ক্ল্যাশ অব লয়ালটিজ: সাদ্দাম হোসেন যেসব বিগ বাজেটের ছবির পরিকল্পনা করেছিলেন

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ৩০, ২০২০
ক্ল্যাশ অব লয়ালটিজ: সাদ্দাম হোসেন যেসব বিগ বাজেটের ছবির পরিকল্পনা করেছিলেন

ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন ১৯৮০ সালে তার দেশে খুব বড় বাজেটের কিছু ছবি তৈরির এক প্রকল্প শুরু করেছিলেন। উদ্দেশ্য, ইরাককে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র শিল্পের এক বড় কেন্দ্রে পরিণত করা। ‘ক্ল্যাশ অব লয়ালটিজ’ নামের একটি ছবির প্রায় সম্পূর্ণ চিত্রায়ন করা হয় ইরাকে। তখন ইরানের সঙ্গে ইরাকের যুদ্ধ প্রায় শুরু হতে হচ্ছে। সাদ্দাম হোসেনের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, এমন দুজনের সঙ্গে কথা বলেছেন বিবিসির মাইক ল্যানচিন। ইতিহাসের সাক্ষীর এই পর্বে সেই কাহিনী:

ব্রিটিশ-ইরাকী লতিফ জোরেফানি ১৯৫০ এর দশক থেকে যুক্ত চলচ্চিত্রের সঙ্গে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে কম বাজেটের কয়েকটি ছবিও তৈরি করেছেন। সাদ্দাম হোসেনের সরকারের সঙ্গে তার কিছু যোগাযোগ ছিল।

লতিফ জোরেফানির কাছে প্রস্তাব আসলো, ইরাকী সরকার কয়েকটি বড় বাজেটের ছবি করার পরিকল্পনা করছে। তিনি এই কাজে যুক্ত হতে আগ্রহী কিনা। লতিফ জোরেফানি খুবই খুশি হলেন।

“ইরাক যাতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র তৈরির এক বড় কেন্দ্র হয়ে ওঠে, সেজন্যে সাদ্দাম হোসেন খুবই উৎসাহী ছিলেন। ইরাক থেকে যেসব ছবি তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছিল, ‘ক্ল্যাশ অব লয়ালটিজ’ ছিল সেই তালিকার প্রথম ছবি। ইরাক যেন হতে চলেছিল টাইগ্রিসের তীরের বলিউড।”

সাদ্দাম হোসেনের লোকজন বলেছিল, তারা চায় এই ছবিটা হবে আন্তর্জাতিক মানের। এই ছবির কাহিনী ছিল ১৯২০ সালে ইরাকে সংঘটিত এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে। তখন ইরাক এক ব্রিটিশ উপনিবেশ। সেখানে এক ব্রিটিশ অফিসারকে হত্যা করা হয়েছিল। ১৯২০ এর দশকের ব্রিটিশ দখলদারিত্বে বিরুদ্ধে ইরাকে বিপ্লব হয়েছিল, এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল সেই পটভূমিতে।

এটা কি সাদ্দাম হোসেনের আত্ম-অহমিকা বাড়ানোর জন্য নেয়া একটি প্রকল্প? লতিফ জোরেফানি তা মনে করেন না।

“না, না, আসলে ব্যাপারটা তা নয়। বাগদাদে আমাদের বন্ধুরা আসলে খুবই উৎসাহী ছিল। হ্যাঁ, তারা সাদ্দাম হোসেনের কাছে গিয়েছিল। তারা বলেছিল, স্যার, আমরা যদি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ব্যবসায় ঢুকতে চাই, আমাদের টাকা ঢালতে হবে। তখন তিনি বলেছিলেন, ঠিক আছে, যা কিছুই লাগুক – তোমরা কাজ শুরু করে দাও।”

লতিফ জোরেফানিকে বলা হয়েছিল, ইরাকীরা বড় বাজেটের যেসব ছবির পরিকল্পনা করছে, ক্ল্যাশ অব লয়্যালটিজ হবে তার প্রথম ছবি। আর যেহেতু অর্থ কোন সমস্যা নয়, তাই সেই সময়ের সবচেয়ে নামকরা কয়েকজন ব্রিটিশ তারকাকে এই ছবির জন্য নেয়া হলো।

তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ তারকা অলিভার রীড, হেলেন রায়ান এবং জেমস বোলাম। এরা বড় বড় কয়েকটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তবে লতিফ জোরেফানি চাইছিলেন, এই ছবিতে কিছু ইরাকী অভিনেতা-অভিনেত্রীও যেন সুযোগ পান। ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি ছবির শুটিং শুরু হলো।

ছবিতে যেসব ইরাকী অভিনেতা-অভিনেত্রী কাজ করেন, তাদের একজন ছিলেন ফাতিমা আল-রুবাই।

“প্রথম যেদিন ছবির চিত্রায়ন শুরু হলো, আমরা ছিলাম খুশিতে আত্মহারা। এটা ছিল এমন একটা কাজ, যা ছিল ইরাকের ইতিহাসের অংশ।”

