রমজানের প্রস্তুতি : পথ ও পাথেয়

বিজয় বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৮, এপ্রিল, ২০২১, বৃহস্পতিবার
রমজানের প্রস্তুতি : পথ ও পাথেয়

মুফতি মুহিউদ্দিন কাসেমীঃ

রমজান সমাগত। বারো মাসের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মাস হচ্ছে রমজান। রমজান হল ইবাদতের মৌসুম। চাষি ও কৃষকদের কাছে ফল এবং ফসল কাটার মৌসুম হচ্ছে সবচেয়ে আনন্দের ও তৃপ্তির। সারাবছর সে এ সময়ের অপেক্ষায় থাকে। তার অপ্রাপ্তি ও অভাব ঘুচবে, সমস্যা দূরীভূত হবে। তদ্রূপ একজন মুমিনের কাছে রমজান হচ্ছে ফল ও ফসলের মৌসুম। সাধারণ সময়ের তুলনায় রমজানে ইবাদতের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়।

রহমত, বরকত, ক্ষমা-মাগফিরাত, সবর, শুকর ও ইবাদতের বার্তা নিয়ে রমজান আমাদের দোড়গোড়ায়। রমজানের রোযা ইসলামের মূল স্তম্ভের একটি। রোযার গুরুত্ব অপরিসীম। রমজান আসে গোনাহ মাফ করানোর জন্য। রমজান আসে মুমিনের জীবনকে নতুনভাবে সাজানো ও গুছানোর জন্য। রমজান আসে জাহান্নামিদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য। কোনো কাজের প্রস্তুতি ছাড়া ভালোভাবে তা সম্পন্ন করা যায় না। সামনে যেহেতু রমজান; তাই আমাদেরকে এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া দরকার। আমাদের পথ ও পাথেং সংগ্রহ করে রাখা উচিত। যেন রমজান আসার পর নানান তালবাহানা করে সময় নষ্ট না করি।
.
রমজান পর্যন্ত হায়াতের দোয়া
রমজানের এতো গুরুত্ব থাকার কারণে এর প্রস্তুতি নেওয়ার একটা ব্যাপার আছে। প্রস্তুতি ছাড়া কোনো কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন হয় না। ‘শাবান’ মাসকে বলা হয় রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণের মাস। রমজানকে বাদ দিলে শাবান ছাড়া অন্য কোনো মাসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এত রোযা রাখতেন না। আমরা লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, পৃথিবীতে বৃষ্টি হওয়ার আগে একটা ঠাণ্ডা বাতাস বইতে থাকে। এই বাতাসটা হলো বৃষ্টির আগমনী বার্তাবহ। রহমতের বৃষ্টির আগমনী বার্তা দিয়ে যায় এই বাতাস। সাথে সাথে যেন ঘোষণা করে যায়, আসছে সেই বৃষ্টি, যার প্রতীক্ষা মানুষ করছিল। তেমনি রমজান হলো সেই মাস, যার জন্য প্রতীক্ষা করে আল্লাহওয়ালাগণ। এই মাস আসার দু’মাস আগে থেকেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করতেন :
عَنْ أَنَسٍ، قَالَ: كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا دَخَلَ رَجَبٌ، قَالَ: ” اللهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ ”
অর্থ : আনাস ইবনে মালেক রা. হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রজব মাস আসার পর এই দোয়া করতেন : ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে রজব ও শাবান মাসে বরকত দান কর এবং রমজানে আমাদেরকে পৌঁছাও।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৩৫৩৪; মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২৩৪৬)

অনেক সালাফ তো ছয় মাস আগে থেকেই দোয়া শুরু করতেন। বিশিষ্ট তাবেয়ি মুআল্লা ইবনে ফজল রহ. বলেন :
كَانُوا يَدْعُونَ الله سِتَّةَ أَشْهُرِ أَنْ يُبَلِّغَهُمْ رَمَضَانُ، ثُمَّ يَدْعُونَهُ سِتَّةَ أَشْهُرٍ أَنْ يَتَقَبَّلَهُ مِنْهُمْ.
অর্থ : তাবেয়িগণ রমজানের ছ’মাস আগ থেকেই দোয়া করতেন, আল্লাহ যেন তাঁদেরকে রমজান মাস পর্যন্ত পৌঁছে দেন। এরপর রমজান মাস চলে গেলে পরের ছ’মাস দোয়া করতেন, যেন রোযা কবুল করে নেন। (ইবনে রজব হাম্বলি রহ. রচিত : লাতায়েফুল মাআরেফ : খ.১, পৃ. ১৪৮।)

অনেক তাবেয়ি এভাবেও দোয়া করতেন :
اللَّهُمَّ قَدْ أَظَلَّنَا شَهْرُ رَمَضَانَ وَحَضرَ فَسَلِّمْهُ لَنَا وَسَلِّمْنَا لَهُ، وَارْزُقْنَا صِيَامَهُ وَقِيامَهُ، وَارْزُقْنَا فِيهِ الجِدَّ وَالاجْتِهَادَ وَالنَّشَاطَ، وَأَعِذْنَا فِيهِ مِنْ الفِتَنِ
আবার ইচ্ছে করলে এ দোয়াও পড়া যায় :
اللَّهُمَّ سَلِّمْنِي إلى رَمَضَانَ وَسَلِّمْ لِي رَمَضَانُ وَتَسَلَّمْهُ مِنّي مُتَقَبَّلاً
(موارد الظمآن لدروس الزمان، خطب وحكم وأحكام وقواعد ومواعظ وآداب وأخلاق حسان খ.১, পৃ. ৩৩৮)

নেক হায়াতের দোয়া সবসময়ই করা যায়। বিশেষত রমজানের ছ’মাস অন্তত দু মাস আগে বারবার এ দোয়া করা যেতে পারে। কারণ, রমজান হল অবারিত রহমত ও ক্ষমার মাস। এতদিন বাঁচলাম আর দুটো মাস বাঁচলেই তো রমজান পেতে পারি।
.
রমজানের প্রস্তুতি
রমজানের প্রস্তুতি শারীরিক ও মানসিক। শারীরিক কোনো সমস্যা থাকলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হলে রমজানের আগেই এসব করা উচিত। পারিবারিক বা ব্যক্তিগত বা অন্য কোনো ঝামেলা থাকলে রমজানের আগেই মুক্ত হওয়া উচিত। যেন রমজানে বেশি থেকে বেশি ইবাদত করা যায়। এমন যেন না হয় যে, রমজানে সব কাজ জমা পড়ে গেল। তখন কেবল ফরজ রোযা রাখাই মুশকিল; নফল ইবাদত তো পরের বিষয়। সুতরাং সব ঝামেলা রমজানের আগেই শেষ করা উচিত। এটাই রমজানের প্রস্তুতি। এমনকি বাজারশদাই করার বিষয়ও থাকে। অনেকে রমজানের অর্ধেক সময় কেবল কেনাকেটা করেই কাটিয়ে দেয়। ফলে ইবাদত করার সময় পায় না। সব ধরনের ঝামেলা মিটিয়ে রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত। রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ মাস জীবনে কয়বায় পাবে মানুষ!
রমজানকে স্বাগত জানানোর জন্য মিছিল ও র‌্যালি করার প্রচলন শুরু হয়েছে। এভাবে স্বাগত জানানোর কোনো উপকার নেই। স্বাগত জানাতে হবে প্রস্তুতির মাধ্যমে। নিজের প্রাত্যহিক রুটিনে পরিবর্তন আনার দ্বারা। সারা বছরের সাধারণ রুটিনে ব্যস্ততা থাকে বেশি, ইবাদতের সময় পাওয়া যায় কম। তাই রমজানের আগে নিজের রুটিনে পরিবর্তন আনার চিন্তা করতে হবে। রমজান আসতেই যেন পুরো সময় ইবাদতে কাটানো যায়। এটাই প্রকৃত প্রস্তুতি ও স্বাগত জানানোর পদ্ধতি।

সালাফে সালিহিন নয় নিকট অতীতের বুজুর্গদের জীবনের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই বৃদ্ধ বয়সেও তাঁরা যেভাবে রমজান কাটিয়েছেন, যেভাবে ইবাদত করেছেন; আমরা সেভাবে পারি না।

