ময়মনসিংহের গৌরীপুরের গাভীশিমূল গ্রামে হারিয়ে যাওয়া এক সর্দারবাড়ি

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৭, এপ্রিল, ২০২১, বুধবার
<strong>ময়মনসিংহের গৌরীপুরের গাভীশিমূল গ্রামে হারিয়ে যাওয়া এক সর্দারবাড়ি</strong>

ময়মনসিংহ থেকে আবুল হাসান হাশেম,ব্যুরো রিপোর্টার |

ইতিহাস-ঐতিহ্যের কাছাকাছি যদি কেউ কয়েক ঘন্টা কাটাতে চায়, তাহলে নির্দ্বিধায় ঘুরে আসতে পারে ‘গাভীশিমূল দালানবাড়ি’ হিসেবে পরিচিত পাঁচ থেকে ছয়শো বছরের প্রাচীন রাজ প্রাসাদ বা সর্দারবাড়ি।

ময়মনসিংহের গৌরীপুর শহর থেকে এর দূরত্ব দুই কিলোমিটার। এটি গৌরীপুর উপজেলা হাসপাতাল কমপ্লেক্স থেকে আধা কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত। বারোভুঁইয়ার সময় থেকে ঔপনিবেশিক আমলের সাক্ষ্য বহনকারী সর্দারবাড়ী যা মোমেনসিং পরগনার পাঠান সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম।

মোমেনসিং পরগনার বিদ্যমান ছয় সাতটি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক সর্দারবাড়ির মধ্যে একটি, যা গৌরীপুর উপজেলার গাভীশিমূল গ্রামে অবস্থিত। এ পরগানার প্রাচীনতম প্রাসাদগুলির মধ্যে এটি একটি। একসময় মধ্যযুগের লোকদের বসবাস ছিল এখানে। প্রাচীন সেই ঐতিহ্যের তেমন কিছু আর নেই। এখন আছে শুধু ঘুরে দেখার মতো ঐতিহাসিক পুরনো একটি রাজপ্রাসাদ। এটা যে এক সময় রাজবাড়ি কারুকার্যে সুন্দর্য অতুলনীয় ছিল, তা এর বর্তমান অবস্থিতি দেখলে এখনও সুলতান বা পাঠান আমলের ইমারত বলে অনুমান করা হয়। ভবনে চুনের সাথে অথবা চুনের বিকল্প ঝিনুকচুর্ণ ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। পাতলা ইটের সাথে চুন, সুরকির গাঁথুনি ও পলেস্তেরা দিয়ে নানা কারুকার্যখচিত। সাপের ভয়ে ইমারতটির ভেতরে ঢুকে না সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া আর একটি কারণ ভবনটি মুঘল বা পাঠান আমলের নির্মাণ এবং ছাদে কোন লোহা বা কাঠ না থাকার কারণে যে কোনো সময়ে ছাদ ধসে পড়তে পারে বলে আশংকা করা হয়।

ইমারতের পাশে চিকন ইটের তৈরি একটি পুরনো ইন্দারা। ইন্দারাটি খননের মাধ্যমে অনেক প্রত্নতত্ত্ব পাওয়া যেতে পারে। তাছাড়া এ ইন্দারায় এক সময়ে একটি গজার মাছ ভাসতো। আবার জীন মনে করেই অনেকে এ মাছ খেতো না।

ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাফেয়ার্স এর যৌথ উদ্যোগে আড়াইশ’ বছর আগে ব্রিটিশ ভূবিদ জেমস রেনেলের মানচিত্র সংগ্রহের মাধ্যমে মোমেনসিং পরগনার প্রাচীন নিদর্শন খোঁজার জন্য ২০২০ হতে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়। জরিপকালীন সময়ে গৌরীপুর শহর থেকে এক থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বের এক গ্রামে ঐতিহাসিক নিদর্শন খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করা হয় প্রাচীন সর্দারবাড়ি। তখন এ বাড়ি নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। প্রত্নসমৃদ্ধ গৌরীপুর অঞ্চলের এ সর্দারবাড়ির কোন ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। তা গবেষণা, জরিপ, জনশ্রুতি ও কিংবদন্তির উপর ভিত্তি করে প্রাচীন ইমারতের ইতিহাস তুলে ধরা হলো।

