বাংলাদেশ কি শুরুর ২০ বছরে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম বাজে টেস্ট দল?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ১০, ২০২০
বাংলাদেশ কি শুরুর ২০ বছরে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম বাজে টেস্ট দল?

ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে নাইমুর রহমান দুর্জয়ের নেতৃত্বে ২০০০ সালের ১০ই নভেম্বর বাংলাদেশ দল ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচটি খেলতে মাঠে নামে।

ক্রিকেটে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর খেলা ওই প্রথম ম্যাচটি বাংলাদেশ অবশ্য হেরেছিল বিরাট ব্যবধানেই – ৯ উইকেটে, আর তা চার দিনের মধ্যেই, অর্থাৎ খেলার আরও একটি দিন বাকী ছিল।

এরপর গত ২০ বছরে বাংলাদেশ মোট টেস্ট ম্যাচ খেলেছে ১১৯টি, আর তাতে পরাজয়ের পাল্লা বেশ ভারী।

এই সময়ে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে মাত্র ১৪টি টেস্টে। আর হেরেছে ৮৯টি টেস্টে, ড্র করেছে ১৬টি টেস্ট ম্যাচ।

অর্থাৎ মোটাদাগে বলা যায়, মোট খেলা টেস্টের ১০ ভাগের এক ভাগের মতো ম্যাচে জিতেছে বাংলাদেশ, এক ভাগ ড্র হয়েছে এবং বাকি আট ভাগ টেস্টেই বাংলাদেশ হেরেছে।

এই ৮৯ টেস্টে বাংলাদেশ শুধু হারেনি, এর মধ্যে ৪৩টি টেস্টেই জাতীয় দল হেরেছে ইনিংস ব্যবধানে। অর্থাৎ ৪৩ বার প্রতিপক্ষ এক ইনিংসে যত রান তুলেছে, সেই রান বাংলাদেশ ক্রিকেট দল দুই ইনিংস মিলিয়েও তুলতে পারেনি।

এই ৪৩ বারের মধ্যে আবার প্রায় ১২ বার প্রতিপক্ষের এক ইনিংসের রানের চেয়েও ২০০ বা তার কাছাকাছি রানের ঘাটতি ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের দুই ইনিংসের রানে, অর্থাৎ ইনিংস ব্যবধানের হারগুলো ছিল এক কথায় হতাশাজনক।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, শুরুর ২০ বছরে কেবল বাংলাদেশই কি এতটা খারাপ পারফরম্যান্স করেছে, না-কি এক্ষেত্রে সঙ্গী-সাথীও কেউ আছে?

বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ে একে অপরের সাথে ১৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে – যার মধ্যে দুই দল সাতটি করে জিতেছে, আর তিনটি ম্যাচ হয়েছে ড্র।

১৯৯২ সালে টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করা জিম্বাবুয়ে ২০১২ সাল, অর্থাৎ প্রথম ২০ বছরে ৮৭টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৯টিতে জয় পায়।

এর মধ্যে ২৬টি টেস্টে ড্র করেছে জিম্বাবুয়ে, হেরেছে ৫২টি ম্যাচে।

এই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে যে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর প্রথম ২০ বছরে জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশের চেয়ে কম টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছে, আর জিতেছেও কম ম্যাচে।

টেস্ট ক্রিকেটে তাদের ২০ বছর পূর্ণ হয় ২০০২ সালে। এই সময়ে ১২৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলে শ্রীলঙ্কা ৩২টিতে জয় পায়। আর হারে ৫১টি টেস্টে, ড্র করে ৪৬টি টেস্ট ম্যাচ।

পাঁচ-দিনের ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মুখোমুখি হয়েছে ২০ বার, যার মধ্যে ১টি টেস্টে জিতেছে বাংলাদেশ ও ৩টি ম্যাচ হয়েছে ড্র। বাকি ১৬টিতে শ্রীলঙ্কা জয় পেয়েছে।

বাংলাদেশ নিজেদের ১০০তম টেস্ট ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একমাত্র জয়টি পায়।
পাকিস্তান

পাকিস্তানের সাথে এখন পর্যন্ত কোনো টেস্ট ম্যাচে জয় পায়নি বাংলাদেশ।

১১টি টেস্ট ম্যাচ খেলে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে ১০টিতে জয় পেয়েছে। ১টি মাত্র টেস্ট ড্র হয়েছে।

১৯৫২ সাল থেকে টেস্ট ক্রিকেট খেলছে পাকিস্তান।

প্রথম ১২০টি টেস্ট খেলতে পাকিস্তান সময় নেয় প্রায় ৩০ বছর। এই সময়ে তারা জয় পায় ২৩টি টেস্ট ম্যাচে, হারে ৩২টি ম্যাচে, আর ড্র করে ৬৫টি টেস্ট ম্যাচে।
ভারত

