ফর দেম হু লাইক টু বি ফ্ল্যাটার্ড!

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৭, ২০২০
ফর দেম হু লাইক টু বি ফ্ল্যাটার্ড!

মোঃ খালিক উদ্দিন
বসের অফিস থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠ পর্যন্ত আজকাল চারিদিকেই অতিভক্তির ছড়াছড়ি পরিলক্ষিত হচ্ছে। অফিসের এক শ্রেণীর অধস্তন কর্মকর্তা যেমন স্বীয় স্বার্থ সিদ্ধির জন্য তাদের বসকে ভক্তির আতিশয্যে শ্রাবণের প্লাবনের মতো ভাসিয়ে দেন, তেমনি রাজনীতির মাঠেও এক শ্রেণীর অধ:পদের নেতাকর্মী প্রবল তোষামোদের বাণে উর্ধপদের নেতৃবৃন্দকে আপ্লুত করে দেন। কর্মী ও কর্মকর্তার অতিশয় ভক্তি কোনকালেও স্ব স্ব ক্ষেত্রের উর্ধতনদের জন্য মঙ্গলসূচক ছিল না, এখনো নেই।
রাজনীতির মাঠে আজকাল এক শ্রেণীর নেতৃবৃন্দ আছেন যারা এক ধরনের কর্মীর অতিশয় ভক্তিকর্মে নিজের নেতৃত্বের ত্রুটিগুলো কী, তা ধরে উঠতে পারেন না। এতে যেমন তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অর্জিত হচ্ছে না, তেমনি কর্মীবৃন্দও তাদের কাছ থেকে সুষ্ঠু রাজনৈতিক শিক্ষা অর্জন করতে পারছে না।
সে কারণে আজকাল দেখা যায়, ফেইসবুক বান্ধব রাজনীতির সেইসব কর্মী এগিয়ে যারা মাঠ রাজনীতির কর্মীদের চেয়ে ফেইছবুকে নেতার ছবির সাথে নিজেদের ছবি সংযুক্ত করে অতিশয় কতগুলো বিশেষণে ভক্তির আতিশয্যে নিজের টাইমলাইন সরগরম করে রাখতে পেরেছে।
এতে অনেক নেতৃবৃন্দ যারপরনাই খুশি হোন বটে, যদিও নিজেও জানেন, যে সকল অতিশয় বিশেষণের মাধ্যমে কর্মী তাঁর ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ রয়েছে, তার সিংহভাগ কৃতিত্ব ও যোগ্যতা তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুড়িতে অধিকৃত নেই।
তাই, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রতি আমার আহবান, আপনারা নেতা তৈরির কারিগর। প্রয়োজনে নেতার নেতৃত্বের ত্রুটিগুলো ধরে দিয়ে তাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অর্জনের মাধ্যমে দক্ষ নেতা হয়ে উঠতে সাহায্য করুন। ভুল প্রশংসায় মেতে উঠবেন না। রাজনীতির মাঠে একজন সুযোগ্য কর্মী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাইলে, রাষ্ট্র ও রাজনীতি বিষয়ে অপার জ্ঞান অর্জন করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া বিশ্বখ্যাত মনীষী মহামতি প্লেটোর এ কথাটি মনে রাখতে হবে-
‘ভক্তিতে অন্ধ হয়ে যাও, সুফল পাবে,
কিন্তু, অন্ধভক্ত হয়ো না, পথ হারাবে।’