একটি সুন্দর রমজান আমাদের কাম্য, আমাদের পরম আরাধ্য। আমরা চাই সুন্দর একটি রমজান কাটাতে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু করি। দুনিয়া তো দারুল আসবাব। উপকরণ দিয়ে সবকিছু হয়। আর মানুষের মনও উপকরণের প্রতি ধাবিত হয়। যথেষ্ট উপকরণ থাকলে মনও শান্ত ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকে। তাই আসুন আমরা রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণ করি। সেজন্যে আমরা এ কাজগুলো করতে পারি।
.
০১. বাজারসদাই ও ঈদের কেনাকাটা করে রাখা

রমজানের পুরো সময়ই গুরুত্বপর্ণ। একটা মুহূর্তও নষ্ট করা যাবে না। রমাজনের সময়কে কাজে লাগাতে হলে রমজানের কেনাকাট রমজান শুরুর আগেই করে রাখতে হবে। কেনাকাটা দুই ধরনের। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। যেমন তেল, চাল, ডাল ইত্যাদি। কাঁচাবাজার ব্যতীত বাকি সবকিছু একসাথে এক মাসের বা অন্তত পনের দিনের বাজার একসাথে করে রাখব। মাছ গোশত কিনে ফ্রিজিং করে রাখতে পারি। অফিসে বা দোকানপাটে যাওয়া-আসার সময় প্রয়োজনীয় কাঁচাবাজার করে নিয়ে আসব। খেয়াল রাখব যেন কোনোভাবেই সময় নষ্ট না হয়।
আরেক ধরনের কেনাকাটা হচ্ছে ঈদের জন্য। সবচেযে ভালো হয় রমজান শুরু হওয়ার আগে পারিবারিক মিটিংয়ে বসুন। পরামর্শ করুন কার কার জামাকাপড় লাগবে। কোন কোন আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী বা মানুষজনকে কাপড়চোপড় দিতে হবে। লিস্ট করে পাইকারি মার্কেট হতে কেনাকাট করে ফেলুন। টেইলার্সে বানানোর মতো হলে অর্ডার দিয়ে দিন। অনেক ভাইকে দেখেছি, রমজান শুরু হওয়ার আগেই রমজান আসার আগেই কেনাকাটা করে ফেলে। সব ঝামেলা শেষ।
.
০২. গরিবদের জন্যও কেনাকাটা করুন

রমজান মাসে দেখবেন প্রায় বাড়িতে দাওয়াত থাকে। মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিন সাহেবগণ দাওয়াত খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে যায়। কাউকে দাওয়াত খাওয়ানো অবশ্যই ভালো কাজ। তবে মনে রাখতে হবে, এভাবে বিশাল একটি অনুষ্ঠান করে খাওয়ানোর চেয়ে উত্তম হচ্ছে, বাজারসদাই করে গরিব মানুষের ঘরে পৌছে দেওয়া। প্রকৃত হকদারগণ পাবে। আপনার ফায়দা হবে বেশি। অধিকাংশ সময় আমরা এমন লোকদের দাওয়াত করে খাওয়াই, যাদের ঘরে খাবারের অভাব নেই। কিন্তু আমাদের সমাজের এমন অনেক পরিবার আছে যারা সামান্য খাবার খেয়ে রোযা রাখবে। আমার আপনার দস্তরখানে বাহারি খাবার, মাছ মাংস, ফলমূল, দুধকলা থাকে। আমি কি পারি না আমার সামর্থ্য অনুযায়ী কয়েকজন গরিব মানুষকে রমজানের বাজার করে দিতে?
হাদিসে এসেছে, কেউ কোনো রোযাদারকে ইফতার করালে রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব আল্লাহ তাআলা তাকে দান করেন। এখানে ইফতার করানো মানে আপনার সাথে বসে ইফতার করাতে হবে, এমন না। আপনি বাজার করে দেন; সে তার মতো রান্না করে খাবে। অথবা নগদ টাকাও দিয়ে দিতে পারেন। সে বাজার করে নিবে।
.
০৩. যাকাতের হিসাব ও প্রস্তুতি

প্রতি একবছর পরপর যাকাত ফরজ হয়। যাকাত দিতে হয় হিসাব করে। শতকরা ২.৫০ পার্সেন্ট যাকাত দিতে হয়। আপনার সম্পত্তি কোথায় আছে, কার কাছে আছে, কত টাকা ঋণ আছে, কত টাকা বাদ দিয়ে যাকাতের হিসাব করতে হবে ইত্যাদি সময় সাপেক্ষ বিষয়। আপনার ঝামেলা মনে হলে বিজ্ঞ কোনো মুফতি সাহেবের শরণাপন্ন হন। যাকাতের হিসাব করুন। তারপর কাকে কাকে যাকাত দিবেন, কোথায় দিবেন, এসব ফাইনাল করে ফেলুন। কারণ, রমজান আসার পর এতকিছু ভাবার সময় নাও পেতে পারেন। আগেই হিসাব করে রাখুন; রমজান আসার পর গ্রহীতাদের কাছে যাকাত পৌছে দিন।
যাকাত হিসেবে নগদ টাকাও দেওয়া যায়; আবার মূল্যবান যে কোনো জিনিসও দেওয়া যায়। খাবার বা কাপড়চোপড়ও দিতে পারেন। শিক্ষাসামগ্রী দিতে পারেন। গরিব এতিম ছাত্রকে ল্যাপটপ বা কম্পিউটার বা বইপত্র কিনে দিলেও হবে। তাই জিনিসপত্র দিয়ে যাকাত আদায় করলে তো কেনাকাটা করতে হবে এবং কাদেরকে দিবেন, তাও নির্ণয় করা দরকার। এ কাজগুলো রমজান আসার আগেই করে ফেলা উচিত।
.
০৪. অন্যান্য কাজকাম আগেই সেরে ফেলুন

একেক মানুষের একেক ধরনের ঝামেলা ও সমস্যা থাকে। বিভিন্ন কাজ করতে হয়। কারও পাওনা বাকি থাকে। কারও বাড়িতে বেড়াতে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কারও পাওনা থাকে। সাংসারিক ও পারিবারিক ঝামেলা থাকে। অফিসিয়াল কাজ থাকে। যথাসম্ভব এসব কাজকাম ও ঝামেলা রমজান মাস আসার আগেই সেরে ফেলা। যত রকমের ঝামেলা হতে পারে, সব রমজানের আগে শেষ করুন। কারণ, রমজান ইবাদতের মাস। রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
.
০৫. তারাবির মসজিদ/স্থান ঠিক করুন

রমজানের গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে তারাবির নামায। আপনি তারাবি কোথায় পড়বেন, তা ঠিক করে ফেলুন। অবশ্যই খতম তারাবি পড়ব। মারাত্মক সমস্যা হলে সূরা তারাবি পড়া যায়। তবে আমরা চেষ্টা করব খতম তারাবির জন্য। যেসব মসজিদে খুব দ্রæত তেলাওয়াত করে সেসব মসজিদে না যাওয়া উত্তম। যেসব মসজিদে খুব আস্তে আস্তে তেলাওয়াত করে সেখানে যান। আজকে তো আমার এসি মসজিদ খুঁজি। ধীরে তেলাওয়াতের মসজিদ খুঁজি না। তারাবিকে আজকাল আমরা তাড়াহুড়োর নামায বানিয়ে ফেলেছি। আমি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ কেউ হলে মসজিদে যেন তারাবি আস্তে আস্তে তারতিলের সাথে পড়ে, এজন্য চেষ্টা করব। সম্ভব না হলে আমিই দূরে কোথাও চলে যাব, যেখানে সুন্দরভাবে তেলাওয়াত হয়। আপনি মসজিদের দায়িত্বশীল হলে তারাবির ইমাম ঠিক করাও দরকার।
অনেক ব্যবসায়ী ভাই খতম মসজিদে যেতে পারেন না, তারা মার্কেটে বা কোনো বাসাবাড়িতে তারাবি পড়েন এবং তারা ১০/১৫ দিনে খতম করে বাকি দিন সূরা তারাবি পড়েন। কারণ, রমজানের শেষদিকে প্রচণ্ড ব্যস্ততা থাকে তাদের।
.
০৬. সময় পরিকল্পনা

