আসামে ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ গড়ে তোলার প্রস্তাবে সরকারের আপত্তি

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ৩০, ২০২০
আসামে ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ গড়ে তোলার প্রস্তাবে সরকারের আপত্তি

জাতিগত, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বে দীর্ণ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম রাজ্যে এবার বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে প্রস্তাবিত একটি ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’। আসামে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার নদীদ্বীপ বা চরাঞ্চলে যে বাংলাভাষী মুসলিমরা বসবাস করেন, তাদেরই ‘মিঁয়া’ বলে অভিহিত করা হয় এবং ওই জাতিগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যেই ওই সংগ্রহশালা গড়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি সে প্রস্তাব প্রাথমিকভাবে অনুমোদন করলেও আসাম সরকার এখন জানিয়ে দিয়েছে আসামের চরাঞ্চলে আলাদা কোনও সংস্কৃতি আছে বলে তারা বিশ্বাস করে না – আর তাই রাজধানী গুয়াহাটিতে কোনও ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ গড়ারও প্রশ্ন ওঠে না।

আসামের সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এমনও মন্তব্য করেছেন, “চরাঞ্চলের মানুষ মূলত বাংলাদেশ থেকে এসেছেন, কাজেই আসামের সংস্কৃতির যে পীঠস্থান সেখানে (তাদের স্থান দিয়ে) কোনও বিকৃতি সহ্য করা হবে না।”

প্রসঙ্গত, আসামে নব্য-বৈষ্ণববাদী সংস্কারের রূপকার হিসেবে যাকে গণ্য করা হয়, সেই শ্রীমন্ত শঙ্করদেবের নামাঙ্কিত একটি সুবিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে রাজধানী গুয়াহাটিতে – যার ঘোষিত লক্ষ্যই হল ”আসামের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ ও প্রসার”।

‘কলাক্ষেত্র’ নামে পরিচিত এই কেন্দ্রটিতে যাতে রাজ্যের চরাঞ্চল বা চর-চাপোরির বাসিন্দাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতিও ঠাঁই পায়, সেই অনুরোধ জানিয়ে দিনদশেক আগে রাজ্য সরকারকে একটি চিঠি লেখেন নিম্ন আসামের বাঘবার আসনের এমএলএ শেরমান আলি আহমেদ। কিন্তু এরপরই চিঠিটি জনসমক্ষে প্রকাশ করে দেন রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা – এবং সরাসরি ঘোষণা করেন, শঙ্করদেব কলাক্ষেত্রে কোনও ‘মিঁয়া মিউজিয়ামে’র জায়গা হবে না। তিনি বলেন, “আসাম সরকারের সুষ্পষ্ট নীতি হল এই কলাক্ষেত্রে মিঁয়া মিউজিয়াম বা এই ধরনের অন্য কোনও সংগ্রহশালাই স্থাপন করা যাবে না।” “সরকারের সংগ্রহশালা বা অন্য কোনও বিভাগ যে কোনও মিঁয়া মিউজিয়াম গড়তে পারবে না, সে ব্যাপারে আমরা আপসবিহীন অবস্থান নিয়েছি।”

চরাঞ্চলের বাঙালি মুসলিমদের অবমাননাসূচক বর্ণনা হিসেবেই এতকাল ‘মিঁয়া’ শব্দটি আসামে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তবে এখন নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে মিঁয়ারা নিজেরাই এই শব্দটি ব্যবহার করছেন – তারা লিখছেন মিঁয়াকাব্য, মিঁয়াগান। এমনই একজন সুপরিচিত মিঁয়াকবি, গুয়াহাটির রেহনা সুলতানা বিবিসিকে বলছিলেন, “আমার একটাই কথা, চর-চাপোরির বাসিন্দা, তাদের আপনি মিঁয়াই বলুন বা অন্য যা-কিছু, তারা কিন্তু নিজেদের একশোভাগ আসামের লোক বলে ভাবেন।” “এখন আসামে যেমন রাভা-হাজং ইত্যাদি নানা জাতি বা জনগোষ্ঠী আছে, তেমনি মিঁয়া-রাও একটি জনগোষ্ঠী। আর তাদেরও একটা খুব সমৃদ্ধ কৃষ্টি-সংস্কৃতি আছে, যেটা রক্ষা করা দরকার।”

“এখন মিঁয়ারা যদি নিজেদের অসমিয়া বলেই ভাবেন এবং আসামের মূল ধারাও তাদের সেই স্বীকৃতিটা দেয়, তাহলে তাদের কলাকৃষ্টি সংরক্ষণে আপত্তি কোথায় এটাই আমার মাথায় ঢোকে না!”, বলছিলেন ড: সুলতানা। ঘটনা হল, প্রায় আট মাস আগেই কিন্তু রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্ট্যান্ডিং কমিটি চরাঞ্চলের মানুষের জন্য আলাদা একটি সংগ্রহশালা গড়ে তোলার প্রস্তাবে সায় দিয়েছিল।

আসামের ধুবড়ি থেকে তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “ওই কমিটি কিন্তু মূলত চরাঞ্চল বা নদীদ্বীপগুলোতে বসবাসকারী মানুষের জীবনশৈলী রক্ষা করার কথাই বলেছিল – এক্সক্লুসিভলি মিঁয়াদের মিউজিয়াম গড়ার কথাটা তখন আসেনি।” “তার কারণ এ রাজ্যের চরাঞ্চলে মিঁয়ারাই থাকেন না। আপার আসামের চরে যেমন মিসিং বা মিরি জাতিগোষ্ঠীর মানুষরাও বসবাস করেন।”

“নিম্ন আসামের বহু চরেও মিঁয়া মুসলিমদের পাশাপাশি আর একটা কমিউনিটিও থাকে, তারা অবিভক্ত গোয়ালপাড়া অঞ্চলের দেশি মুসলিম। আমি বহু চরে তফসিলি জাতিভুক্ত অনেক হিন্দু পরিবারও পেয়েছি।” “প্রস্তাবিত মিউজিয়ামে এই জাতিবৈচিত্র্যটা উঠে আসুক, এটাই আমরা চেয়েছিলাম। কারণ সাধারণ মানুষ এই চরাঞ্চল নিয়ে তেমন বিশেষ কিছু জানে না, আর তাদের ধারণাটাও খুব প্রেজুডিসড।”

“কিন্তু এখন সেটাকে মিঁয়া মিউজিয়াম বলেই চিহ্নিত করা হচ্ছে – কারণ রাজ্যে শাসক দল বিজেপির যে রাজনীতি, সেটা হল বিভাজনের রাজনীতি”, আক্ষেপের সুরে বলছিলেন পারভিন সুলতানা। ফলে চরাঞ্চলের জন্য প্রস্তাবিত মিউজিয়ামকেই আসাম সরকার এখন ‘মিঁয়া মিউজিয়াম’ বলে বর্ণনা করে সে প্রস্তাব নাকচ করে দিচ্ছে। আর এই পদক্ষেপের নেপথ্যে রাজ্যে আগামী বছরের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অঙ্ক কাজ করছে বলেও পর্যবেক্ষকরা একমত।