কাশগরের ক্যারাভানের গল্প

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৫, এপ্রিল, ২০২১, সোমবার
কাশগরের ক্যারাভানের গল্প

কলমেঃ মারজান আহমদ চৌধুরী

নীল নদের কিনারা ঘেষে আমাদের ক্যারাভান চলছে। গন্তব্য বহুদূরের কাশগর। নীরব বিকেল, খানিকক্ষণ পর পর উটের গলায় ঝুলন্ত ঝুনঝুনির টুংটাং শব্দ শুনা যায়। এক সময় ক্যারাভান এসে থামল ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরে। কিছু যাত্রী নেমে গেল, কিছু নতুন উঠে বসল। আমার পাশে এসে বসলেন নতুন এক যাত্রী। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি আল্লামা ইকবাল। আমি চমকে উঠলাম। প্রাচ্যের মহাকবি এসে বসেছেন আমার পাশে? ইতস্তত কণ্ঠে সালাম দিলাম। তিনি জবাব দিতে দিতে আমার দিকে চোখ ফেরালেন। “আরে, মারজান! কোথায় যাচ্ছিস?” বললাম, “যেথায় আপনি যাচ্ছেন।” জিজ্ঞেস করলেন, “একা বসে বসে কী করিস?” বললাম, “কিছু না, গুনগুন করে তিলাওয়াত করি।” আল্লামা খুশি হয়ে বললেন, “দেখি একটু তিলাওয়াত করে শুনা আমাকে।” আমি তিলাওয়াত করলাম-
إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةً
[সুরা নামল : ৩৪]

আল্লামা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আয়াতের অর্থ বল।” আমি বললাম, “রাজা-বাদশারা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে, তখন সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এবং জনপদের সম্মানি লোকদেরকে অপদস্থ করে।” আল্লামা বললেন, আয়াতের রহস্য জানিস? বললাম, “জ্বি না হযরত, আমার জানা নেই।” আল্লামা বললেন-

“আ বাতাউঁ তুজকো রামযে আয়াত-এ ইন্নাল মুলুক
সালতানাত আকওয়ামে গালিব কি হে এক জাদুগরী”
~আয় তোকে বলি ‘ইন্নাল মুলুক’ আয়াতের রহস্য। সাম্রাজ্য হচ্ছে বিজয়ী জাতির এক খেল তামাশা। যে জাতি যখন বিজয়ী হয়, তার ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাই হয়ে যায় রাষ্ট্রের চেতনা। পরাজিতরা এখানে কেবল অপরাধী হয়ে থাকে, চাই তাদের দাবী যতই ন্যায্য হোক। যখন ক্ষমতার পট পরিবর্তন হয়, তখন সব হিসেব উল্টে যায়। যারা এতদিন মজলুম ছিল, তারা মসনদে বসে এবং রাতারাতি যালিম হয়ে যায়। এই খেলায় ‘ন্যায়’ বলতে কিছু নেই। যার হাতে ক্ষমতা, তার খেয়ালখুশিই ‘ন্যায়’।

“খোয়াব সে বেদার হোতা হে যারা মেহকুম আগার
প্হির সুলা দেতি হে উসকো হুকমারাঁ কি সাহিরী”
~প্রজারা যখনই স্বপ্নের জগত থেকে একটু সজাগ হতে চায়, শাসকের জাদুমন্ত্র তাদেরকে আবার শুইয়ে দেয়। সেই জাদুমন্ত্র কখনো হয় মিথ্যা আশ্বাস, কখনো হুমকি-ধামকি। কারণ জেগে উঠলেই প্রজারা রাজার কাছে জবাব চাইবে, অধিকার চাইবে, মুক্ত নিঃশ্বাস নিতে চাইবে। রাজারা এসব পছন্দ করে না।

“জাদুয়ে মেহমুদ কি তাসীর সে চশমে আয়ায
দেখতি হে হালকায়ে গার্দান মে সায-এ-দিলবারী”
~সুলতান মাহমুদ গজনবীর এক গোলাম ছিল। নাম ছিল আয়ায। আয়ায সুলতান মাহমুদের গোলামিতে এমন মগ্ন ছিল যে, গোলামিকেই সে নিজের জন্য সৌভাগ্য মনে করত। মানুষ হয়ে মানুষের গোলামি করা মানুষকে মানুষের আত্ম-মর্যাদা ভুলিয়ে দেয়। এক সময় গোলামিকে তাকদীর মনে করে মানুষ তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যায়। পাল্টা প্রশ্ন করার শক্তিটাই হারিয়ে ফেলে।

“খুনে ইসরাইল আ-জাতে হে আখির জোশ মে
তুড় দেতা হে কোই মুসা তিলিসমে সামিরী”
~তবে বনী ইসরাইলের রক্তেও এক সময় উত্তাপ আসে। কোনো এক মুসা এসে সামিরীর বাছুরের মূর্তি ভেঙ্গে দেন। বছরের পর বছর বনী ইসরাইল জাতি ফেরাউনের গোলামিতে আবদ্ধ ছিল। সাহস হারিয়ে ফেলেছিল, শক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। মুসা আলাইহিস সালাম ছয় লক্ষ বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্ত করে জেরুজালেম নিয়ে আসলেন। এরপর যখন তিনি তাওরাত কিতাব আনতে গেলেন, সেই ফাঁকে সামিরী নামক এক ব্যক্তি একটি বাছুরের মূর্তি বানিয়ে ফেলল। বনী ইসরাইলের কিছু লোক সেই মূর্তির পূজা করতে লাগল। কিছু লোক জানত যে, এটি শিরক। কিন্তু দীর্ঘদিনের গোলামির ফলে তাদের মধ্যে প্রতিবাদের শক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তাই তারা চুপ থাকল। কিন্তু মুসা তো মুসা-ই। তিনি এসেই লাথি দিয়ে সামিরীর বাছুরের মূর্তি ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন। এভাবেই লক্ষ-কোটি ভীতুর মধ্য থেকে কখনো কখনো একজন সাহসী মুসা বের হয়ে আসেন এবং যুলুমশাহীর প্রাসাদকে ভেঙ্গে দেন।

“সারওয়ারি যেবা ফাকাত উস যাতে বেহামতা কো হে
হুকমারাঁ হে এক ও-হী, বাকি বুতানে আযরী”
~(কেননা) সার্বভৌম ক্ষমতা তো কেবল ওই এক সত্ত্বার, যিনি একক, যার কোনো শরিক নেই। হুকুম দেয়ার অধিকার কেবল তাঁরই। তিনি ছাড়া আর যে-ই সার্বভৌম ক্ষমতার দাবী করে, সে আসলে সামিরীর তৈরি ওই মূর্তির ন্যায় একটি পাথরের মূর্তি। অপেক্ষা শুধু একজন মুসার, যিনি এসে এসব মূর্তি ভেঙ্গে দেবেন।

আমি অপলক চোখে তাকিয়ে আছি। আল্লামা বললেন, “দেখ তো, মনে হয় কাশগর পৌঁছে গেছি। বাকিটা থাক আজকে। নামার সময় আমার ব্যাগটা হাতে নিয়ে নামিস।”

[গল্পটি কাল্পনিক, কবিতাটি আল্লামা ইকবালের, ব্যাখ্যা আমার নিজের, উপলব্ধির দায়িত্ব পাঠকের]

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন