সাত কলেজের পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দিনভর রাস্তা অবরোধ রেখে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দাবি পূরণ হওয়া কর্মসূচি প্রত্যাহার

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৫, ফেব্রুয়ারি, ২০২১, বৃহস্পতিবার
সাত কলেজের পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা দিনভর রাস্তা অবরোধ রেখে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ দাবি পূরণ হওয়া কর্মসূচি প্রত্যাহার

বিজয় বাংলা ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২১, ১২:০১ এএম

পরীক্ষা স্থগিত করার প্রতিবাদে এবং পূর্বঘোষিত রুটিনে পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে দিনভর রাস্তা অবরোধ, কাপনের কাপড় পড়ে অনশনসহ বিক্ষোভ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে জরুরি সভা ডেকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দাবি মেনে নিয়ে সাত কলেজের পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে। গতকাল বুধবার শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা উপমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয় বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা এম এ খায়ের জানান। দাবি মেনে নেয়ার সাথে সাথে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন এবং কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ফিরে যায়। এতে রাজধানীর নীলক্ষেত, সায়েন্সল্যাব, ধানমন্ডি, শাহবাগে যানচলাচল স্বাভাবিক হয়। পরবর্তীতে রাতেই এই সাত কলেজের তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষার সংশোধিত রুটিন প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

চলমান পরীক্ষাসমূহ চালু রাখার সিদ্ধান্তের বিষয়ে সাত কলেজের প্রধান সমন্বয়ক ও ঢাবি প্রো-ভিসি (শিক্ষা) প্রফেসর এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ঢাবির অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের চলমান পরীক্ষাগুলো অব্যাহত থাকবে। মঙ্গলবার ও বুধবারের পরীক্ষাগুলোর তারিখ পরবর্তীতে জানিয়ে দেয়া হবে। তবে শর্ত দেওয়া হয়েছে, পরীক্ষা চলাকালে কলেজগুলোর হোস্টেল খোলা যাবে না এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এর আগে গত মঙ্গলবার বিকেলে সাত কলেজের প্রধান সমন্বয়ক ও প্রিন্সিপালদের এক সভায় সাত কলেজের সব পরীক্ষা ২৪ মে পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের পর তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার এবং হল-ক্যাম্পাস খুলে দেওয়ার দাবিতে নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

গতকাল বুধবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় নীলক্ষেতসহ আশপাশের রাস্তাগুলো অবরোধ। অবরোধে রাজধানী জুড়ে শুরু হয় তীব্র যানজটের। বিক্ষোভকারী সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা চালুর দাবিতে সকালে কাফনের কাপড় পরে নীলক্ষেত মোড়ে অবস্থান নেয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে আন্দোলনকারীদের সংখ্যা। দুপুর ১২টার দিকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীদের একাংশ। এসময় পরীক্ষা চালু রাখার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া আন্দোলন থেকে না সরার কথা জানান তারা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাত কলেজের শিক্ষা কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত (ফোকাল পয়েন্ট) আই কে সেলিম উল্লাহ ঢাকা কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষক নিয়ে ওই এলাকায় যান। তিনি জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সাত কলেজের অধ্যক্ষদের ডাকা হয়েছে। সেখানে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে বলে তিনি আশা করেন। তার আশ্বাসের পরও সড়ক ছাড়েননি শিক্ষার্থীরা। তাঁরা শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে লিখিত আকারে বিজ্ঞপ্তির এবং সুষ্ঠু সমাধান চান।

এসময় ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে নীলক্ষেত মোড়ে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাইন্সল্যাব মোড় দখল করেন শিক্ষার্থীদের একাংশ। এসময় তারা ‘পরীক্ষা নিয়ে টালবাহানা, চলবে না, চলবে না’,‘চলমান পরীক্ষা নিতে হবে নিতে হবে,‘সাত কলেজের পরীক্ষা নিতে হবে নিয়ে নাও,’ ‘ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা নিতে হবে নিতে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এসময় আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র আবু বকর বলেন, হঠাৎ করে চলমান পরীক্ষা স্থগিত করে দেওয়া প্রশাসনের খামখেয়ালি মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ। এই ধরনের সিদ্ধান্ত সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করছে। চলমান পরীক্ষাসমূহ রুটিন অনুযায়ীই নিতে হবে। অন্যথায় আমাদের আন্দোলন চলবে।

আন্দোলনে অংশ নেয়া ইডেন কলেজের ছাত্রী স্বর্ণা আক্তার বলেন, আমাদের ফোর্থ ইয়ারের পরীক্ষা প্রায় শেষ পর্যায়ে। এই পর্যায়ে এসে পরীক্ষা স্থগিত করে দেওয়ার কোনো মানে হয় না। ২০১৯ সালে যে পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা ছিল, তা এখনও আটকে আছে। আমরা আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় আছি। একটা পরীক্ষার জন্য কি আরও এক বছর নষ্ট করতে হবে। তিতুমীর কলেজের রাকিব হাসান বলেন, আমাদের পরীক্ষা কয়েকটা শেষ হয়েছে। আরও চারটা পরীক্ষা বাকি আছে। পরীক্ষার জন্য আমরা অনেকে এই মহামারীর মধ্যে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঢাকায় এসে মেসে উঠেছি। অনেকেই আর্থিক সঙ্কটে আছে। এর মধ্যে এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নেব না।

এর মধ্যেই জরুরি বৈঠকে বসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ঢাবি ও অধিভুক্ত কলেজ কর্তৃপক্ষ। তাদের বৈঠকে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। সভায় শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী ছাড়াও যুক্ত হন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন, ঢাবি ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান, প্রো-ভিসি (শিক্ষা) প্রফেসর ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, অধিভুক্ত সাত কলেজের সমন্বয়কসহ সাত কলেজের অধ্যক্ষরা।
বৈঠক শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাতটি সরকারি কলেজের চলমান ও ঘোষিত পরীক্ষাসমূহ শর্তসাপেক্ষে অনুষ্ঠিত হবে। শর্ত দুটি হল: পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে হোস্টেল খোলা হবে না এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হবে।

চলমান পরীক্ষাসমূহ চালু রাখার সিদ্ধান্তে সন্ধ্যায় অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয় আন্দোলনকারীরা। তারা বলছেন, আমাদের নায্য দাবিগুলো এমনিতেই পূরণ হওয়ার কথা কিন্তু তারপরেও আমাদের বারবার রাস্তায় নামতে হয়। আজকে রাজপথ থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায় করে নিয়েছে। আগামীতেও প্রশাসনের যেকোন ধরণের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা এভাবেই তাদের অধিকার আদায় করবে।

শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সাত কলেজের অধিভুক্ত অধ্যক্ষ মহোদয়গণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রো-ভিসিসহ আমাদের একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং সেখানে আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি যে, এই সাত কলেজের চলমান এবং ঘোষিত পরীক্ষাগুলো পরীক্ষার্থীরা হোস্টেলে না ওঠার শর্তে চলমান থাকবে। আমি আশা করি, এই সাত কলেজের কোনো পরীক্ষা নিয়ে কোনো সংশয় থাকবে না, পরীক্ষাগুলো চলবে। কিন্তু আমাদের সকল বিশ্ববিদ্যালয় ২৪ মে খুলবে আর হলগুলো খুলবে ১৭ মে। তার আগে সকল প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয় করবে। সেক্ষেত্রে যেখানে যে সহযোগিতা লাগবে, সে সহযোগিতা আমরা দেব।

সাত কলেজের পরীক্ষার সংশোধিত রুটিন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের স্নাতক তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের স্থগিত পরীক্ষার সংশোধিত সময়সূচি প্রকাশ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাবির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বাহলুল হক চৌধুরী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ সময়সূচি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজের ২০১৯ সালের তৃতীয় বর্ষ স্নাতক পরীক্ষার্থীদের স্থগিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষাগুলো ২৮ ফেব্রুয়ারি, ৩, ৬, ৯ ও ১৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সকাল ৯টায় পরীক্ষা শুরু হবে। সূচিতে পরীক্ষার কেন্দ্রও ঘোষণা করা হয়েছে। অপরদিকে, স্নাতক চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষাগুলো ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২, ৪ ও ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এ বর্ষের পরীক্ষাও প্রতিদিন সকাল ৯টায় পরীক্ষা শুরু হবে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত রাজধানীর সাত সরকারি কলেজের পরীক্ষা নির্ধারিত রুটিনে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন