সর্বত্রই মশার যন্ত্রণা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত জানুয়ারি ২৪, ২০২১
সর্বত্রই মশার যন্ত্রণা

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ২৪ জানুয়ারি, ২০২১, ৮:০০ এএম

‘দিনে মশা রাতে মাছি/এই নিয়ে কলকাতায় আছি’ প্রবাদটির বিবর্তন ঘটেছে। এখন ‘দিনে মশা রাতেও মশা/ ঢাকার নাগরিকদের করুণ দশা’। করোনার মধ্যেই রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে। নালা-নর্দমায় ঝাঁকে ঝাঁকে মশা উড়ছে। মহানগরীর অনেক এলাকায় দিনেও মশারি টানিয়ে ঘুমাতে হয়। দুই সিটি কর্পোরেশন মশা মারতে ওষুধ ছিটাচ্ছে। কিন্তু মশা কমছে না। বরং প্রতিদিন মশার বিস্তার ঘটেই চলছে। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম স্বীকার করেছেন তিনি মশার উপদ্রব বৃদ্ধির খবর পাচ্ছেন। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিসেম্বর থেকে মার্চ কিউলেক্স মশার প্রজনন মৌসুম। প্রতি বছরের এ সময় প্রায় একই চিত্র দেখা যায়। মশার প্রজননস্থলগুলো পরিষ্কার করে এ উপদ্রব কমিয়ে আনা সম্ভব। অথচ সেটা হচ্ছে না কেন?

জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সেলিম রেজা বলেন, মশা বেড়েছে এটা সত্য। আমিও এখন মশারি টাঙিয়ে ঘুমাই। তবে মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, আমরা আগের ওষুধই ব্যবহার করছি। যেসব ওষুধ ইমপোর্ট করা আছে সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। নতুন ওষুধ এখনও আসেনি। আর মশার ওষুধ; কিন্তু আমরা টেস্ট করি না। এই কাজটা করে থাকে আইইডিসিআর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের প্লান্ট প্রটেকশন। তারা যে ওষুধ সার্টিফাইড করে আমরা সেটাই ব্যবহার করি। বাতাস না থাকলে কিউলেক্স মশা একটু বাড়ে। মশা আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরপরেও আমরা বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিচ্ছি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় মশার ওষুধের কার্যকারিতা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন সংস্থাটির একজন কাউন্সিলর। ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার জন্য মেয়রের কাছে লিখিত আবেদনও করেছেন। তার দাবি আগে তার ওয়ার্ডের মানুষ মশারি ছাড়া রাত কাটাত। এখন মশার ওষুধে কাজ হচ্ছে না।

ওষুধের অকার্যকারিতার বিষয়টি স্বীকার না করলেও ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, নগরীতে মশা বেড়েছে। তাদের দাবি, শীত মৌসুমে কিউলেক্স মশা বাড়ে। ফাগুনের হাওয়া বইতে শুরু করলে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। মশা নিয়ন্ত্রণে কাজও করছেন তারা। অথচ কয়েক মাস মশার উপদ্রব কিছুটা কম থাকায় ঢাকার দুই মেয়র দাবি করেছিলেন, এবছর মশা ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে। তখন তাদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন নগরবাসী। কিন্তু স¤প্রতি মশা বেড়ে যাওয়ায় সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমের ওপর সন্দেহ বাড়ছে নাগরিকদের। তাদের দাবি যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তা কোনও কাজ করে না।

মশা নিধন প্রসঙ্গে এর আগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, গতবছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর আমরা সিটি কর্পোরেশনকে কর্মী দিয়েছি, জনবল দিয়েছি, যন্ত্রপাতি দিয়েছি, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য ১০ জন ম্যাজিস্ট্রেট দিয়েছি।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিন অনেক কাউন্সিলরের ফোন পাই। তারা অভিযোগ করেন, ওষুধ দিলেও কোনও কাজ হয় না। মশা মরে না। তারা ওষুধ ভালো করে পরীক্ষার দাবি করেন।

ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, করোনার মধ্যেই গত কয়েক মাস ধরেই রাজধানীতে মশা মারাত্মক হারে বেড়েছে। বস্তি থেকে শুরু করে অভিজাত এলাকাগুলোতেও বেড়েছে মশা। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই শুরু হয় উৎপাত। বাড়ছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি।

বিগত বছরে সিঙ্গাপুর ও দেশের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ঢাকায় মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে পৃথক দুটি আলাদা বিভাগ চালুর উদ্যোগ নেয় দুই সিটি কর্পোরেশন। এজন্য ঢাকা দক্ষিণের পক্ষ থেকে ‘কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট’ ও উত্তর সিটির পক্ষ থেকে ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’ নামে পৃথক দুটি প্রকল্পের প্রস্তাবনা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে এখনও কোনও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসি মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, সত্যি কথা হচ্ছে আমরা যে উদ্যোগ নিয়েছিলাম সেটা নিয়ে এগুতে পারিনি। তবে প্রতিদিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীর সঙ্গে অনেক বৈঠক হয়েছে। আরো বৈঠক করছি। এ ছাড়া মন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী কাজও চালিয়ে যাচ্ছি।

রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ যাত্রী, যাত্রীর স্বজন ও বিমানবন্দরের কর্মীরা। মশার উৎপাতে ভোগান্তির মধ্যে পড়েন যাত্রী ও তাদের স্বজনরা। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, মশার উৎপাত নিয়ন্ত্রণে গত বৃহস্পতিবার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ৭ সদস্যের কমিটি গঠন করে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। বৈঠকে বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান, মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জনেন্দ্রনাথ সরকার, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমান ও শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচ এম তৌহিদ উল আহসান উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিটি কর্পোরেশন, সিডিসি এবং বেবিচকের সমন্বয়ে বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে তিন মাইলের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, মশা নিধনে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে বলা হয়।

ঢাকা দক্ষিণ সিটির বেশ কিছু ওয়ার্ডে প্রতিদিন ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু মশা কমছে না। মশার ওষুধের কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে না এমন অভিযোগ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির ৬৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী মো. ইবরাহীম। মেয়রের কাছে অভিযোগপত্রে তিনি উল্লেখ করেন, ৬৭ নং ওয়ার্ডের জন্য সিটি কর্পোরেশন বরাদ্দকৃত মশার ওষুধ যথা নিয়মে প্রতিদিন ছিটানো হচ্ছে। এলাকাবাসীর মন্তব্য ছিল- প্রথমে যে মশার ওষুধ দেওয়া হয়েছিল তার কার্যকারিতা এমন ছিল যে জনগণ মশারি ছাড়া রাত কাটাতে পেরেছিল। কিন্তু এখন ওষুধের সে রকম কার্যকারিতা আমরা পাচ্ছি না।

ডিএসসিসিতে ওষুধ ফরমুলেশনের দায়িত্বে রয়েছে এসিআই ফর্মুলেশন লিমিটেড। কোম্পানিটির সরবরাহকৃত প্রায় এক লাখ লিটার ওষুধ ফিল্ড পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় ২০২০ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে তা ফেরত দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে ওই কোম্পানির ফরমুলেশন করা ওষুধই ব্যবহার করা হচ্ছে হচ্ছে।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগের দাবি, মাঠ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া সেই ওষুধ ধ্বংস না করে আবারও ডিএসসিসিতে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে ডিএসসিসিতে পরে যতগুলো লট সরবরাহ করা হয়েছে প্রতিটেই ফিল্ড টেস্ট করে গ্রহণ করা হয়েছে।

জানা যায়, ২০২১ সালের প্রথম দিন তথা ১ জানুয়ারি ৬ লাখ ৪০ হাজার লিটার অ্যাডাল্টিসাইডিং ওষুধের জন্য টেন্ডার আহ্বান করে ডিএসসিসি। এতে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ১২ কোটি ৪১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। কিন্তু প্রতিটি কোম্পানি ‘অতিরিক্ত’ দর দেওয়ায় তা বারবার রি-টেন্ডার করে ডিএসসিসি। প্রায় চার দফায় টেন্ডার দিয়ে গতবছরের অক্টোবরের দিকে ওষুধ ফরমুলেশনের কাজ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করতে পারে সংস্থাটি। এই দীর্ঘ সময় সংস্থার কাছে ওষুধ ছিল না। তখন অলস সময় কাটিয়েছিল মশককর্মীরা।

এদিকে মশা বাড়লেও ডিএসসিসি মশা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত কর্মী কমিয়েছে। সংস্থার বিভিন্ন অঞ্চলের ওয়ার্ডে নিয়োজিত নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী রেখে বাকিদের সচিব দফতরে বদলি করা হয়েছে। ডেঙ্গুর এই মৌসুমে কর্মী কমানোকে চরম অবহেলা হিসেবে দেখছেন কীটতত্ত্ববিদ ও নাগরিকরা। তারা বলছেন, যেখানে অর্ধেকের চেয়েও কম জনবল নিয়ে কাজ করছে সিটি কর্পোরেশন, সেখানে কর্মী কমানো হয়েছে।

ডিএসসিসির স্বাস্থ্যবিভাগ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটির প্রতিটি ওয়ার্ডে ১৩ থেকে ১৮ জন করে কর্মী রয়েছে। এ থেকে ৩ থেকে ৭ জন করে কর্মী কমিয়ে সচিব দফতরে বদলি করা হয়। সবকটি ওয়ার্ড থেকে প্রায় ৩০০ জন কর্মীকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে অফিস সহকারী হিসেবে পদায়ন করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘অধিকাংশ ওয়ার্ডে অতিরিক্ত জনবল থাকায় তাদের প্রত্যাহার করে ভিন্ন কাজে খাটাচ্ছি।’ অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশক নিধনে ওয়ার্ড পর্যায়ে সিটি কর্পোরেশনের যে জনবল রয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।

বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনকে সমন্বিতভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এক জায়গায় যদি ওষুধ দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময় পর সেই জায়গায় আবার ওষুধ দিতে হবে। এক জায়গায় দিলাম, আরেক জায়গায় দিলাম না তা হলে চলবে না। তিনি আরো বলেন, একেকটি ওয়ার্ডকে ৮-১০টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতি সেক্টরে কমপক্ষে ৪ জন করে জনবল রাখতে বলেছি। এক্ষেত্রে একটি সেক্টরে একজন লারভিসাইডিং, একজন অ্যাডাল্টিসাইডিং এবং একজন পরিস্থিতি কতটা উন্নতি বা অবনতি হয়েছে তা দেখভাল করবে। এলাকার নাগরিকদের সঙ্গে সম্পর্ক বা যোগাযোগ রাখবে আরেকজন। যেন তারাও মশক নিয়ন্ত্রণকাজে যুক্ত থাকতে পারে। এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করলে মশার উৎপাদনস্থল টিকতে পারবে না। এতে প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে ৩২ থেকে ৪০ জন লোক লাগবে। কিন্তু সেখানে আছে ১২ থেকে ১৩ জন।