ফাতিমা আল-রুবাই একজন সুপরিচিত ইরাকী অভিনেত্রী। এখনো বাগদাদেই থাকেন। এই ছবিতে তাকে নেয়া হয়েছিল দারি আল মাহমুদের স্ত্রীর চরিত্রে। ১৯২০ সালে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ইরাকে যে বিপ্লব হয়, সেটির এক বড় নায়ক ছিলেন দারি আল মাহমুদ। সেই ছবিতে অভিনয়ের অনেক স্মৃতি এখনো তার মনে আছে।

“একটি দৃশ্যে অভিনয়ের জন্য আমাকে ঘোড়ায় চড়ার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছিল। কিন্তু যখন এই দৃশ্যের চিত্রায়ন শুরু হলো, ঘোড়াটি আমাকে নিয়ে ছুটে চলে গেল। এই অভিজ্ঞতা আমি ভুলতে পারবো না। আমি মোটেই ভয় পাইনি। এই ছবিতে কাজ করতে পেরে আমি ভীষণ খুশি ছিলাম।”

লতিফ জোরেফানি তখন লন্ডনেই থেকে গিয়েছিলেন এই ছবির নানা কাজ সামাল দেয়ার জন্য। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে খবর এলো, ইরাকের সঙ্গে প্রতিবেশী ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। লন্ডনে বসেই তিনি সেই খবর পেলেন।

“আমার সুইচবোর্ডে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। ১৯৮০ সালে ইংল্যান্ডের টেলিভিশনে এই যুদ্ধের যেসব দৃশ্য দেখানো হচ্ছিল, ইরাকের সর্বত্র রকেট পড়ছে, যুদ্ধ চলছে- তা দেখছিল এখানকার লোকজন। অনেকে উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করছিল। ওরা বলছিল, আমার স্বামী ইরাকে, আমি চাই তাকে ফিরিয়ে আনা হোক। কাজেই তখন আমাদের ছবির কাজ বন্ধ করতে হলো।”

“কিন্তু ইরাকের সরকার আসলে তখন এরকম একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছিল যে, সবকিছু স্বাভাবিক আছে। তারা বলছিল, ইরানের সঙ্গে সীমান্তে আমাদের ছোটখাটো লড়াই চলছে বটে, কিন্তু সব কিছু স্বাভাবিক থাকবে। কাজেই কয়েক সপ্তাহ কাজ বন্ধ রাখার পর আমাদের আবার কাজ শুরু করতে বলা হলো।”

কিন্তু সাদ্দাম হোসেন আবার এই ছবির কাজ শুরু করার নির্দেশ দিলেও লতিফ জোরেফানিকে তখন এই ছবির চিত্রায়নের কাজ আয়োজন করতে গিয়ে নানা রকম সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল ছবির সেটের জন্য নানা জিনিস কীভাবে ইরাকে পাঠানো যায়।

“যুদ্ধ দৃশ্যের জন্য নানা রকম সাজসরঞ্জাম, বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের সাজসরঞ্জাম পাঠাতে গিয়ে আমাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল। বড় বড় লরিতে করে এসব ইউরোপের ওপর দিয়ে তুরস্ক সীমান্ত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তুর্কীরা বললো, এসব জিনিস তো আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে তোমরা নিতে পারবে না, কারণ ইরাক আর ইরানের মধ্যে এই যুদ্ধে আমরা নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছি।”

“তখন তাদের কাছে ব্যাখ্যা করে বলতে হচ্ছিল, এগুলো সত্যিকারের যুদ্ধ সরঞ্জাম নয়, এসব বন্দুক দিয়ে গুলি করা যায়না, ছবির চিত্রায়নের জন্যই এগুলো ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তারপরও আমরা তুরস্ক দিয়ে এগুলো নিতে পারিনি। সেখান থেকে আমাদের অনেক ঘুরে গ্রীসের ভেতর দিয়ে, তারপর জাহাজে করে প্রথমে লেবানন, তারপর সিরিয়ায় নেয়া হয়। তারপর মরুভূমি পেরিয়ে বাগদাদে পৌঁছায় এসব সামগ্রী। ততদিনে আমি আসলে বেশ হতাশ হয়ে পড়েছিলাম।”

ফাতিমা আল রুবাই মনে করতে পারেন, এই যুদ্ধের দামামার মধ্যেও তারা ছবির কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

“যুদ্ধ তখনো চরমে পৌঁছেনি। তারপরও আপনার দেশের বিরুদ্ধে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন তো আপনি চিন্তায় আছেন। কিন্তু যখন আপনি কাজ করছেন, তখন তো আপনি আপনার মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হতে দিতে পারেন না।”

কাজেই বাগদাদে এবং অন্য যেসব শহরে যুদ্ধ নেই, সেখানে ক্ল্যাশ অব লয়ালটিজ ছবির চিত্রায়ন অব্যাহত রইলো। তবে একটি ব্রিটিশ ট্রেনের ওপর হামলা করা হচ্ছে-এরকম একটা দৃশ্যের চিত্রায়ন করা হয়েছিল ইরান সীমান্তের খুব কাছে।

লতিফ জোরেফানি জানান , এই ঘটনা নিয়ে ইরানীরা বেশ অদ্ভুত এক দাবি করে বসেছিল।

“যেদিন আমরা এই দৃশ্য ধারণ করি, সেদিন ইরানী গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, ইরানের বিপ্লবী বাহিনী ইরাকের ভেতর হামলা চালিয়ে একটি সামরিক ট্রেন ধ্বংস করে দিয়েছে, হত্যা করেছে অনেক ইরাকী সৈন্য।”

তবে লতিফ জোরেফানিকে তখন আরেকটি বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। তাদের ছবিতে সবচেয়ে খ্যাতিমান তারকা ছিলেন অলিভার রীড। তিনি খুব বেশি মদ পান করতেন। খুবই আপত্তিকর আচরণ করতেন।

এই ছবির ক্রুরা যে হোটেলে থাকছিলেন, অলিভার রীড সেখানে প্রায়শই উচ্ছৃঙ্খল পার্টি দিতেন। একবার তিনি বাগদাদের এক রেস্টুরেন্টে অন্য অতিথিদের সামনে একটি ওয়াইনের বোতলে প্রস্রাব করেছিলেন।

“আমার কাছে ইরাকের মন্ত্রীদের কাছ থেকে টেলেক্স বার্তা আসলো। তারা বললো, এই লোকটাকে ফেরত নিয়ে যাও। আমরা ওকে এখানে চাই না। কিন্তু লাখ লাখ পাউন্ডের বাজেটে তৈরি হচ্ছে এই ছবি, এর অর্ধেক কাজ শেষ হয়ে গেছে, এই অবস্থায় ছবির প্রধান অভিনেতাকে কিভাবে আমি বাদ দেব? কাজেই আমাকে তখন বেশ চাপ দিতে হলো সবার ওপর। আমি বললাম, আল্লাহর দোহাই, একটু সহ্য করো।”

“আমি দেখেছি, অলিভার রীড সবসময় মদ পান করতেন। তিনি বিয়ারের ক্যানগুলো একটি পিরামিডের আকৃতিতে সাজাতেন। তারপর তিনি অভিনয় করতে যেতেন।”

লতিফ জোরেফানি জানান, তবে মদের প্রতি এই আসক্তি সত্ত্বেও কাজের ব্যাপারে অলিভার রীড ছিলেন খুব আন্তরিক।

“তিনি হয়তো সারারাত মদ পান করছেন, সবার সঙ্গে ঝগড়া করছেন, হোটেলে নানা রকম মজার কৌতুক করছেন। কিন্তু দেখা গেল, পরের দিন সকাল ছয়টায় অলিভার রীড ঠিকই সেটে এসে হাজির হচ্ছেন। তিনি তার কাজ ঠিকমতই করছেন।”

এ ঘটনার পর তাদের দৃশ্যের চিত্রায়ন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অলিভার রীড এবং অন্যান্য অভিনেতা-অভিনেত্রীকে দ্রুত ইরাক থেকে নিয়ে আসা হলো। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তখন ব্যাপক রূপ নিচ্ছে। এই ফিল্মের বাকী ক্রুরা দ্রুত তাদের কাজ শেষ করলেন।

লতিফ জোরেফানি ক্ল্যাশ অব লয়ালটিজ ছবির এডিটিং এর কাজ শেষ করলেন লন্ডনে। ১৯৮৪ সালে লন্ডন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে এই ছবিটি দেখানো হয়েছিল। তবে ছবিটি কখনোই পশ্চিমাদেশগুলোর সিনেমা হলে মুক্তি পায়নি।

ইরাকে যে তিনি আর কোন ছবি তৈরির সুযোগ পাননি, তাতে হতাশ হয়েছিলেন লতিফ জোরেফানি। তবে ইরাকের এখনকার অবস্থা দেখে তিনি আরও বেশি হতাশ।

“আমরা ছবি বানাই, আমরা স্বপ্ন দেখি, আমরা আশা নিয়ে বাঁচি। কিন্তু আজকের ইরাকে দিকে যদি তাকাই, গত প্রায় তিরিশ বছরের যুদ্ধ, বোমা, ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে লড়াইয়ের পর ইরাকের অবস্থাটা কি? সেখানে কি কোন ছবি তৈরি হয়? আমরা যা করেছিলাম, তার তুলনায় সেখানে কিছুই হয় না এখন।”

“আমি আশা করি, ভবিষ্যতে এমন একটা সময় আসবে, যখন পরিস্থিতি শান্ত হবে, তখন আমরা আমাদের পুরোনো চিত্রনাট্যগুলো আবার ধুলো ঝেড়ে বের করবো।”

লতিফ জোরেফানি এখন থাকেন দক্ষিণ ইংল্যান্ডে। তার বাড়ির গ্যারাজে এখনো সেই ছবিটির আদি ফুটেজ সংরক্ষিত আছে। ফাতিমা আল রুবাই এখনো বাগদাদে থাকেন। তিনি এখনো চলচ্চিত্র শিল্পে কাজ করেন।