উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলন ও সালাফি মতবাদ।

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৩, এপ্রিল, ২০২১, শনিবার
উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলন ও সালাফি মতবাদ।

কলমেঃ মারজান আহমদ চৌধুরী।

দ্বীনি কিংবা জাতীয় স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে এ দেশে যখনই কোনো বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, হরতাল, ডেমোস্ট্রেশন ইত্যাদি হয়, তখনই আমাদের সালাফি-আহলে হাদীস শায়খদের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে হারামের ফতোয়া চলে আসে। ব্যাপারটি ইদানিং বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেহেতু এক দশক আগেও এ দেশে সালাফি মতবাদের প্রভাব এত বেশি ছিল না। মিছিল-মিটিংকে হারাম ফতোয়া দেয়ার পেছনে তাঁদের যুক্তি ও দলিল দুই ধরণের। প্রথমত, তাঁরা কিছু আয়াত ও হাদীসের রেফারেন্স দেন, যেখানে বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, শাসক তথা উলুল আমরের আনুগত্যের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর যে নির্দেশনা রয়েছে, তা উল্লেখ করে শায়খরা তথাকথিত ‘সরকারবিরোধী’ ডেমোস্ট্রেশনকে হারাম সাব্যস্ত করেন। তাদের বেশিরভাগ যুক্তি এতই খোঁড়া যে, এগুলোর ইলমি খণ্ডন নিষ্প্রয়োজন। কমন সেন্স থেকেই বুঝা যায়, তাদের দলিলসমূহ অপ্রাসঙ্গিকভাবে (out of context) গৃহীত এবং যুক্তিগুলো অবাস্তব। কোনো কিছুকে হারাম সাব্যস্ত করার জন্য যেসব মৌলিক শর্ত (কাত্বঈ আস-সুবুত ও কাত্বঈ আদ-দালালাহ) আবশ্যক, শায়খরা সেসব মৌলিক শর্তকে আমলেই নেন না।

অনেককে দেখি, শায়খদের ফতোয়া আসার সাথে সাথে তাদেরকে ইলমি জবাব দিতে উদ্যত হয়ে যান। আমার মতে, প্রচলিত সালাফি মতবাদের চিন্তা চেতনার মূল শেকড় না জেনে মাঝখান থেকে ইলমি জবাব দেয়াটা নিষ্প্রয়োজন। শায়খদের এসব ফতোয়ার পেছনে যতটা না দ্বীনি উদ্দেশ্য, তারচেয়ে বেশি রয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সেটি প্রথমে ভালোভাবে বুঝা দরকার।

এ উপমহাদেশে সালাফি মতবাদকে কেবলই একটি ফিকহী মাযহাব হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু আদতে তা সত্য নয়। সালাফি মতবাদ মূলত কোনো ফিকহী মাযহাব কিংবা দেওবন্দী, বেরেলভীদের মতো মাসলাক নয়। সালাফি মতবাদ মূলত একটি আকীদা-ভিত্তিক রাজনৈতিক মতবাদ। পরবর্তীতে নব্য-হাম্বলীদের সাথে মিলিত হয়ে এদের একটি ফিকহী মতবাদ তৈরি হয়েছে। সুতরাং ইসলামী আন্দোলনে সালাফি-আহলে হাদীস মতবাদের মতামত ও ভূমিকা যাচাই করতে হলে তাদের আকীদা ও রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে সামনে আনতে হবে।

গোড়ার দিক থেকে হিসেব করলে প্রচলিত সালাফি মতবাদ তিন ধাপে জন্ম নিয়েছে। সালাফি ধারার প্রথম মতবাদ হচ্ছে নজদি মতবাদ। মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের (১৭০৩-১৭৯২) মাধ্যমে এ মতবাদের সূচনা হয়েছিল। উসমানী (অটোমান) খিলাফত ও এর অধীনস্থ সমস্ত মুসলিম উম্মাহকে মুশরিক ফতোয়া দিয়ে ইবনে আবদুল ওয়াহাব ও তার দল মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করেছিলেন। আরবের দিরিয়াহ এলাকার গোত্রপ্রধান মুহাম্মদ ইবনে সৌদ তার সাথে শরিক হন। যুদ্ধের পর বিজিত এলাকাজুড়ে তাদের শাসন কায়েম হয়। কালক্রমে তিন দফা ভাঙ্গাগড়া ও সীমাহীন সংঘাতের মধ্যে দিয়ে বাদশা আবদুল আযীয নজদি মতবাদের ভিত্তিতে ১৯৩২ সালে আধুনিক সৌদি আরব কায়েম করেন।

সালাফি ধারার দ্বিতীয় মতবাদ হচ্ছে আধুনিক রাজনৈতিক সালাফিবাদ। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে জামাল-উদ-দীন আফগানি, শায়খ মুহাম্মদ আবদুহু, শায়খ রশীদ রিদ্বা প্রমুখ ব্যক্তিদের হাতে আধুনিক সালাফি রাজনৈতিক মতবাদের জন্ম হয়েছিল। এরা সরাসরি নজদি মতবাদের সাথে যুক্ত ছিলেন না। তাদের মূল চিন্তা চেতনা ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও ইসলামের বিশ্বজনীন ধারণা (Pan-Islamism)। এ ধারার আধুনিক সংস্করণ হচ্ছে আল-ইখওয়ানুল মুসলিমুন বা মুসলিম ব্রাদারহুড। বর্তমানে মুসলিম ব্রাদারহুড নিজেদেরকে একটি বড় ছাতা বানিয়ে এর ভেতর সালাফি, সুফী, মাযহাবি, লা-মাযহাবি সবাইকে সংঘবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে।