১৯৩২ সালে টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করে ভারত, আর তাদের প্রথম ১২০টি টেস্ট খেলতে সময় লাগে প্রায় ৩০ বছর।

এই সময়ে ভারত ১৬টি টেস্ট ম্যাচে জয় পায়, হারে ৪৯টিতে, আর ৫৬টি টেস্ট ড্র করতে সমর্থ হয়।

ভারতের সাথে বাংলাদেশ এখনও কোন টেস্ট ম্যাচে জয় পায়নি।

দুই দেশের অনুষ্ঠিত ১১টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে ভারত ৯টিতে জয় পেয়েছে, ২টি টেস্ট ড্র হয়েছে।

খেলা শুরুর প্রায় ২৬ বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৬ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথমবারের মতো কোনো টেস্ট ম্যাচে জয় পায়।

কিন্তু শুরুর সেই খারাপের পর থেকে ক্রমশ নিউজিল্যান্ড ক্রমশ তাদের অবস্থান শক্ত করে এবং ধীরে ধীরে বিশ্ব ক্রিকেটে সমীহ করার মতো একটি টেস্ট দল হয়ে ওঠে।

এই পরিসংখ্যানে হয়তো এটা বোঝা যাবে – এখন পর্যন্ত ৪৪২টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ১০১টিতে জয় পেয়েছে নিউজিল্যান্ড। হেরেছে ১৭৫টিতে, আর ড্র করেছে ১৬৬টি ম্যাচ।

এই মুহূর্তে টেস্ট ক্রিকেটের র‍্যাংকিংয়ে ২য় স্থানে আছে নিউজিল্যান্ড।

প্রথম ১২০টি টেস্ট ম্যাচে নিউজিল্যান্ড জয় পেয়েছিল মাত্র ৯টি টেস্টে। আর ওই সময়ে হারে ৫৫টি টেস্টে, ড্র করে ৫৬টি ম্যাচ।

নিউজিল্যান্ডের সাথেও বাংলাদেশ এখনও কোন টেস্ট ম্যাচে জয় পায়নি।

বাংলাদেশের সাথে এখন পর্যন্ত খেলা ১৫টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে নিউজিল্যান্ড ১২টিতে জয় পেয়েছে, ৩টি টেস্ট ড্র হয়েছে।

পুরনো টেস্ট টিমগুলোর মধ্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে বাংলাদেশের রেকর্ড তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত এক যুগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি ঠিক ততটা জোর দেয়নি, যতটা দিয়েছে ছোট দৈর্ঘ্যের ম্যাচের দিকে।

২০০৯ সালে বাংলাদেশ খর্ব শক্তির এক ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের সঙ্গে প্রথমবারের মতো টেস্টে জয় পায়। সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের মূল দলের ক্রিকেটাররা বোর্ডের সাথে দ্বন্দ্বের কারণে ধর্মঘটে চলে গিয়েছিল।

এরপরে অবশ্য ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাতে পারেনি বাংলাদেশ।

শেষ পর্যন্ত ২০১৮ সালে এসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বাংলাদেশ একটি দুই-ম্যাচের টেস্ট সিরিজে হোয়াইটওয়াশ করে।

ওয়েষ্ট ইন্ডিজ এবং বাংলাদেশ একে অপরের বিপক্ষে মোট ১৬টি টেস্ট খেলেছে – এর মধ্যে ৪টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ, ১০টি ম্যাচে জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আর ২টি টেস্ট ম্যাচ ড্র হয়েছে।

১৯২৮ সালে টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১২০তম টেস্ট খেলে ১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাসে।

প্রথম খেলা ১২০টি টেস্ট ম্যাচের মধ্যে ৪২টি ম্যাচেই জয় পায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ৩৮টি ম্যাচে হেরে যায় এবং ৩৯টি ম্যাচ ড্র হয়।

টেস্ট ক্রিকেটের দলগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের একটি করে জয় আছে ২০১৭ ও ২০১৬ সালে।

অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড টেস্ট ক্রিকেটের গোড়াপত্তন করা দু’টি দল।

টেস্ট ক্রিকেটের শুরু সেই ১৮৭৭ সালে। গোড়ায় এক দশকেরও বেশি সময়, অর্থাৎ ১৮৮৯ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড নিজেদের মধ্যেই কেবল টেস্ট ক্রিকেট খেলতো।

১৮৮৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা টেস্ট ক্রিকেট খেলা শুরু করে, আর ১৬-১৭ বছরের মধ্যেই তারা ইংল্যান্ডকে হারায় নিজেদের ১২তম টেস্টে এসে।

তবে টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম পাঁচ দশকে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া একে অপরের সাথে ১১৪টি ম্যাচ খেলে – এগুলোর মধ্যে ৪৭টি ম্যাচে জয় পায় অস্ট্রেলিয়া, ৪২টি ম্যাচে জয় পায় ইংল্যান্ড, আর তাদের ২৫টি ম্যাচ ড্র হয়।

অর্থাৎ এই বিগ টু’র কোনো দলই সেই সময় বড় ব্যবধানে এগিয়ে থাকেনি।

নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের তুলনায় শুরুর দিকে টেস্ট ক্রিকেটে কিছুটা বাজে অবস্থানে ছিল, কিন্তু কঠিন সময় পার করার পর নিউজিল্যান্ডকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

গত ২০ বছরে বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড তো বটেই, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড – কোনো দলের সাথেই সুবিধা করে উঠতে পারেনি টেস্ট ক্রিকেটে।

জিম্বাবুয়ের সাথে দাপুটে কিছু পারফরম্যান্স থাকলেও এখন পর্যন্ত পরিসংখ্যানের সমতায় রয়েছে দুই দল।

২০১৮ সালেও জিম্বাবুয়ের কাছে নিজেদের মাটিতে টেস্ট ম্যাচ হেরেছে বাংলাদেশ।

আর সবচেয়ে করুন ছিল আফগানিস্তানের সঙ্গে খেলার ফলাফল – ২০১৯ সালে সদ্য টেস্টে স্ট্যাটাস পাওয়া আফগানিস্তানের সাথে একমাত্র টেস্ট ম্যাচটিতে হেরে যায় বাংলাদেশ।

কিন্তু বাংলাদেশের এই অবস্থা কেন?
টেস্টে ফাস্ট বোলার নেই

বাংলাদেশের হয়ে এখন পর্যন্ত যারা টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন, তাদের তালিকায় প্রথম চারজনই স্পিনার।

এই চারজেনর পরেই আসে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার নাম, যিনি ২০০৯ সালের পর আর টেস্ট ক্রিকেট খেলেননি।

মাশরাফী ৩৬টি টেস্ট ম্যাচে ৭৮টি উইকেট নিয়েছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের হয়ে গত ১০ বছরে কোনো পেস বোলারই ৭৮টি উইকেট পাননি।

২০২০ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ চারশো’র বেশি রান তুলেছিল এক ইনিংসে।

এর আগে টানা ১০ ইনিংসের একটিতেও বাংলাদেশ কখনো ২৫০ ছুঁতে পারেনি।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ টেস্ট ক্রিকেটে নিজেদের মাটিতে আফগানিস্তানের সাথে এবং ভারত ও পাকিস্তানের মাঠে টানা ৪টি টেস্ট ম্যাচে হেরেছে।

এই চারটি টেস্টের মধ্যে তিনটিতে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ, আর আফগানিস্তানের সাথে হেরেছে ২২৪ রানে।

কোনো ইনিংসেই বাংলাদেশ ২৩৩-এর বেশি রানই করতে পারেনি।
সামগ্রিক কারণ

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটিং, বোলিং এবং ফিল্ডিং – এই তিন বিভাগেই দুর্বলতা বেশ চোখে পড়ার মতো।

একে ধৈর্য ধরে ব্যাট করতে না পারা, তার ওপর যখন উইকেটে থাকার প্রয়োজন তখন এমন শট খেলে আউট হওয়া, যেটা দেখে মনে হবে তখন বোধহয় বেশ দ্রুত রান তোলা জরুরি।

বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা টেস্ট ক্রিকেটে খুব কমই পুরো সেশন কোনো উইকেট না হারিয়ে ক্রিজে কাটিয়েছেন।

আরও দেখা গেছে যে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কোনো নির্দিষ্ট সেশন শেষ হওয়ার ঠিক আগে কিংবা দিনের একদম শেষ মুহূর্তে উইকেট খুইয়ে প্যাভিলিয়নে ফেরেন।

যদিও তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম বা সাকিব আল হাসানের মতো খেলোয়াড়রা মাঝেমধ্যে টেস্টে ব্যাটিংয়ের ব্যর্থতা ঢেকে দেন কিছু ইনিংস খেলে, বোলারদের মধ্যে অবশ্য সবাই মিলে প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেট তুলে নেওয়ার মতো আগ্রাসী মনোভাব খুব কমই দেখা যায়।

দেশের মাটিতে কিছু টেস্টে বাংলাদেশ স্পিন বোলিং দিয়ে ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের ২০ উইকেট নিয়েছে কখনও কখনও, কিন্তু ঘরের বাইরে এমনটা খুব কমই দেখা গেছে।

আর তাই, বাংলাদেশ শেষবার দেশের বাইরে টেস্ট সিরিজ জয়ের পর এক দশক পেরিয়ে গেছে।

সেই ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিকাংশ ক্রিকেটার ধর্মঘটে যাওয়ার পর একটি দ্বিতীয় সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজ টিমের সঙ্গে বাংলাদেশ ২-০ ব্যবধানে টেস্ট সিরিজ জিতেছিল।