সময়ের সঠিক পরিকল্পনা না থাকলে সঠিকভাবে কিছুই করা যায় না। তাই রমজান শুরুর আগে আপনার সময়সূচি করুন, সময়ের পরিকল্পনা করুন। রুটিন করে টানিয়ে রাখুন। রমজান চলে আসার পর রুটিন করলে হবে না, এখনই রুটিন করতে হবে, পরিকল্পনা সাজাতে হবে।
প্রত্যেক মানুষের পেশা ও কর্মব্যস্ততা অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। কখন আপনি অফিসে যাবেন, দোকানে বসবেন, কখন বাসায় ফিরবেন, কখন তেলাওয়াত করবেন ইত্যাদি সব পরিকল্পনা করতে হবে। রুটিনের মধ্যে ঘুমানোর সময় কম রাখতে হবে। কারণ, এই মাস সারাবছরে মাত্র একবার আসে। এ মাসের প্রতিটি ইবাদতের সওয়াব অনেক বেশি; যে সওয়াব অন্য মাসে পাবেন না। পার্থিব কাজ যত কম করা যায় ততোই ভালো। তবে পরিবারের হক আদায়ের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।
.
০৭. তেলাওয়াত বিশুদ্ধ করার পরিকল্পনা

অনেকের তেলাওয়াত শুদ্ধ না। রমজান মাসে অনেকের সময় থাকে। খাওয়াদাওয়ার ঝামেলা থাকে না। নানান ব্যস্ততা কমিয়ে ফেলে। তাই যাদের তেলাওয়াত শুদ্ধ না, তারা তেলাওয়াত শুদ্ধ করার পরিকল্পনা করতে পারেন। বাসায় বা মসজিদে বা অন্য কোথাও। সবচেয়ে ভালো হয় নির্দিষ্ট একটা সময়ে কয়েকজন মিলে একজন উস্তাদের কাছে পড়েন। কুরআন নাযিলের মাসে কুরআন বিশুদ্ধ করার চেষ্টাও ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
.
০৮. অর্থ ও তরজমা পড়ার পরিকল্পনা

অনেকের তেলাওয়াত শুদ্ধ মাশাল্লাহ। তাদের চেষ্টা করা উচিত কুরআনের তরজমা ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা পড়ার। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় অনেক তরজমা ও তাফসির রয়েছে। তরজমা ও তাফসির বাছাইয়ের জন্য অবশ্যই নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। নিজে নিজে বাছাই করতে গেলে বিভ্রান্তির আশঙ্কা আছে। এক্ষেত্রে জেনারেল ভাইদের জন্য তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন বা তাওজিহুল কুরআন তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সহজ হবে। সময় ও আগ্রহ থাকলে তাফসিরে ইবনে কাসিরও দেখা যেতে পারে। আপনি কোন তরজমা বা তাফসির পড়বেন, এটা আগে থেকেই নির্ধারণ করা উচিত।
.
০৯. প্রতিদিন কাউকে ইফতার করানো

আগে আমরা বলেছি রমজানের আগেই নিজের সাধ্যমতো বাজারসদাই করে গরিব মানুষের বাড়িতে পৌছে দেওয়া। এটা তো অবশ্যই উত্তম। আরেকটা হচ্ছে আপনি ইফতারের সময় কোনো মেহমান বা কাউকে নিয়ে ইফতার করলেন। রোযাদারকে ইফতার করালে রোযাদারের সমপরিমাণ সওয়াব পাওয়া যায়। তাই অন্তত একজনকে হলেও সাথে নিয়ে ইফতার করব। আরও বেশি সামর্থ্য থাকলে আরও বেশি লোকজনকে ইফতার করানো উচিত। অথবা ইফতার বানিয়ে কারও বাসায় পাঠিয়ে দিলেন। অসহায়, গরিব, মুসাফির, আলেম, আত্মীয়স্বজন ও পড়শীদের মধ্য থেকে যে কাউকেই বেছে নেওয়া যেতে পারে। তবে মুত্তাকি ও দীনদারদের প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করবে।
.
১০. বাসায় মহিলাদের সহযোগিতা করা

রমজানে মহিলাদের রান্নাবান্নার ব্যস্ততা বেশি থাকে। তাদের সহযোগিতা করা উচিত। যেন অল্প সময়ে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করে তারাও ইবাদতে সময় দিতে পারে।
.
১১. রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ

রমজানের শেষ দশকে ইিতকাফ করার বিরাট ফজিলত রয়েছে। ইতিকাফে বসতে হলে এখন থেকেই আপনাকে সবকিছু গোছাতে হবে, পরিকল্পনা করতে হবে। নইলে ঝামেলায় পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিজ এলাকার মসজিদে ইতিকাফ করা উচিত। তবে নিজের শায়খ বা বুজুর্গ কোনো আলেমের সোহবত নেওয়ার জন্য দূরে ইতিকাফ করতে হলেও সমস্যা নেই। ইতিকাফ সম্পর্কে আমাদের মাঝে চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। ইতিকাফের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
.
১২. গোনাহ ও বদ অভ্যাস পরিত্যাগ করুন

ভাই! রমজান চলে আসছে, এখনও আপনি গোনাহে লিপ্ত?! আগে যা করেছেন তা তো করেছেনই। এখন রমজানের উসিলায় সেগুলো বন্ধ করুন। আগে সিগারেট খেতেন, এখন পরিত্যাগ করুন। নাটট-মুভি দেখতেন, তা ছেড়ে দিন। নিজেকে বুঝান যে, এটাই হতে পারে আমার জীবনের শেষ রমজান। গোনাহ ও বদ অভ্যাসগুলো রমজানের উসিলায় ছাড়তে পারলে দেখবেন সারাজীবনের জন্য ছাড়া হয়ে গেছে।
.
১৩. সুনির্দিষ্ট গোনাহ ছাড়ার পরিকল্পনা

আপনি এক/দুইটি সুনির্দিষ্ট গোনাহ ছাড়ার দৃঢ় সংকল্প করুন। যেমন আপনি দাড়ি কাটেন। এবার পরিকল্পনা করুন, আমি রমজান উপলক্ষে দাড়ি কাটা বন্ধ করব। এভাবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া হবে না।
.
১৪. পরিবারকে নিয়ে পরিকল্পনা করুন

আপনি নিজে রমজান কীভাবে কাটাবেন, এটার পরিকল্পনা ও রুটিন করলেন; কিন্তু আপনার পরিবারের লোকদের কোনো রুটিন নেই। এমনটা উচিত না। পরিবারের কর্তা হিসেবে আপনার দায়িত্ব সবাইকে দীনের পথে রাখা। আপনার ছেলেমেয়েদেরও রুটিন করে দিন। পরিকল্পনা দিন। সবাইকে একসাথে নিয়ে বসুন। বাচ্চাদের কাছ থেকে ওয়াদা নিন প্রতিদিন কে কতটুকু কুরআন পড়বে, কে কী আমল করবে? সবাইকে উদ্বুদ্ধ করুন, পুরস্কার ঘোষণা করুন। বাচ্চাদের অনেক আবদার থাকে, আপনি বলে দিন তুমি এ রমজানে এতবার কুরআন খতম করতে পারলে তোমাকে এটা দেবো। মোটকথা শুধু নিজের রুটিন ও পরিকল্পনা নয়; বরং পরিবারের সবার প্রতিই খেয়াল রাখা উচিত।
.
১৫. তওবা করুন

সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হচ্ছে অতীতের সকল গোনাহ হতে তাওবা করা। আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা করুন। কান্নাকাটি করে বলুন, হে আল্লাহ! এসব গোনাহ আর করব না। আমাকে সুন্দরভাবে একটি রমজান কাটানোর তাওফিক দান করো। আল্লাহ তাআলা তওবা কবুলের জন্য মুখিয়ে থাকেন। বান্দার তওবায় তিনি অত্যন্ত খুশি হন। তাই আসুন! রমজান আসার আগেই সকল গোনাহ হতে আমরা তওবা করি।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন