চলাচল অনুপযোগী ছিল এমএল সাবিত আল হাসান – ছবি : সংগৃহীত

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৭, এপ্রিল, ২০২১, বুধবার
<strong>চলাচল অনুপযোগী ছিল এমএল সাবিত আল হাসান – ছবি : সংগৃহীত</strong>

অনলাইন ডেস্ক: শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবির ঘটনার কারণ উদঘাটনে মাঠে নেমেছে নৌপরিবহন অধিদফতর কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক ও নৌ অধিদফতরের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার এহতেসানুল হক ফকিরের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য অধিদফতরের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামীম আরা ও পরিদর্শক মো: হাবিবুর রহমান গতকাল মঙ্গলবার দুর্ঘটনাস্থল ও ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ এমএল সাবিত আল হাসান পরিদর্শন করেন। গত রোববার সন্ধ্যা ৬টার দিকে মদনগঞ্জ এলাকায় নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর কাছাকাছি এসকেএল-৩ নামের একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চটি ডুবে যায় বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। ওই দুর্ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৫ যাত্রীর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসকেএল-৩ নামের জাহাজটি এখনো আটক করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে ওই জাহাজটি প্রভাবশালী এক ব্যক্তির ছেলের। এ দিকে ডুবে যাওয়া সাবিত আল হাসান চলাচলের উপযোগী ছিল না বলে জানা গেছে। লঞ্চটির নির্ধারিত কোনো মাস্টার ছিল না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এমএল সাবিত আল হাসান ডুবে যাওয়ার জন্য শুধু কার্গো জাহাজটিকে দায়ী করা হলেও যাত্রীবাহী লঞ্চটি আদৌ চলাচলের উপযোগী ছিল কিনা, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কার্গো জাহাজের ধাক্কায়ই লঞ্চটি ডুবে গেছেÑ এ তথ্য এখনো প্রমাণিত হয়নি। সোমবার দুপুরে লঞ্চটি তীরে ওঠানোর পর দেখা গেছে, এটি রীতিমতো লক্কড়-ঝক্কর ধরনের নৌযান। সাধারণ চোখেই এর অবকাঠামোগত নানা ত্রুটি ধরা পড়ে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এমএল সাবিত আল হাসান লঞ্চটি চলাচলের অনুপযুক্ত ছিল। বার্ষিক সার্ভের (ফিটনেস পরীক্ষা) সময় এটিকে শুধু দিনের বেলা চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, ১৯৮৩ সালে নির্মিত নৌযানটির অবকাঠামো ছিল কাঠের। ২০০৩ সালে এটিকে স্টিলে রূপান্তর করা হয়। এর নিবন্ধন নং এম-১০৩৮৩ এবং দৈর্ঘ্য ১৬ দশমিক ২ মিটার। যাত্রী ধারণক্ষমতা সর্বোচ্চ ৬৮ জন। সর্বশেষ চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি নৌ পরিবহন অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ কার্যালয় থেকে সার্ভে করা লঞ্চটির চলাচলের অনুমতি (সার্ভের মেয়াদ) ছিল আগামী ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ ছাড়া লঞ্চটির মাস্টার (যিনি চালাচ্ছিলেন) হিসেবে মো: জাকির হোসেনের কথা বলা হলেও তিনি লঞ্চে চাকরি করেন না। এমনকি সার্ভের সময়েও মাস্টার হিসেবে সেখানে তিনি কর্মরত ছিলেন না। এ সংক্রান্ত কাগজপত্রেও সই করেননি এবং তার অজ্ঞাতে তার মাস্টারশিপ সনদের ফটোকপি ব্যবহার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো নৌযান সার্ভের সময় সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ারের সামনে মাস্টার ও ড্রাইভারের সশরীরে উপস্থিত বাধ্যতামূলক। এছাড়া সার্ভেয়ার নিজে তাদের সনদ ও সই যাচাই-বাছাই করবেন। এ ক্ষেত্রে মাস্টার জাকির হোসেন যদি ওই লঞ্চে চাকরি না করেন তাহলে সার্ভে প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ার গুরুতর অপরাধ করেছেন। একাধিক সূত্র অভিযোগ করেছে, এ ধরনের কাজে নৌযানের মালিকপক্ষ ও শিপ সার্ভেয়ারের মধ্যে অলিখিত সমঝোতা হয়ে থাকে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মো: শাহরিয়ার হোসেন কয়েক মাস আগে পরিদর্শন ছাড়াই এমভি গোলাম রহমান (নিবন্ধন নং এম- ৭২৪১) নামের একটি কার্গো জাহাজের সার্ভে সনদ দিয়েছিলেন। অথচ জাহাজটি ২০১৮ সালে মেঘনায় দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে ডুবে যায় এবং পরবর্তী সময়ে মালিক জাহাজটি উত্তোলন করেননি। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলে জাহাজটির সার্ভে সনদ বাতিল করা হয়। তবে ভৌতিক জাহাজের সার্ভে দেয়া সত্ত্বেও অদৃশ্য কারণে অভিযুক্ত কর্মকর্তা শাহরিয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের ইঞ্জিনিয়ার অ্যান্ড শিপ সার্ভেয়ার মো: শাহরিয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, লঞ্চটিতে জাকির হোসেন নামে কোনো মাস্টার ছিলেন না- এ তথ্য সঠিক নয়। সার্ভের জন্য লঞ্চ মালিক নিজেই আমাদের এখানে আবেদন করেছেন এবং জাকিরের মাস্টারশিপ সনদ এখানে এন্ডোর্সমেন্ট করা আছে। তিনি আরো বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সার্ভের পর মালিকরা মাস্টার ও ড্রাইভার চেঞ্জ করেন। তখন আমাদের করার কিছু থাকে না। জাকিরের সনদে ‘অনলি ফর নারায়ণগঞ্জ রিভার পোর্ট এরিয়া’ (নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর এলাকার বাইরে যেতে পারবেন না) লেখা আছে।

নয়াদিগন্ত

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন