে নবী । সহজ সরল জীবন পছন্দ করতেন তিনি । অফুরন্ত সুযোগ সুবিধা থাকা সত্তেও বিলাসী জীবনকে অত্যন্ত সচেতন ভাবে তিনি পরিহার করেছেন। দেশে বিদেশের প্রচার মাধ্যমে বহুল প্রচারিত “বড় হুজুর” সাধারণ টিনের খুপরি ঘরে বসবাস করতেন , একথা ভাবলেও আশ্চর্য্য লাগে । তারঁ সেই স্মৃতি বিজড়িত চাকচিক্যহীন ঘরটি আজও অবিকৃত রয়েছে, সময়ের সাক্ষী হিসেবে ।

ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত পরহেজগার ও নিরহংকার এই মানুষটি ইসলামী চেতনার পরিপন্থি যে কোন অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে ছিলেন আপোসহীন । রাষ্ট্রীয় কিংবা সামাজিক যে কোন ঈমান বিধ্বংসী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তারঁ ভূমিকা ছিল সার্বজনীন ।
বড় হুজুর (রাহ.)ছিলেন সা¤প্রদায়িক-স¤প্রীতির এক প্রপ্রোজ্জল প্রাণ পুরুষ । ব্রাক্ষণবাড়িয়ার সংখ্যালুঘু স¤প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দু স¤প্রদায়ের লোকজন অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে তাকে মান্য করত। ব্রাক্ষণবাড়িয়াবাসীর সামনে এর ভুরি ভুরি নজীর বিদ্যমান।

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেয়ার পর সারা বিশ্বের মতো বি-বাড়িয়ার ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণও ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। জেলা শহরের মেড্ডাস্থ প্রায় দুইশত বছরের প্রাচিন “কালভৈরব মন্দির” ভেঙ্গে দিতে হাজার হাজার জনতা উদ্যত্ত হয়ে পড়ে । চরম অনিরাপত্তা ও আতংকে পতিত হয়ে পড়ে গোটা হিন্দু স¤প্রদায় । আইন শৃংখলা পরিস্থিতি চলে যায় প্রশাসনের নিয়ন্ত্রনের বাইরে ।

নিরুপায় প্রশাসন দারস্থ হন বড় হুজুর রাহ. এর । পরিস্থিতির বাস্তবতা উপলব্ধি করে রাগে অগ্নি শর্মা বনে যান বড় হুজুর রাহ.। তিনি উত্তেজিত জনতাকে জামেআ ইউনুছিয়ার সামনে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন ।

উপস্থিত জনতার কাছে জানতে চান, “অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস-লিলায় ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কোন কোন হিন্দু অংশগ্রহণ করেছে। সমবেত সমাবেশ নিরব নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

তারপর বড় হুজুর রাহ. বলেন,তাহলে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে দেয়ার জন্য ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কোন হিন্দু সদস্য দায়ী নয়। সুতরাং বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্য ব্রাক্ষণবাড়িয়ার কোন মন্দির কিংবা কোন হিন্দু সদস্যকে আঘাত করা হারাম। বরং তাদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা আমাদের দায়িত্ব।”

মুহুর্তেই তার এই ঘোষণা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ার মাধ্যমে সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ভারতের আগরতলা রেডিও থেকে বার বার ঘোষণাটি প্রচার করা হয়। আর এভাবেই ব্রাক্ষণবাড়িয়া একটি কলংকের হাত থেকে বেচে যায়। রক্ষা হয় প্রাচিন মন্দির। যেন নব-জীবন লাভ করে শহরের হিন্দু স¤প্রদায়।

কোন বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতা না হয়েও ইসলামী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন হযরত। এটা কেবল বয়োবৃদ্ধের যোগ্যতা দিয়ে নয়, এটা মানুষের কাছে তার পরিপূর্ণ ইসলামিক দর্শন লালন এবং সাথে সাথে পালনের কারণে। ফলে কথা আর কাজে তার এক। কোন পার্থক্য নেই।

নিজের প্রাত্যহিক ব্যবহার্য এবং চলনে-বলনে ও ওই কথা-কাজের সম্মিলন; ফলে একজন মানুষ মাত্রই হযরতের প্রতি মনোযোগী হতে আন্তরিক হন । এক ঘোষণায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা বন্ধ হয়ে যায়। কোরআনের জন্যে ঝরে পরে ছয় ছয়টি তারুণ্য। নিশ্চিত মৃত্য জেনেও রাষ্ট্রের ব্যারিকেড ভাঙ্গতে গিয়ে শহীদ হন ১৪ বছরের কিশোর। ভয়ে নমস্য হন রাষ্ট্রের অনূকূল বাহিনীসহ ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত।

আজকের বাংলাদেশে ইসলামী রাজনীতি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব উভয় হযরতের লালিত গুনাবলী থেকে অনেক দূরে। ফলে কেবল মৌসুম ভিত্তিক কিছু আন্দোলন বাদ দিলে ইসলাম এবং মুসলমানদের স্বার্থে কোনরূপ নজর দেন না। এটা যেমন লজ্জার, তেমনি পরাজিত মানুষের অশ্রু ফেলার মতো। আর এটা কোন্দল, বদনাম, নেতৃত্বে বিচ্ছিন্নতাসহ প্রবীন কোন কোন আলেমে দ্বীনের শারীরিক অক্ষমতার জন্যেও বটে।

আজকের দিনের তরুণদের বলব, যারা ইসলামের স্বার্থে জীবন কোরবানী দিতে চায় তারা যেন হযরতের জীবনকে পাঠ করে, পূর্ণ অনুশীলন করে। এ ছাড়া আমাদের ইসলামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ঢাকা অন্ধকারে; সে অন্ধকার কখনো সাম্রাজ্যবাদের, কখনো ব্রাক্ষন্যবাদী আগ্রাসনে। যার প্রতিচ্ছবি বর্তমান সমাজের আমাদের আলেমদের উপরেও ফেলছে। নানা ধরনের ভোগবাদীতা তাদের অনেককে ঝেঁকে ধরেছে অসুুরের মতো। তাই, আমাদের সবাইকে হযরতের মতো মহান ব্যাক্তিত্বের জীবনকে অনুসরণ করে এদেশে ইসলামী রাজনীতির পতাকা উন্ডীন করতে হবে।

বড় হুজুর রাহ. সত্যিকার অর্থেই ছিলেন একজন ওলীয়ে কামেল । শত দুঃখ-দীনতার মাঝেও আরো অনেকের মতো আমিও হৃদয়ের প্রফুল্লতা পেতাম বড় হুজুরের সান্নিধ্যে।

বড় হুজুরের কথা শুনছি কিংবা বড় হুজুর আমার সাথে কথা বলছেন, এই অনুভূতিই যেন এক বেহেশতি সুখ।

বড় হুজুরের স্মৃতি রোমন্থন করে আজও খুঁজে ফিরি জীবন চলার পথ। মনে পড়ে দীর্ঘদিন পরে বড় হুজুরের কাছেই ব্যক্ত করছিলাম বড় হুজুরকে দেখার প্রথম স্মৃতির কথা। হুজুর সুধরে দিয়ে বলেছিলেন, না মিয়া,গরুর গাড়ি নয় ঘোড়ায় করে তোমাদের বাড়ি গিয়েছিলাম…।

বড় হুজুর আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রা. কে আল্লাহপাক জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুণ। আমীন ।