ইতিহাসবিদদের ধারণা, ঈসা খাঁর আমলের ভবন এটি। গৌরীপুর উপজেলায় কয়েক শতাব্দী পুরনো অনেক ভবন ছিল, যা বাংলার বারোভূঁইয়াদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

জরিপকালীন সময়ে গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে পুরনো বাড়ির ইতিহাস নিয়ে কথা হয়। এ গ্রামের প্রবীণ নিবাসী আইনল হক (৯৩) বলেন, এ বাড়ির নির্মাণের সঠিক ইতিহাস কেউ জানে না। তিনি অতীতের স্মৃতি ঘেটে বলেন, তার বাবা আব্দুর রহমান মুন্সী ৯২ বছর এবং দাদা অলি মাহমুদ সরকার ১২০ বছর বয়সে মারা যান। তার দাদার দাদারও জানে না ভবনের ইতিহাস। তার জানা মতে পাচঁ পুরুষ পর্যন্ত কেউ জানে না এ দালানের ইতিহাস। হয়তো এই দালান নির্মাণের বয়স ৪০০ বছরের অধিক হতে পারে।

তিনি পূর্বপূরুষদের কাছ থেকে শুনেছেন, দালানের উত্তরের কক্ষে একটি হাজতখানা ছিল এবং এখানে প্রাচীনকালের বিচারকার্য পরিচালিত হতো। তৎকালীন রাজা বা সর্দাররা বিচার বিভাগের প্রধান ছিলেন।

তিনি আরও বলেন, দালানের পূর্ব দিকে একটি বিশাল নদী ছিল যা কাইড়া নদীর নামে পরিচিত। কাইড়া নদী ছিল তাদের বাড়িসংলগ্ন। বর্তমানে সেখানে ধান ক্ষেত ও বসতবাড়ি। কথা বলতে বলতে তিনি খানিকটা থেমে তার স্মৃতি মন্থন করতে থাকেন। তারপর বলেন, তার হৃদয়ে গেঁথে আছে কাইড়া নদীর নামকরণের ইতিহাস। নদীর ওপারে ছিল গভীর জঙ্গল। সেখানে বাঘসহ নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বসবাস ছিল। তাই নদীর ওপারে একা কেউ বা কোন গরু ছাগল গেলে বন্যপ্রাণীরা ওতপেতে কাইড়া নিতো, কিংবা হয়তো বাড়িতে ফিরে আসতো না। তাই নদীর নাম কাইড়া।

তিনি আরও বলেন, দুই নদীর সংযোগস্থল এখানে, নদীতে খরস্রোত ও অনেক কুড় ছিল। নদীর পথে যাওয়ার সময়ে অনেক বণিক মানত করতো।

আইনল হক যখন এ কথা বলছিলেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন এ গ্রামের বাসিন্দা মো. ফখর উদ্দিন (৫৭)। এ তথ্যবহুল এই আলোচনায় ফখর উদ্দিন বলেন, এই ইতিহাসটি শত শত বছরের পুরানো মুখের কথা যা বইয়ে লেখা হয়নি। তিনি যা বলেছেন তা সত্য। কাইড়া নেয়ার এই করুণ কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় কাইড়া।

ভৌগোলিক অবস্থান সর্ম্পকে একটু আলোকপাত করা প্রয়োজন। একসময় ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের প্রশস্ততা ছিল পনেরো থেকে বিশ কিলোমিটারের মতো। আড়াইশ’ বছর আগের রেনেলের মানচিত্র দেখে মনে হচ্ছে নামহীন একটি বড় নদী জঙ্গলবাড়ি হতে শাহগঞ্জ বাজার, তাজপুর ও ভূটিয়ারকোনার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শ্যামগঞ্জ বাজারের নিকটে সোহাই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। এই নদীর ভূমিকা ছিল অপরিসীম। নদীপথ ব্যবহার করে ইউরোপীয় বণিক, সওদাগর এমনকি রাজা জমিদার ভ্রমণ করেছেন বিভিন্ন স্থান। তখন এই নদীর প্রশস্ততা ছিল এক থেকে দুই কিলোমিটারের মতো।

ইতিহাস অনুসন্ধান করলে জানা যে, কয়েক শতাব্দী পুরনো ভবনটি , যা বাংলার বারোভূঁইয়াদের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৭৮৭ সালে ভূমিকম্পের কারণে অনেক রাজবাড়ি ফাটল সৃষ্টি হলে জমিদার আমল থেকে ইমারতগুলি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। যার ফলে বাড়িগুলো জঙ্গলে পরিণত হয়। যেমন লালচেপুর দালাইন্না জঙ্গল। এ জঙ্গলে প্রাচীন দালান ছিল। এ বিষয়ে আইনল হক বলেন, এ পুরাতন দালানে বাংলা ১৩৫০ সন পর্যন্ত লোকজনের বসবাস ছিল।

এলাকাবাসী বলছে, পুরাতন ভবনটিকে সংস্কার বা পরিষ্কার পরিছন্ন করে দর্শনীয় পরিবেশ সৃস্টি করে এটিকে জাদুঘরের একটি অংশ হিসেবে রূপান্তর করা যেতে পারে। তখন এ এলাকায় দেশি বিদেশি পর্যটকদের কৌতুহল সৃষ্টি হবে প্রাচীন এই রাজপ্রাসাদ বা সর্দারবাড়িকে ঘিরে।

গাভীশিমূল নিবাসী ও পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফের্সাস ম্যাগাজিনের সম্পাদক আজম জহিরুল ইসলাম বলেছেন, এখানে ছবি তোলার জন্য একটি সুন্দর জায়গা।’ ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ এ জনপ্রিয় গানটি স্বরণ করে দেয় কাইড়া নদীর কথা যা এক সময় কাইড়া নিতো অনেক প্রাণ।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, অনেক কিছু মানুষের অজানা রয়েছে। প্রবীণ আইনল হকের নদীর বর্ননা ও আড়াইশ’ বছর আগের রেনেলের মানচিত্রে একটি অংকিত নদীর চিত্র মিলে গেছে। নদীটি লামাপাড়া গ্রামের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে শ্যামগঞ্জ বাজারের নিকট সোহাই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে।

পূর্ব ময়মনসিংহকে পর্যটন নগর হিসেবে দেখতে হলে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা নির্মাণ প্রয়োজন। প্রতিটি ঐতিহাসিক বা পুরাতন মসজিদ, মন্দির, মাজার, দুর্গ, রাজপ্রসাদ এক একটি পর্যটন হতে পারে। এ ইমারতের ভেতরে চিহ্ন হিসেবে স্থাপত্যিক বৈশিষ্টগুলো মুঘল স্থাপত্যশৈলীকেই স্মরণ করিয়ে দেয়।

সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর, ১৫৯৯ সালে খাজা উসমান খাঁ গৌরীপুরের বোকাইনগর দুর্গ পুনর্নিমাণ করে একে ২০ হাজার সৈন্যের একটি শক্তিশালী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করতে সক্ষম হন। খাজা উসমান খাঁ হাসানপুর এবং এগারোসিন্দুরে আরও দুটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিশাল ব্রহ্মপুত্র নদী ছিল পশ্চিমের মুঘল অঞ্চল এবং পূর্বে খাজা উসমানের অঞ্চলের মাঝে সীমারেখা। তখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় সর্দারবাড়ি নির্মাণ হয়েছিল।

সুলতানি আমলের পথ ধরে মোঘল আর সর্বশেষ ব্রিটিশ রাজত্বের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক বেশ কয়েকটি সর্দারবাড়ি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে গৌরীপুর ও তৎসংলগ্ন জায়গায় এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তাছাড়া ১৭৮৭ সালের পর গৌরীপুরে যতো উপনদী ছিল পর্যায়ক্রমে সব নদী খাল, বিল, ধানক্ষেত ও গ্রামে পরিনত হয়েছে। #

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন