করোনা ভ্যাকসিন হালাল-হারাম বিতর্ক, ইসলাম কি বলে?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত জানুয়ারি ২১, ২০২১
করোনা ভ্যাকসিন হালাল-হারাম বিতর্ক,  ইসলাম কি বলে?

||মুফতি ওমর ফারুক||

করোনা ভাইরাসের টিকা দেয়া শুরু হয়েছে বিভিন্ন দেশে৷ এর মধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে করোনার এই টিকা হালাল নাকি হারাম৷ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিভিন্ন দেশ তো বটেই ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও এ নিয়ে অসংখ্য বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

বায়োনটেক-ফাইজারের টিকা অনুমোদন দেয়ার মাধ্যমে বিশ্বে প্রথম করোনা টিকা দেয়া শুরু করে যুক্তরাজ্য৷ তখনই শুরু হয় এ বিতর্ক৷ ইসলামের দৃষ্টিতে শূকরের মতো কিছু পশুকে হারাম বা খাওয়ার জন্য নিষিদ্ধ বলে মনে করা হয়৷ কিন্তু টিকা তৈরিতে যে কোলেস্টেরল ব্যবহার হয়েছে তার উৎস নিয়েই বাধে বিপত্তি৷ মুসলিমদের আশঙ্কার জায়গা ছিল এই কোলেস্টেরল শূকরের চর্বি থেকে ব্যবহার না হলেও সঠিকভাবে জবাই না করা অন্য কোনো পশু, যেমন গরুর চর্বি থেকেও তৈরি হতে পারে৷
করোনার ভ্যাকসিন এর উপাদানঃ
কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন (করোনার ভ্যাকসিন) কি কি উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়েছে তা এখন ও কোন দেশ স্পট করে বলেনি।তবে কিছু কিছু উপাদানের কথা জানা গিয়েছে।

মডার্নার ভ্যাকসিনের মতো ফাইজারের ভ্যাকসিনেও লিপিড ন্যানো পার্টিকেলস ব্যবহার করা হয়েছে। এটি আরএনএকে আবৃত করে। এটি এমআরএনএকে কোষের মধ্যে প্রবেশে সাহায্য করে। এই পার্টিকেলসগুলোর আকৃতি ১০০ ন্যানোমিটারের মতো। করোনাভাইরাসের আকৃতিও একই। ফাইজার জানিয়েছে তারা ৪ (চার) ধরণের আলাদা লিপিড ব্যবহার করেছে ভ্যাকসিন তৈরিতে।

এই ভ্যাকসিনে ব্যবহার করা হয়েচে ৪ (চার) ধরণের লবণও। এরমধ্যে এক প্রকৃতির লবণ হচ্ছে সাধারণ খাওয়ার লবণ। এটি একসঙ্গে ফসফেটের স্যালাইন তৈরি করে। এরফলে ভ্যাকসিনের পিএইচ মান ও অম্লতা শরীরের গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রাখে। এছাড়া যুক্ত করা হয় চিনিও। এটি ন্যানো পার্টিকেলসগুলোকে একটির সঙ্গে
আরেকটির যুক্ত হওয়া থেকে রক্ষা করে।
ফাইজার, মোডার্না এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকা মুখপাত্ররা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, শুয়োরের মাংস তাদের তৈরি করোনা টিকার অংশ নয়। তবে শুয়োরের মাংস থেকে উদ্ভূত জিলেটিনগুলি স্ট্যাবিলাইজার হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। টিকা মজুতকরণ ও যাতায়াতের সময় সেগুলো নিরাপদ এবং কার্যকরী রাখতেই এই প্রয়োগ।
সরাসরি শূকর বা হারাম পশুর মাংস ও মাংসজাত পণ্য গ্রহণ ইসলাম ও ইহুদি ধর্মে হারাম৷ কিন্তু টিকা বা ঔষধে শূকরজাত রাসায়নিকের ব্যবহার হারাম কি না এ নিয়ে মতভেদ রয়েছে৷ ব্রিটিশ ইসলামিক মেডিক্যাল আসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ড. সালমান ওয়াকার বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, শূকরের চর্বি থেকে যখন জেলাটিন ব্যবহার করা হয় তখন তা বড় ধরনের রাসায়নিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়৷ প্রশ্ন হচ্ছে তখন সেই রাসায়নিক দ্রব্যটিকেও ধর্মীয় দৃষ্টিতে হারাম বলা হবে কিনা৷
অতীতে নানা টিকা নিয়ে একই বিতর্ক হয়েছে৷ তখন মোটামুটি এক ধরনের ঐক্যমত্যে পৌঁছান বিশেষজ্ঞরা৷ সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক হারুনুর রশীদ বলেন, টিকার ব্যবহার না হলে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ ফলে এমন ক্ষেত্রে শূকরজাত জেলাটিন ব্যবহার করা যাবেবলে মোটামুটি অনেকেই একমত হয়েছিলেন৷
কিন্তু ইন্দোনেশিয়াতে অবশ্য ওলামারা অন্যরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অতীতে৷ ২০১৮ সালে হাম ও রুবেলার টিকায় জেলাটিন ব্যবহার করা হয় বলে এই দুই টিকাকে হারাম বলে ঘোষণা করে দেশটির ওলামা কাউন্সিল৷ সন্তানকে টিকা না দেয়ারও আহ্বান জানানো হয়৷ এর পরপরই হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় দেশটিতে৷ হামে সংক্রমিত হওয়ার হারে বিশ্বে তৃতীয় সর্বোচ্চ দেশে পরিণত হয় ইন্দোনেশিয়া৷
পরে ওলামা কাউন্সিল তাদের মন্তব্য পালটে ‘টিকা হালাল’ ঘোষণা করলেও তখন সাধারণ মানুষ আর তাদের সন্তানদের টিকা দিতে আগ্রহী হয়ে ওঠেননি৷ ফলে এখন করোনার টিকা নিয়েও যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তাতে একই ধরনের পরিস্থিতি আবারও সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷

ইসলামী আইন অনুযায়ী,
জরুরী পরিস্থিতিতে বিকল্প না থাকলে মানব জীবন রক্ষায় করোনা টিকা ব্যবহার অবৈধ (হারাম) নয়।

মোটকথাঃ ফ্বকীহ ওলামাগন বলেন যদি হারাম বস্তু ব্যতীত চিকিৎসা করার মত অন্য কোনো বিকল্প না থাকে, তখন হারাম বস্তু ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করার ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে।
ওলামায়ে একরামগণ বলেন,
এখানে চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হবে- এক. নেশাজাত দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা করা। দুই. বিষাক্ত দ্রব্য দ্বারা চিকিৎসা করা। তিন. হারাম প্রাণী এবং পশুর হারাম অংশ দ্বারা চিকিৎসা করা। চার. এ জাতীয় ওষুধ শরীরে ব্যবহার আর সেবনের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি না?
মূলত উল্লিখিত বিষয়গুলোর মূল কথা হলো, নাপাক এবং হারাম বস্তু দারা চিকিৎসা করা ইসলামে জায়েজ না নাজায়েজ?
এই ক্ষেত্রে ইমাম আবু হানীফার বিখ্যাত মত হলো হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা করা জায়েজ নেই।(ফতুআয়ে আলমগিরী)

ইমাম শাফী (রাহ.) মতে মদ এবং নেশা জাত অন্যান্য দ্রব্য ছাড়া অন্য সকল হারাম বস্তু দিয়ে চিকিৎসা করা জায়েজ। (কিতাবুল উম)

তাদের এই মতের ভিত্তি হলো হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহপাক হারামের মধ্যে তোমাদের জন্য কোনো শেফা রাখেননি।

অবশ্য মালিকী ও হাম্বলী ফকীহগণ এবং হানাফিদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) অবশ্য সব ধরণের হারাম বস্তু দ্বারাই চিকিৎসা করার অনুমতি দিয়েছেন। যদি বৈধ বস্তু দিয়ে তৈরি কোনো বিকল্প কোনো ওষুধ না থাকে এবং কোনো মুসলিম চিকিৎসক সুস্থতা অর্জনের বিষয়ে আশ্বাস প্রাদন করে থাকে। তাহলে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রক্ত ও প্রসাব পান করা এবং মৃত প্রাণী ভক্ষণ করা জায়েজ আছে (আলমগিরী)
ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)এর মত অনুযায়ী করোনার ভ্যাকসিন (টিকা) ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ।

ইসলামি লেখক,
মাওলানা,মুফতি মো: ওমর ফারুক।
সিংড়া নাটোর।