সালাফি ধারার তৃতীয় মতবাদ হচ্ছে সৌদি-ভিত্তিক নব্য-সালাফিবাদ। কট্টর নজদিদেরকে ঠান্ডা করার জন্য সৌদি রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ৭০ ও ৮০’র দশকে নব্য-সালাফিবাদের সূচনা হয়। এদের চারটি ধারা রয়েছে। যথা-
১. অরাজনৈতিক ইলমি সালাফিবাদ। এরা কখনও রাজনৈতিক বিষয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের মূল কাজ হচ্ছে সালাফি ধারার ইলমি প্রচারকার্য। এ ধারার মূল খুঁটি শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী।

২. সৌদি-সমর্থক সালাফিবাদ। এদের কার্যক্রমও ইলমি প্রচার-প্রসার, তবে মূল লক্ষ্য হচ্ছে সৌদি রাজতন্ত্রের স্বার্থরক্ষা। এদের কাছে ইবনে আবদুল ওয়াহাবের চেয়ে শায়খ ইবনে তাইমিয়া অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। এ ধারার মুখপাত্র সাবেক সৌদি গ্রাণ্ড মুফতি আবদুল আযীয ইবনে বায, সালেহ ইবনুল উসাইমিন, সালেহ আল ফাউযান, বর্তমান গ্রাণ্ড মুফতি আবদুল আযীয আলে-শায়খ প্রমুখ।

৩. হারাকি সালাফিবাদ। এ নামটি এসেছে ‘হারাকাত’ তথা নড়াচড়া থেকে। এরা অন্যায় দেখলে নিন্দা করেন, প্রতিবাদ করেন। সালাফিবাদের ভেতরে থেকেই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শুধরে দেয়ার চেষ্টা করেন। এ ধারার মূল স্তম্ভ শায়খ সাফার আল হাওয়ালী, শায়খ সালমান আল আওদা (কারাগারে বন্দী) এবং তাদের ‘সাহওয়া মুভমেন্ট’। বর্তমানে এরা অনেকটাই নীরব।

৪. তাকফীরি-জঙ্গি সালাফিবাদ। এদের কর্মকাণ্ড পুরোপুরি ‘খারেজি’ মতবাদের অনুরূপ। তারা পৃথিবীর যাবতীয় শাসনব্যবস্থাকে কাফির মনে করে, এবং কোনোরূপ ফলাফল বিবেচনা না করেই সর্বাবস্থায় সশস্ত্র যুদ্ধকে ফরজ মনে করে, সেটি যেখানে এবং যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন! প্রচলিত আল-কায়েদা ও আইএস এ ধারার উদাহরণ।

এ চারটি ধারার মধ্যে ২য় ধারাটি অধিকতর প্রভাবশালী। পৃথিবীতে সালাফি-আহলে হাদীস মতবাদকে ছড়িয়ে দেয়ার পেছনে বড় কৃতিত্ব তাদেরই। এদের থেকে পরবর্তীতে আরেকটি কট্টরপন্থী ধারা বের হয়েছে, যাদেরকে ‘মাদখালি’ বলা হয়। অধ্যাপক রাবী’ আল মাদখালির চিন্তাধারা থেকে এ মতবাদের জন্ম হয়েছে। এরা বাকি সবাইকে সমূলে গোমরাহ-বিদআতি মনে করে এবং সর্বাবস্থায় শাসকের আনুগত্যকে ফরজ মনে করে, চাই শাসক যালিম হোক, ফাসিক হোক, যত অন্যায়-অবিচারই করুক। যদি শাসক প্রকাশ্য কুফরের (كفر بواح) হুকুম না দেয়, তাহলে কোনোভাবেই শাসকের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করা যাবে না— এটি তাদের আকীদার অংশ। এমনকি এ কারণে তারা ইমাম হুসাইন রাদ্বিআল্লাহু আনহুকে বিদ্রোহী এবং অপরাধী মনে করে, কারণ তিনি ‘শাসক’ ইয়াযিদের বিরুদ্ধে বের হয়েছিলেন। আহলে বায়েতের প্রতি তাদের বিদ্বেষের আসল শেকড় গেঁথে আছে এখানেই।

সৌদি রাজতন্ত্রের অকুণ্ঠ সমর্থনে এ মতবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিছু বিচ্ছিন্নতা হয়তো পাওয়া যাবে। নইলে ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহৎ সালাফি-আহলে হাদীস ঘরানা রাজনৈতিক আদর্শগত দিক থেকে একশভাগ তাবদী-মাদখালি। তারা শাসকের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে কোনোরূপ ডেমোস্ট্রেশন করাকে হারাম মনে করেন। আজ রাজনৈতিক বিবেচনায় পৃথিবীতে দুই ধারার সালাফিবাদ চলছে। তাকফীরি-জঙ্গি সালাফিবাদ এবং তাবদী-মাদখালি সালাফিবাদ। বাকিরা মিশে গেছে এদের কোনো একটির মধ্যে।

এ বিষয়টি না বুঝে হুট করেই সালাফিদের ইলমি জবাব দেয়া নিষ্প্রয়োজন। বরং তাদেরকে প্রশ্ন করা উচিৎ, আজ যে তারা শাসকের প্রশ্নহীন আনুগত্যের দোহাই দিচ্ছেন, যখন তাদের ‘রূহানী আব্বাজান’ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব প্রতিষ্ঠিত ইসলামী (উসমানী) খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, তখন তাদের এ ফতোয়া কোথায় ছিল? তারা কি তাদের আব্বাজানকে গোমরাহ ফতোয়া দিতে রাজি আছেন?

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন