গুম হয়ে যাওয়া মানুষদের খুঁজে বের করতে এক নারীর আন্দোলন

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ২৫, ২০২০
গুম হয়ে যাওয়া মানুষদের খুঁজে বের করতে এক নারীর আন্দোলন

সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এমন পরিবারগুলোকে নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশের সানজিদা ইসলাম। তাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে আনতে একটি কর্মসূচী চালাচ্ছেন।

সানজিদা ইসলাম তার এই সংগঠনের নাম দিয়েছেন মায়ের ডাক। তিনি নিজে এই সংগঠনের সমন্বয়কারী।

মিজ ইসলামের ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমনকে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ২০১৩ সালের চৌঠা ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বিএনপির তৎকালীন ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ২৫ নম্বর ওয়ার্ড) সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাজেদুল ইসলাম সুমন। এরপর থেকে তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর সংবাদ সম্মেলন
নিখোঁজ সাজেদুল ইসলাম সুমনের পরিবারসহ মায়ের ডাক-এর সদস্য বাকী পরিবারগুলোর অভিযোগ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাই তাদের তুলে নিয়ে গেছে। যদিও সরকার, পুলিশ বা র‍্যাবের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

মিজ ইসলাম বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলছেন, ”যখন আমার নিজের ভাই গুম হয়ে যায়, তখন আমরা ঘটনাগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করি। সেই সময় অনেকগুলো ঘটনা ঘটে, যেখানে গুমের ঘটনা ঘটে। তাদের পরবর্তীতে আর পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি।”

এই বিষয়ে ক্যাম্পেইন করার জন্য গুমের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারগুলো একত্রির হয় ‘মায়ের ডাক’-এর ব্যানারে।

মিজ ইসলাম বলছেন, ”গুম হওয়ার পরিবারগুলোর মায়েদের যে আর্তনাদ, সেটা তুলে ধরাই আমাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য।”

এই পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে প্রশাসনিক পর্যায়ে যে আবেদন করা উচিত, হাইকোর্টে রিট থেকে শুরু করে অফিসিয়াল যে পদক্ষেপগুলো নেয়ার, সেটাই তারা করার চেষ্টা করছেন।

”আমাদের হিসাবে এখন পর্যন্ত ৫৫২ জনের গুম হওয়ার তথ্য রয়েছে। কিন্তু এটা আসলে আরও বেশি হবে। কারণ অনেক পরিবার আছে যারা হয়তো ততোটা শিক্ষিত নয় যে, তথ্য সংগ্রহ করে রাখছে, সামনে এগিয়ে এসে বলতে পারছে।” সানজিদা ইসলাম বলছেন।

গুম হওয়া ভাইয়ের ফেরার অপেক্ষায় আছেন যে বোন
‘তারা জিজ্ঞেস করে, আমার বাবা কই, উত্তর দেয়ার ভাষা আমার থাকে না’
গুমের শিকার ‘বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীরা’

‘জীবনের ভয় পাচ্ছি’
বাংলাদেশে এখন অনেকেই এসব বিষয়ে কথা বলতে চান না। তারা এ বিষয়ে কাজ করতে কতটা সোচ্চার হতে পারছেন?

মিজ ইসলাম বলছেন, ”ভয় যে পাই না, তা নয়। সবাই জীবনের ভয় পাচ্ছি। কিন্তু যখন জানি যে আমার নিজের ভাই বা আমাদের পরিবারের একজন সদস্যকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে, তখন আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্যই এটা করতে হচ্ছে। তখন আর ভয় থাকে না।

”আমি যখন জানি যে, আমার ভাইকে নির্যাতন করা হচ্ছে, তাদের আন্ডারগ্রাউন্ড সেলে রাখা হচ্ছে, তখন আর আমার জীবনের জন্য কোন ভয় কাজ করে না। তবে আমাদের যে ভয় দেখানো হচ্ছে না, হুমকি দেয়া হচ্ছে না, তা নয়।” তিনি বলছেন।

তার বক্তব্য, ছয় বছর ধরে তারা যে আন্দোলন করছেন, শুরু থেকেই তাদের অনেক রকম হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

কাদের কাছ থেকে বাধা আসছে?
সানজিদা ইসলাম বলছেন, ”আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে আমরা বাধা পাই। তাছাড়া স্থানীয় যে প্রশাসন রয়েছে, তাদের কাছ থেকেও বাধা আসে। আমরা যদি কোন ক্যাম্পেইন করতে যাই, অনেক সময় দেখা যায় তারা অনুমতি দেন না। এমনকি এমন অনেক অনুষ্ঠান করেছি, তা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় প্রচার করা হয়নি। প্রেসক্লাবে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি।”

”আমার ভাই গুম হয়ে আছে, অথচ থানা থেকে পুলিশ আমার ভাইকে খুঁজতে এসেছে, যে সুমন কোথায়? যেখানে তাদের উচিত দেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে তাকে খুঁজে বের করা, অথচ তারা তাকে গ্রেপ্তার করতে এসেছে। এরকম ঘটনা তিন চারবার হয়েছে।”

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের একজন পরিচালক নূর খান বিবিসি বাংলাকে এর আগে বলেছেন, গত আট বছরে এরকম গুম হওয়া তিন শতাধিক মানুষের অধিকাংশের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা এখনো জানা যায় নি।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলছেন, গুম হওয়ার পেছনে সরকারের কোন হাত নেই। বিবিসি বাংলাকে ২০১৫ সালে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন “গুমের ঘটনার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনী জড়িত নয়। কোন গুম আমাদের এখানে হয় না, তারা আত্মগোপন করে।”

পরবর্তীতেও এই বিষয়ে সরকারের বক্তব্যের বদল হয়নি।

এই আন্দোলনে কতটা সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে?
সানজিদা ইসলাম বলছেন, তাদের আন্দোলনে সাধারণ মানুষের সমর্থন রয়েছে বলেই তাদের বিশ্বাস।

মিজ ইসলাম বলছেন, ”আমার মনে হয়, সাধারণ মানুষ অবশ্যই সমর্থন দিচ্ছে। কারণ আমাদের এখানে কোন রাজনৈতিক দিক নেই। আমরা সরকার বা বিরোধী, কোন পক্ষের নই। এটা আসলে একটা মানবিক আবেদন রাখে সবার কাছে। আমার মনে হয় যে, সবাই আমাদের সাথে আছে।”

আন্দোলনের সুফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে?
মায়ের ডাক সংগঠনের সমন্বয়কারী সানজিদা ইসলামের বিশ্বাস, তার ভাইয়ের মতো গুম হয়ে যাওয়া সবাই আবার ফিরে আসবে।

”গুম হয়ে যাওয়া কিছু মানুষ কিন্তু আমার ফেরত আসছে।”

পনেরো মাস পরে ফেরত আসা সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের উদাহরণ তুলে দিয়ে তিনি বলেন, ”আরও অনেকেই আছেন যাদের ফেরত দেয়া হয়েছে বা ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আমরা আশা পাই ওখানে। আমাদের জানানো হোক, আমাদের পরিবারের সদস্যরা কোথায় আছে।”

সরকারের তরফ থেকে কী বলা হচ্ছে?
বাংলাদেশে বেশ কিছু গুমের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেও এসব বাহিনী এবং সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ নাকচ করে দেয়া হয়েছে।

বরং সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিখোঁজ হয়ে যাওয়া লোকদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।