ঐক্যের শপথে মুষ্টিবদ্ধ সিলেটের কোটি জনতা। আল্লামা জুনায়দ বাবুনগরীর আগমনে আন্দোলিত শাহজালালের বিস্তৃত জনপদ।

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ২২, ২০২০
ঐক্যের শপথে মুষ্টিবদ্ধ সিলেটের কোটি জনতা। আল্লামা জুনায়দ বাবুনগরীর আগমনে আন্দোলিত শাহজালালের বিস্তৃত জনপদ।

||মন্জুরে মাওলা||

সিলেটের আকাশ বাতাস সারা দিনমান প্রতিধ্বনিত হয় আজ রাসুলপ্রেমের শ্লোগানে। শাহজালালের মাটি আবার ফিরে যায় প্রিন্সিপাল হাবীবের সেই চিরচেনা উত্তাপ ও তেজে। বিশ্বনবীর অবমাননার প্রতিবাদে আজ ছিল সিলেটে হেফাজতের বিক্ষোভ সমাবেশ। অনুষ্ঠান হবে বিকেলে, কিন্তু সকাল থেকেই বাড়তে থাকে সমাবেশমুখী স্রোত। জনতার উথলে উঠা ঢেউয়ে তরঙ্গায়িত হয় দুর-দূরান্তের পথ- ঘাট, রাস্তা-মাঠ। বেলা ১টায় নগরীর সকল প্রবেশমুখে থামিয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন উপজেলা, গ্রাম, মহল্লা থেকে ছুটে আসা মানুষের গাড়িবহর। তারপর চারিদিক থেকে স্রোতের বেগে শহরে প্রবেশ করতে থাকে মিছিলের পর মিছিল। এক অবিস্মরনীয় ঈমানী তরঙ্গে সারাদিন দোল খেতে থাকে শাহজালালের পবিত্র শহর।

ঐতিহাসিক এই সমাবেশে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নবনির্বাচিত আমীর, কোটি মানুষের ভালোবাসা ও ঐক্যের প্রতীক শায়খুল হাদীস আল্লামা জুনায়দ বাবুনগরী সিলেটবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, “দেশের সমস্ত মসজিদের মুসল্লিরা হেফাজতের সদস্য, সকল মসজিদের ইমাম, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকগণ হেফাজতের সদস্য। সকল স্কুল-কলেজের ধর্মপ্রাণ মানুষ হেফাজতের সদস্য। নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত হলো হেফাজতের কর্মসূচী। হেফাজত বাংলাদেশে নামাজ কায়েম করতে চায়। ইসলামের শত্রু, রাসূলের দুশমন, নাস্তিক- মুর্তাদদের মুলোৎপাটনের জন্যই হেফাজতে ইসলামের অভ্যুদয়। তিনি বলেন, হেফাজত সরকার বিরোধী সংগঠন নয়, আবার সরকার দলীয় সংগঠনও নয়। বিশ্বের দুই শত কোটি মুসলমানের ভালোবাসার প্রতীক রাসূল সা. এর বিরুদ্ধে ফ্রান্স সরকার ব্যঙ্গ করে, কটাক্ষ করে মুসলমানদের কলিজায় আগুন লাগিয়েছে। রাসূলের এই অপমানের মোকাবেলায় সর্বস্ব দিয়ে প্রতিরোধ করবে এ দেশের মুসলিম জনসাধারণ।
তিনি কাদিয়ানীদেরকে কাফের ঘোষণা করে বলেন,’ আমি মনে করি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও কাদিয়ানীদেরকে মুসলিম বলে মনে করেন না। শুধু ব্যাক্তিগতভাবে কাদিয়ানীদেরকে কাফের মনে করলে হবেনা। রাষ্ট্রীয়ভাবেও কাদিয়ানীদেরকে কাফের ঘোষণা করতে হবে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে কাদিয়ানীদেরকে কাফের ঘোষনায় কোন সমস্যা থাকার কথা নয়।’ তিনি বলেন,’আমরা হিন্দুদেরকে কাফের ঘোষনার দাবী জানাই না, কারণ তারা কাদিয়ানীদের মতো মুসলিম পরিভাষা ব্যবহার করে না, নিজেদেরকে মুসলিম দাবী করে না। কাদিয়ানীরা অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ন্যায় নিজেদের ধর্ম পরিচয়ে এদেশে বাস করুক, আমাদের কোন আপত্তি নেই। এই কাদিয়ানীরাই বিশ্ব নবীর বড় শত্রু।’

সমাবেশ চলাকালে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বক্তৃতার সময় নিরবতায় ছেয়ে যায় চারপাশ। নগরবাসীর ঔৎসুক্য ও উৎসাহ ছিল হেফাজতে ইসলাম ও নেতৃবৃন্দকে ঘিরে। ছিল সমাবেশের প্রতি তাদের সকলের সশ্রদ্ধ আন্তরিক সমর্থন।

ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় মদদে মহানবী সা. এর ব্যঙ্গ চিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে হেফাজতে ইসলাম সিলেটের উদ্যোগে রেজিস্টারী মাঠে অনুষ্ঠিত আজকের বিশাল সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন, হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা, শায়খুল হাদীস আল্লামা জিয়া উদ্দীন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, হেফাজতের মহাসচিব আল্লামা নূর হুসাইন কাসিমী, নায়েবে আমীর প্রফেসর ড. আহমদ আবদুল কাদের, উপদেষ্টা শায়খুল হাদীস আল্লামা মুফতী রশিদুর রহমান ফারুক বর্ণভী, শায়খুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক আকুনী, নায়েবে আমীর শায়খুল হাদীস আল্লামা নূরুল ইসলাম খান সুনামগঞ্জী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী, কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট মাওলানা আবদুর রকীব ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন।

সমাবেশের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রিন্সিপাল হাফিজ মাওলানা মজদুদ্দিন আহমদ ও মাওলানা মুহিউল ইসলাম বুরহান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব শায়খুল হাদীস আল্লামা নূর হোসাইন কাসিমী বলেন, “আল্লাহর রাসূল সা. এর শান ও মান রক্ষায় মুসলিম জাতি রক্ত দিতে প্রস্তুত। যতদিন আল্লাহর হাবীবের শানে বেআদবী করা হবে আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করে যাবো। আমরা সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই, সংসদে অবিলম্বে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনতে।’

নায়েবে আমীর প্রফেসর ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, ‘বিশ্বের যে কোন স্থানে নবীর অবমাননা সহ্য করা হবেনা। বাংলাদেশে নবীর দুশমনদের প্রতিহত করা হবে।’

হেফাজতের উপদেষ্টা শায়খুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক বলেন, ‘মহানবী সা. এর প্রতি ভালোবাসা বিশ্ব মুসলমানের হৃদয়ে যেভাবে রয়েছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে নবীর সুন্নাত সমূহ পালন করতে হবে।’

কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন,’ফ্রান্স ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশে ফ্রান্স দুতাবাস থাকবে না।

সভাপতির বক্তব্যে হেফাজতের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টা শায়খুল হাদীস আল্লামা জিয়া উদ্দিন বলেন, আমরা রাসূল সা. এর ভালোবাসায় জমায়েত হয়েছি। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আজকের সমাবেশে লাখো মানুষের জমায়েত প্রমান করে রাসূলের সা. এর জন্য সিলেটবাসী যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।

মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান, প্রিন্সিপাল সামিউর রহমান মুসা ও মাওলানা বিলাল আহমদ ইমরানের যৌথ পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, শায়খুল হাদীস মুফতী মুজিবুর রহমান, শায়খুল হাদীস মাওলানা আউলিয়া হোসাইন, মাওলানা শায়খ আবদুল বাসির, হাফিজ মাওলানা নূরুজ্জামান, মাওলানা খলিলুর রহমান, অধ্যাপক বজলুর রহমান, মাওলানা ইকবাল হোসাইন, মাওলানা আহমদ বেলাল, মাওলানা গাজী রহমতুল্লাহ, হাফিজ আবদুর রহমান সিদ্দিকী, মুফতী ফয়জুল হক জালালাবাদী, মাওলানা নাসির উদ্দিন, কারী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা আতাউর রহমান কোম্পানিগঞ্জী, সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা আহমদ সগীর, মওলানা ইউসুফ খাদিমানী, মাওলানা মুখলিছুর রহমান, মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব, মাওলানা এমদাদুল্লাহ, মাওলানা সাইফুল্লাহ, মাওলানা কাজী আবদুল ওয়াদুদ, মাওলানা শাহ মমশাদ আহমদ, মাওলানা আবদুল মালিক কাসিমী, মাওলানা শামসুদ্দিন মুহাম্মদ ইলয়াস, মাওলানা মুজিবুর রহমান কাসিমী, হাফিজ মাওলানা ফখরুজ্জামান, মাওলানা এবাদুর রহমান, মাওলানা আবদুল গফফার, মাওলানা রফিকুল ইসলাম, মাওলানা এমরান আলমসহ অন্যান্যরা।

সমাবেশের মঞ্চ রেজিস্টারী মাঠে স্থাপিত হলেও পূর্ব দিকে বন্দরবাজার, পশ্চিম দিকে কাজির বাজার ব্রীজ পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় এ বিস্তৃত জমায়েত।

সমাবেশে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সংসদে নিন্দা প্রস্তাব পাশ, সিলেটে হোটেলসমূহে মদের অনুমোদন বাতিল ও মাদকের অবাধ ছডাছডি বন্ধ ও রায়হান হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী সম্বলিত ৩ দফা দাবী পেশ করা হয়।

স্মরণীয় এ সমাবেশটি শেষ হয়ে যায় সুর্য ডুবার আগে। কিন্তু ঐক্যের শক্তি আর ইত্তেফাকের দ্যুতি গেঁথে রেখে যায় সমগ্র সিলেটবাসীর কোমল অন্তরে…।