এ পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য কিছু কর্মীর অতিভক্তির পরিণাম কী হতে পারে, তার তরতাজা একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত তুলে ধরে লেখাটি শেষ করব।
বিভিন্ন অফিস আদালত ও প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররাও এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।
-‘জুলফিকার আলী ভুট্টো’র নাম শুনেন নি, এমন সচেতন বাঙ্গালী হয়তো গোটা বাংলাদেশে একজনও পাওয়া যাবে না। আর,রাজনীতি যারা করেন তারা তো তাঁকে অস্থিমজ্জায় চেনেন। ১৯৭৫ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তাঁর খুবই প্রিয়ভাজন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় স্ট্রাইক কর্পসের একজন সামান্য কমান্ডার ‘জিয়াউল হকের’ আমন্ত্রণে মুলতানে একটি স্টেশন পরিদর্শন করতে যান প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো।
সেখানে তাঁকে জমকালো আয়োজনের মাধ্যমে যারপরনাই তৃপ্ত করেন তাঁর এ শিষ্য। এমনকি, একপর্যায়ে তাঁর প্রতি অতিভক্তির নিদর্শন স্বরূপ জিয়াউল হক নিজ হাতে ভুট্টোর জুতা পালিশ করে দিয়েও তাঁকে খুশি করেন!
প্রবল তোষামোদে গদগদ ভুট্টো বিনিময়ে রাজধানীতে ফিরেই জিয়াউল হককে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন।
এছাড়া, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুসারে প্রধানমন্ত্রীকে মি.প্রাইম মিনিস্টার সম্বোধন করার রেওয়াজ ছিল (অদ্যাবধি হয়তো আছে)। জিয়াল হক ছিলেন আরও এক ধাপ এগিয়ে। তিনি ভুট্টোকে মি. প্রাইম মিনিস্টার সম্বোধন না করে, ‘স্যার’ সম্বোধন করতেন।
এভাবে একপর্যায়ে ১৯৭৬ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল টিক্কা খাঁন অবসরে গেলে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো সাত সাতজন সিনিয়র জেনারেলকে ডিঙিয়ে জিয়াউল হককে ‘চিফ অফ আর্মি স্টাফ’ পদে নিয়োগ দান করেন।
এটা ছিল তাঁর প্রতি প্রবল তোষামোদির পুরষ্কার!
কিন্তু, হায়! এর সর্বশেষ পরিণতি কী হয়েছিল?
সর্বশেষ পরিণতি হয়েছিল- ১৯৭৭ সালে যখন পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা শুরু হয়, তখন ভুট্টো পাকিস্তানের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি শহরে কারফিউ জারির আদেশ দেন। এই কারফিউ চলাকালীন একদিন জিয়াল হক একদল মিলিটারি পুলিশ পাঠিয়ে ভুট্টোকে গ্রেফতার করান।
তারপরের ইতিহাস আমরা সকলেই জানি।
ভুট্টোর মুক্তির জন্য, গোটা বিশ্বের বেশ কয়েকজন ডাকসাইটে রাষ্ট্রপ্রধানের প্রবল অনুরোধ উপেক্ষা করে জিয়াউল হক শেষপর্যন্ত কোর্টমার্শাল করে ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেন!

তথ্য ঘেটে উক্ত ঘটনাটি যে দিন আমি জেনেছিলাম, সেই দিনই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোনো এক কবিতার এ স্তবকগুলো আমার অন্তর গভীরে ফেভিকলের আটার মতো শক্ত হয়ে গেঁথে গেছে-
‘ভক্তি আসে রিক্তহস্ত প্রসন্ন বদন-
অতিভক্তি বলে, দেখি কী পাইলে ধন।
ভক্তি কয়, মনে পাই, না পারি দেখাতে,
অতিভক্তি কয় আমি পাই হাতে হাতে!’

জিয়াউল হক তার বস জুলফিকার আলী ভুট্টোর প্রতি তার অতিভক্তির বিনিময় নগদে সুদেআসলে আদায় করে নিয়েছিল।
তাই, আমার ভয় হয় ঐসব রাজনীতিবিদগণের জন্য যারা কর্মীর অন্ধ প্রশংসায় প্রবল আবেগে আপ্লূত হয়ে হিতাহিতজ্ঞান ভুলে বসেন, কর্মীর অপকর্মে তাকে গঠনতন্ত্র মোতাবেক উপযুক্ত শাস্তি প্রদান না করে বরং আশ্রয় দান করেন, তাদের পরিণতি যদি শেষমেশ ভুট্টোর ন্যায় এতোটা নির্মম হয়!
অন্যায় ও অপকর্ম রোধে মনের একান্ত গহীনে আমাদের প্রত্যেকেরই অহর্নিশ এ আপ্তবাক্যটি লালন করা উচিৎ-
‘Every man is paid back by his own coin.’
এ পৃথিবীতে স্ব স্ব ভালো-মন্দ প্রতিটি কাজের প্রতিফল প্রত্যেক মানুষকে ভোগ করতে হয়।
.
লেখক:
প্রভাষক
‘ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রী কলেজ’
‘তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক’
বাংলাদেশ আওয়ামী-যুবলীগ
কুলাউড়া, মৌলভীবাজার।