আহ! মা কেন সন্তানের ভবিষ্যত ধ্বংস করে?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৫, এপ্রিল, ২০২১, সোমবার
আহ! মা কেন সন্তানের ভবিষ্যত ধ্বংস করে?

লেখকঃ মাওলানা আমীর হুসাইন।

️কিছু কিছু মা আছেন এমন, যারা নিজ সন্তানের প্রতি সীমাহীন দরদ প্রকাশ করতে চান। সন্তানের সবধরণের আরামের জন্য নিজেকে ব্যস্ত রাখেন সর্বদা। কিন্তু তাদের এহেন দরদে কি আসলে সন্তানের কল্যাণ আছে, নাকি তারা শয়তানের ধোকায় পড়ে নিজের সন্তানকে ধ্বংস করতে চলেছেন, তা নিয়ে আমার বহুদিনের ভবনা। বিষয়টি সম্পর্কে আমার ভাবনার কথা সকলের সাথে শেয়ার করার মানসে আজ কিছু লিখলাম। আশা করি সকলেই কথাগুলো সংশোধনের নিয়্যাতে গ্রহণ করবেন এবং অন্যকে সংশোধনে সহযোগিতা করবেন।

অনেক মা আছেন এমন, যারা সন্তানের আসল ভবিষ্যতই চিনেন না। তারা মনে করেন সন্তানের জীবনকাল মোট তিনটিঃ (এক) লেখাপড়া শুরু করার আগে তিন/চার বছর (দুই) লেখাপড়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শিক্ষা জীবন (তিন) কর্মজীবনের শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। আর উক্ত তিন কালের মধ্যে সন্তানের আসল ভবিষ্যত হলো “কর্মজীবন”। তাই মায়েরা সন্তানের আসল ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে নিজেদেরকে এমনভাবে আত্মনিয়োগ করেন যে, মা ও সন্তান উভয়ের ভবিষ্যত ধ্বংস হয়ে যায়। কারণ এসকল মায়েরা নিজের সন্তানের ভবিষ্যত গড়তে এমানভাবে প্রতিজ্ঞা করেন যে, আমার সন্তান লেখাপড়া শুরু করার আগে তিন/চার বছর পর্যন্ত তার সুস্বাস্থ্য গড়তে বর্তমান বিশ্বের উন্নত চিকিৎসকদের সকল পরামর্শ মেনে তার স্বাস্থ্য পরিচর্যা করবো। আর তিন/চার বছর বয়স হওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য পরিচর্যার সাথে শুরু হবে তার শিক্ষা-দীক্ষার জন্য আমার নিরলস চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রম। তাই দেখা যায় সকালে সবার আগে ঘুম থেকে উঠে বাচ্চার নাশতা প্রস্তুত করে বাচ্চাকে সাথে নিয়ে হাজির হন প্রাইভেট টিচারের কাছে, বাচ্চা প্রাইভেট পড়তে পড়তে নাশতা খায়। আবার সকাল দশটা বাজতে বাজতে বাচ্চাকে প্রস্তুত করে নিজের সাথে নিয়ে উপস্থিত হন উন্নতমানের ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলে। সেখানে থাকেন বেলা দুই/তিনটা পর্যন্ত। স্কুল থেকে ফিরে আছর পর্যন্ত সংসারের সামান্য কাজ। গোসল, রান্না, খাওয়া দাওয়া। সুযোগ পেলে সামান্য বিশ্রাম। আছরের পরে সন্তানকে নিয়ে আবার কোন কোচিং সেন্টারে। কোচিং না থাকলে সন্তানের শরীর চর্চা, খেলাধুলা ও বিনোদনের জন্য নিকটস্থ কোন পার্ক, স্কুলমাঠ কিংবা ফাঁকা রাস্তায় বেরোতে হয়। মাগরিবের আযান হতে না হতে আবার শুরু সন্তানের রাতের লেখাপড়া। চলবে রাত সাড়ে দশটা-এগারোটা পর্যন্ত। এরপর রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে বা সাথে নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে কিছু সময় টেলিভিশনের আড্ডায়। অতঃপর কয়েক ঘন্টা ঘুমের জন্য বরাদ্দ। আবার পরদিন সকাল থেকে শুরু হবে একই রুটিনের কাজ। এভাবে অবিরাম মেহনতের মাধ্যমে মা তার সন্তানকে যোগ্য, দক্ষ ও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চান। আর এহেন নিরলস প্রচেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের টার্গেট থাকে সন্তানের ভবিষ্যত বা সুখময় কর্মজীবন। মা মনে মনে ভাবতে থাকেন আমার সন্তানের জন্য যদি আমি এভাবে চেষ্টা ও মেহন অব্যাহত রাখতে পারি তাহলে তার কর্মজীবন কাটবে হেসে খেলে। সরকারি চাকরি না হলেও উন্নত কোন কোম্পানির অনেক বড় অফিসারের চাকরি পাবে আমার সন্তান। প্রতি মাসে আয় হবে কয়েক লাখ টাকা। আমার পুত্রবধু হবে রাজধানী না হলেও বিভাগীয় শহরের সর্বোচ্চ ধনী ফ্যামিলির কোন উচ্চ শিক্ষিত রূপসী মডার্ণ মেয়ে। আর আমি তখন বুক ফুলিয়ে গলা উচু করে বলবো “আমি একজন সফল মা”। কপাল আরেকটু ভালো হলে “রত্নগর্ভা” উপাধিও আমার ভাগ্যে আসতে পারে।

