মওদুদ আহমদ; একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের প্রতিকৃতি

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৬, মার্চ, ২০২১, মঙ্গলবার
মওদুদ আহমদ; একজন প্রকৃত রাজনীতিবিদের প্রতিকৃতি

বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রে দীর্ঘ সময় ধরে যারা প্রভাব বিস্তার করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ।

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমেদ কখনও নন্দিত, কখনও সমালোচিত হয়েছেন। কিন্তু তিনি প্রকৃত অর্থেই একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন বলে তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে ছিলেন মওদুদ আহমেদ। পরে তিনি জিয়াউর রহমান, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার সরকারেও ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন।

জেনারেল এরশাদের সরকারে থাকলেও পরে তিনি আবার বিএনপির রাজনীতিতে ফিরে আসেন।

তার সহকর্মীরা উল্লেখ করেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ একজন দক্ষ পার্লামেন্টারিয়ান যেমন ছিলেন, তেমনি তিনি আইন পেশাতেও সফল ছিলেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির বিভিন্ন পর্ব নিয়ে তাঁর লেখা একাধিক বই প্রশংসিত হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নানা আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতির মাঠে
মওদুদ আহমেদ ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় ঐ কলেজের ছাত্র সংসদের আপ্যায়ন সম্পাদক ছিলেন।

পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ফরমান উল্লাহ খানের প্রতিষ্ঠিত খেলাফত রব্বানীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশক্তির সাথে জড়িত হয়েছিলেন।

এর আগে স্কুলের ছাত্র থাকার সময় বাংলা ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগ দিয়ে তিনি জেল খেটেছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করার পর তিনি লন্ডনে বার-অ্যাট-ল পড়তে যান। সেখানে তার পরিচয় হয়েছিল একই বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষার্থী আমীর উল ইসলামের সাথে।

এখন সিনিয়র আইনজীবী আমীর উল ইসলাম বলেছেন, তিনি এবং মওদুদ আহমেদ বার-অ্যাট-ল শেষ করে ৬০এর দশকের মাঝামাঝি দেশে ফেরেন। তখন ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করলে তারা তার সমর্থনে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামেন।

আলোচিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আইনজীবী
ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি দেশে ফেরার পরই হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করেন। তখন মওদুদ আহমেদ তাঁর জুনিয়র হিসাবে কাজ শুরু করেন।

ব্যারিস্টার ইসলাম বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানি শাসকদের করা যে মামলা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল এবং যে মামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল – সেই মামলায় তিনি এবং মওদুদ আহমেদ আইনজীবী হিসাবে কাজ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধে তিনি
মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় মওদুদ আহমেদকে পোস্টমাস্টার জেনারেল নিয়োগ করেছিল।

যুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের ডাকা গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবের সাথে ছিলেন মওদুদ আহমেদ।

মুক্তিযুদ্ধে সংগঠকদেরও অন্যতম একজন ছিলেন তিনি।

বিএনপি প্রতিষ্ঠার সাথে
মওদুদ আহমেদের একজন ঘনিষ্ঠ আত্নীয় জানিয়েছেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। সে সময় ব্যারিস্টার আহমেদ আওয়ামী লীগ সরকারের হাতে আটক রাজনীতিকদের জন্য আইনী লড়াই চালানোসহ মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেছেন।

১৯৭৫ সালে পট পরিবর্তনের পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন।

তিনি মওদুদ আহমেদকে উপদেষ্টা নিয়োগ করেছিলেন ১৯৭৭ সালে।

বিএনপি প্রতিষ্ঠার আগে জিয়াউর রহমান জাগদল গঠন করেছিলেন। সেই জাগদলের ১৯ সদস্যের আহবায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন মওদুদ আহমেদ। পরে তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠার সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী, ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হয়েছিলেন
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে ১৯৭৯ সালে উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছিলেন মওদুদ আহমেদ। তবে বিএনপির একজন নেতা বলেন, উপপ্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরের বছরই ১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমান তাঁকে মন্ত্রীসভা থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।

পরে সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারে ব্যারিস্টার আহমেদ প্রথমে মন্ত্রী, তারপর উপপ্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত হয়েছিলেন।

তিনি ১৯৮৯ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এরশাদ সরকারের পতনের সময় পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।’গুলশানের বাড়ি ছাড়তে হবে মওদুদ আহমদকে’

২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারেও তিনি আইনমন্ত্রী ছিলেন।

তাঁর দুই ছেলে এবং এক মেয়ে। বড় ছেলে আসিফ মওদুদ অল্প বয়সেই মারা যান অনেক আগে।আর দ্বিতীয় সন্তান আমান মওদুদ প্রতিবন্ধী ছিলেন এবং তিনিও মারা যান ২০১৫ সালে।

তাঁর পরিবারের একজন সদস্য জানিয়েছেন, ছেলেদের মৃত্যুর সেই কষ্টের কথা তিনি সবসময় আত্নীয়স্বজনের কাছে প্রকাশ করতেন।

তাঁর মেয়ে আনা আসপিয়া মওদুদ স্বামীসহ থাকেন নরওয়েতে। ব্যারিস্টার আহমেদের শ্বশুর পল্লীকবি জসীমউদদীন।

বিবিসি প্রতিবেদন অবলম্বনে

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন