আকাশ পথে ঢাকা-কলকাতা রুটে যাত্রী নেই কেন?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ৯, ২০২০
আকাশ পথে ঢাকা-কলকাতা রুটে যাত্রী নেই কেন?

যাত্রী সংকটের কারণে সম্প্রতি ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করার কথা ঘোষণা করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই যাত্রী সংকটের কথা জানিয়েছে অন্য এয়ারলাইন্সগুলোও।

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে বেশ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর বিমান চলাচল আবার চালু হয়েছে অক্টোবর মাসে।

বিদেশে বাংলাদেশের নাগরিকদের গন্তব্যের পছন্দের তালিকার মধ্যে অন্যতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতা। এই শহরটির সাথে বাংলাদেশের সড়ক ছাড়াও বিমান যোগাযোগ চালু রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বিবিসিকে বলেন, ৫ই অক্টোবর ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে বিমান বাংলাদেশের শেষ ফ্লাইটটি চলেছে। এর পর থেকে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে।

“এয়ারলাইন্সে প্যাসেঞ্জার হচ্ছে না, অন্যদেরও হচ্ছে না। আমার পক্ষে চালানো সম্ভব না। আমি বন্ধ করে দিয়েছি,” বলেন তিনি।

কবে নাগাদ এটি আবার চালু হতে পারে সে বিষয়েও কিছু জানাননি তিনি। বাংলাদেশ বিমানের ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে সপ্তাহে ৩টি ফ্লাইট চলাচল করছিল।

যাত্রী সংকটের কথা জানিয়েছে বেসরকারি বিমান চলাচল সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সও। তবে তারা এখনো ফ্লাইট বাতিল বা বন্ধের কথা ঘোষণা করে নি।

এই সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুল ইসলাম বিবিসিকে বলেন, ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটে সপ্তাহে ৩টি ফ্লাইট চালু রেখেছেন তারা।

তবে এসব ফ্লাইটে যাত্রীর সংখ্যা আশানুরূপ নয়। তিনি বলেন, প্রতিটি ফ্লাইটের মাত্র ৪০ শতাংশ আসনে যাত্রী রয়েছে। বাকি আসন শূণ্য থাকে।

তার মতে, কোভিডের কারণে পরবর্তিত পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটাই যাত্রী কমে আসার কারণ।

এছাড়া বিমান ভ্রমণে কোভিড বিষয়ক সার্টিফিকেট এবং কোয়ারেন্টিনের মতো বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক হওয়ার কারণে যাত্রীরা বিমান ভ্রমণে আগ্রহী হয় না বলে মনে করেন তিনি।
মি. ইসলাম বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। তারা আশা করছেন যে, ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। তবে এতে কত সময় লাগতে পারে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

করোনাভাইরাসের কারণে এর আগে ১৩ই মার্চ থেকে দিল্লি এবং কলকাতাগামী সব ফ্লাইট বন্ধ থাকার কথা ঘোষণা করে বাংলাদেশ বিমান।

পরে ‘এয়ার বাবল’ পদ্ধতি অনুসরণ করে ২৮শে অক্টোবর থেকে আবারো ফ্লাইট চালু হয়। এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট দুইটি দেশের কর্তৃপক্ষের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত স্বাস্থ্য বিধি মেনে বিমান ভ্রমণ করতে পারে নাগরিকরা। তবে এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিধি কিছুটা শিথিল করা হয়।

এর আগে অক্টোবরের শুরুর দিকে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য অনলাইন ভিসা আবেদন সার্ভিস আবার চালু করে।।
যাত্রীরা কী বলছেন?

হেলেনা পারভীন বলেন, কলকাতাতে আত্মীয় স্বজন থাকার কারণে প্রতি ছয় মাসে একবার ভারতে যাওয়া হতো তার। সবশেষ গিয়েছিলেন ২০১৯ সালের অক্টোবরে। কিন্তু এর পর মার্চে যখন যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আসার কারণে আর যেতে পারেননি তিনি।

হেলেনা পারভীন বলেন, ভারতে বাংলাদেশের তুলনায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হওয়ার কারণে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা আপাতত বাদ দিয়েছেন তারা।

“আত্মীয় স্বজনের সাথে কথা বললাম। ওরা বললো এখন না আসাই ভাল। এজন্য আর যাচ্ছি না।”

সামনের বছর আবার ভারত যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বের যেসব দেশ করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে েই তালিকায় ভারত দ্বিতীয় স্থানে। দেশটিতে বর্তমানে ৮৫ লাখেরও বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।

ব্যবসা এবং পর্যটনের জন্য প্রায় প্রতিমাসেই ভারতে যেতেন এমন একজন বাংলাদেশি নারী (আপত্তির কারণে তার নামটি প্রকাশ করা হলো না) তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আসায় আর যেতে পারছেন না তারা। এছাড়া ভিসার প্রক্রিয়া আগের চেয়ে আরো বেশি কঠিন হয়ে যাওয়ার কারণেও ভারতে যেতে আগ্রহী হচ্ছেন না তিনি।

“ভিসাই তো দিচ্ছে না। যাবো কিভাবে?” বলেন তিনি।
ট্রাভেল এজেন্সিগুলো কী বলছে?

বাংলাদেশের বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সি বলছে যে, করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর থেকেই ভারতে বাংলাদেশিদের যাতায়াত কমে গেছে।

জ্যাস ট্রাভেল কর্পোরেশন লিমিটেড নামে একটি ট্রাভেল এজেন্সির সিনিয়র টিকেটিং সুপারভাইজার সাগর আহমেদ বলেন, এয়ারবাবল পদ্ধতিতে ভারতে বিমান চলাচল শুরু হওয়ার পর ২৫ দিন পার হয়ে গেলেও এখনো একটি টিকেটও কাটতে পারেন নি তিনি। কারণ তার ক্লায়েন্টদের কেউই ভারতে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেননি।

“কাটবো কিভাবে, ভারতের যেতে ইচ্ছুক এমন কোন ক্লায়েন্টের কাছ থেকে কোন অনুরোধ পাই নাই,” বলছিলেন মি. আহমেদ।

অথচ গত বছর এই সময়ে যখন করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছিল না তখন প্রতি সপ্তাহে তাকে অন্তত ২০-২৫টি ভারতীয় ভিসা এবং টিকেট করতো হতো বলে তিনি জানিয়েছেন।

মি আহমেদ বলেন, যাত্রীদের ভারতে না যাওয়ার পেছনে দুটো কারণ কাজ করতে পারে: তার মধ্যে প্রধান কারণটি হচ্ছে ভারতে বর্তমানে পর্যটক ভিসা দেয়া বন্ধ রয়েছে। নতুন কোন ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে বেশিরভাগ মানুষ পর্যটনের উদ্দেশ্যে ভারতে যায় বলে মনে করেন তিনি।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ভারতের চিকিৎসা বা মেডিকেল ভিসা এবং ভ্রমণ উন্মুক্ত থাকলেও এই প্রক্রিয়ায় কিছু জটিলতার কারণেও মানুষ যেতে আগ্রহী হচ্ছে না।

“প্রথমত কোভিড নেগেটিভ সার্টিফিকেট থাকতে হয়, আবার ভারত থেকে মেডিকেল ইনভাইটেশন আনতে হয়। সব মিলিয়ে ভিসা প্রক্রিয়া আগের চেয়ে বেশ জটিল হয়ে গেছে।”

এছাড়া ভারতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি বাংলাদেশের তুলনায় খারাপ হওয়ার কারণেও মানুষ সেখানে যেতে ভয় পায় বলেও মনে করেন ট্রাভেল এজেন্ট মি. আহমেদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একটি ট্রাভেল এজেন্সির একজন কর্মকর্তা বলেন, ভারতে যেতে আগ্রহী যাত্রীর সংখ্যা এখন খুবই কম। তিনি বলেন, আগে যেখানে ক্লায়েন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ, এখন সেটি ১০-১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রথমত নিষেধাজ্ঞার কারণে পর্যটকরা যেতে পারছেন না। শুধু চিকিৎসার জন্য এবং সরকারি কর্মকর্তারাই যেতে পারছেন।

এছাড়া করোনাভাইরাসের কারণে ভারতেও এখনো নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আছে যা বিমানবন্দরগুলোতে অনুসরণ করা হয়, যে কারণে অনেকেই যেতে চাচ্ছে না।

বাংলাদেশ থেকে ভারতে বর্তমানে চালু থাকা ভিসা গুলো হচ্ছে, মেডিকেল, ব্যবসা, কর্মসংস্থান, এন্ট্রি, সাংবাদিক, কূটনৈতিক, সরকারি, জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও জাতিসংঘ কূটনীতিক।