️এভাবে সন্তানের স্বাস্থ্য পরিচর্যা, বিনোদন ও লেখাপড়ার গাইড দিতে চলে যায় সারাদিন। সময় মত পাঁচওয়াক্ত নামায, সারাদিনে একটু কুরআন তিলাওয়াত বা অন্য কোন ইবাদত-বন্দেগির তেমন কোন ফুরসত পাওয়া যায় না বললেই চলে। আর স্বামী বেচারা, সে তো বাচ্চা ও বাচ্চার মায়ের বাজার করতে করতেই কাহিল। স্ত্রীর কাছ থেকে একটু আদর-সোহগ বা সেবা-যতœ পাওয়ার আশা করাটাও অন্যায়।

প্রিয় পাঠক বন্ধুরা! বলুন তো এ মা মরণের পরে তার রবের কাছে কী পরিমাণ প্রশংসা ও পুরষ্কারের যোগ্য হবে? আমার তো মনে হয়, এ মা পরকালে হবেন সবচেয়ে অসহায়। তাকে পোড়ানো হবে জাহান্নামের এমন আগুনে যা প্রজ্বলিত করা হবে মানুষ ও পাথরের সাহায্যে। কারণ এ মা দুনিয়াতে সন্তানের ভবিষ্যত গড়তে গিয়ে ধ্বংস করেছেন নিজের ভবিষ্যত।
আর এ মা সন্তানকেও ধ্বংস করেছেন নিজ হাতে। কারণ তিনি সন্তানের ভবিষ্যত চিনতেও সক্ষম হননি। তিনি মনে করেছিলেন সন্তানের কর্মজীবনই আসল ভবিষ্যত। তাই সুখময় ও বিলাস বহুল কর্মজীবন গড়ার লক্ষ্যে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তিন/চার বছর বয়সে। আর স্কুলের শিক্ষা সিলেবাস ছিলো এমনভাবে রচিত যার প্রতিটি বর্ণ-শব্দ ও গল্প-অধ্যায় ছিলো সুখময় ভবিষ্যতের পূর্বাভাস। ধর্মীয় শিক্ষার একটি অক্ষরও ছিলো না তাতে। কিন্তু কুরআন ও হাদীসের আলোকে স্পষ্টভাবে জানা যায় যে, অমুসলিম পিতা-মাতা ও সন্তানদের জীবনকাল উক্ত তিন প্রকারে সীমাবদ্ধ হলেও কোন মুসলিম পিতা-মাতা ও সন্তানের জীবনকাল কোনভাবেই উক্ত তিন প্রকারে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। বরং এ ব্যাপারে কুরআন স্পষ্ট ও সাফ কথা বলে যে, মুসলমানদের জীবনের আরো একটি কাল আছে, তা হলো আখিরাত বা পরকাল। মৃত্যুর পর হতে যেকালের শুরু। পরকাল জীবনের কোন শেষ নেই। তাই আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন যে, নিশ্চয় আখিরাতের জীবনই আসল জীবন।

প্রিয় পাঠক বন্ধুরা! এখন একটু চিন্তা করে বলুন তো, মুসলমানদের আসল ভবিষ্যত কোনটা। নিঃসন্দেহে পরকাল জীবনই আসল ভবিষ্যত। কিন্তু এ মা নিজের সন্তানের প্রতি এমন দরদ প্রকাশ করলেন যে, তার আসল ভবিষ্যত গড়ার জন্য এক মিনিটও কাজ করেননি। বরং ধর্ম শিক্ষার জন্য একটি ঘন্টা সময় ব্যয় করাও তার কাছে ছিলো মুল্যবান সময় অপচয়ের শামিল। এজন্যই তার সন্তানকে মসজিদের মক্তবে পড়ার মত সুযোগও দেননি। ফলে তার আদরের দুলাল চিনতে পারেনি তার রবকে। শিখতে পারেনি তার রব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আকিদা-বিশ্বাস। শিখতে পারেনি ইসলামের মৌলিক বিধি-নিষেধ। ঈমানের কালিমা, পাক-পবিত্রতা, উজু- গোসল, নামায-যাকাত ও রোযার মাসাইল কিছুই সে শেখেনি। শেখেনি দৈনন্দিন জীবনের অত্যাবশ্যকীয় হালাল-হারাম ও জাইয-নাজাইযের মাসাইল। এভাবে ইসলামের সকল বিষয়ের শিক্ষা-দীক্ষা থেকে সে হলো সম্পূর্ণ বঞ্চিত। আর জাগতিক বিদ্যার বিশাল ডিগ্রী অর্জন করে শুরু করলো কর্মজীবন। এখন তার বেশভ‚ষা, পোষাক-পরিচ্ছদ, বিবাহ-শাদী, লেনদেন, আত্মীয়তাসহ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সম্পূর্ণ ইসলাম মুক্ত। বলুন তো বন্ধুরা, এ হতভাগা সন্তান তার আসল ভবিষ্যতে কী পরিমাণ সুখ-শান্তির অধিকারী হবে? আমার তো মনে হয় এ সন্তানও হবে তার মায়ের মতই অসহায়। তাকেও পোড়ানো হবে জাহান্নামের এমন আগুনে যা প্রজ্বলিত করা হবে মানুষ ও পাথরের সাহায্যে।

প্রিয় পাঠক বন্ধুরা! আসুন মুসলিম হলে নিজের ও সন্তানের আসল ভবিষ্যত গড়তে আগে চেষ্টা করি। আমাদের সন্তানদের জন্য আগে কমপক্ষে ইসলামের ফরজ পরিমাণ দ্বীনী শিক্ষার ব্যবস্থা করি। তারপর প্রয়োজনে অন্য শিক্ষার ফিকির করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে তাউফীক দান করুন, আমীন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন