‘রমজান মাস; এ যেন আখেরাতের বৈশাখী!’ রামাদ্বান ০৩

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৬, এপ্রিল, ২০২১, শুক্রবার
‘রমজান মাস; এ যেন আখেরাতের বৈশাখী!’ রামাদ্বান ০৩

লেখিকাঃ আলেমা ক্বারিয়া জুলায়খা ইয়াছিন। কয়েকটি বিশেষ নেককাজঃ সর্বপ্রথম একটি বিশেষ অনুরোধ করে শুরু করছি- খেয়াল রাখবেন ; রমজানের দিনে ইফতার ইত্যাদি তৈরী করতে আমাদের বোনদের অনেক সময় কিন্তু নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে আসর আর মাগরিবের নামাজ। আসর অনেকের ছুটেই যায়! আর মাগরিব বেশি বিলম্ব হয়ে যায়। এমনকি আমার ছাত্রীদের প্রতিও আমি লক্ষ্য করে দেখেছি। যেদিন যার ইফতার ইত্যাদি তৈরী করার দায়িত্ব থাকতো সেদিন তারা আসর নামাজ আদায় করতে বিব্রতবোধ করতো। কিন্তু আমাদের নেগরানীর জন্য সেটা সম্ভব হতোনা। এমন কিছু পরিবারে দেখেছি মেয়েলোকেরা আসর নামাজ কাযা করে দেয়! বললাম এই জন্য যে, যদি এদের এমন হয়ে যায়। তাহলে বাসা-বাড়িতে আমাদের অন্য মা-বোনেদের কি অবস্থা হতে পারে, সেটা অনুমান করা যায়। এজন্য নামাজের ব্যাপারে গাফেল না থাকা চাই। এবং সবার প্রতি সজাগ এবং সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিৎ। গভীর ভাবে মনে থাকা চাই যে,রমজানের একটি ফরজ ইবাদত পালন, অন্য সময়ে সত্তরটির সমান।
আমরা যতটা সম্ভব বেশি নফল নামাজ তেলাওয়াত, একা একা দোয়া ইত্যাদিতে মসগুল থাকার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

রোজা কিভাবে রাখবো?
রোজাটা আমরা রাখার মতো করে রাখব।
দিনের বেলায় যখন পানির পিপাসা অনুভূত হবে, তখন মনে মনে আবেগের সঙ্গে বলবো- ‘ হে আল্লাহ এই কষ্ট শুধু মাত্র তোমাকে খুশি করার জন্য’।

আ’মাল কিভাবে করবো ;-
ঠিক রাতের বেলা আমরা কিয়ামুল লাইল করব। আল্লাহর রাসুল বলেছেন, তোমরা রাতের বেলা সালাত আদায় কর। এই সালাত কিয়ামতের ময়দানে তোমার জন্য শাফায়েত হিসেবে পেশ করা হবে আল্লাহর কাছে। এটা তখন আল্লাহর কাছে তোমার জন্য সুপারিশ করবে। এ জন্য কেয়ামুল লাইল পড়ব।

তারাবির সালাত পড়ব, তাহাজ্জুত পড়ব। ইফতার করব এবং ইফতারটাকে আমরা বিলম্বে করব না। কারণ ইফতার যদি সময়মত করি এর মধ্যেই কল্যাণ আছে রাসুল সা. বলেছেন, যতদিন আমার জাতি কল্যাণের পথে থাকবে ততদিন তারা সময়মত ইফতার করবে।
ইফতারে কী খেলাম না খেলাম তার দিকে তাকাব না। আল্লাহর রাসুল সা. খেজুর, পানি, দুধ দিয়ে ইফতার করেছেন। আমরা এখন খাবারের পেছনে ছুটছি। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে রমজান যেন খাবারের উৎসব। আসলে তা নয়। রমজান হলো ত্যাগের মাস। আপনি না খেয়ে আরেকজনকে খাওয়ান। এত বেশি খাওয়ার আমরা চিন্তা করব না।

এরপর আসে সাহরি। আল্লাহর রাসুল সা. বলেছেন, সাহরি খাও, এই সাহরির মধ্যেই তোমার জন্য বরকত রয়েছে। সুতরাং বরকত পেতে চাইলে সাহরি খেতে হবে। রাসুল সা. এরপর বলেছেন, ইফতারের পূর্বে দোয়া কবুল হয়। আমরা যখন ইফতার করব তখন আল্লাহর কাছে কায়োমনো বাক্যে দোয়া করব।
রাসুল সা. বলেছেন, রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দের সময়- একটি হলো ইফতারের সময়, অন্যটি হলো যখন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হবে। তাই ওই সময় আমরা বেশি বেশি আল্লাহর কাছে দোয়া করব।

আরেকটি হচ্ছে, মিথ্যা বর্জন করা। মিথ্যা কথা বললাম, রোজাও রাখলাম এ রোজা কোনো কাজে আসবে না। সমস্ত ধরনের পাপাচার থেকে জবানকে হেফাজত করব নিজেকে হেফাজত করব। ঝগড়া বিবাদ থেকে বেঁচে থাকব। আরেকজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করব। যদি ইফতার করাই তাহলে তিনি যে সওয়াব পাবেন রোজা রেখে সমপরিমাণ সওয়াব আল্লাহ আমাকেও দান করবেন।

এরপর বেশি বেশি করে কুরআন তেলাওয়াত করব। অনেক বড় বড় আছে যারা রমজানে সকল কাজ বাদ দিয়ে শুধু কুরআনের তেলওয়াত করেন। অধিক পরিমাণে দান সদকা করব। রাসুল সা.-এর দানের ব্যাপারে বলা হয়েছে বাতাস যেভাবে বয়ে যায় এতটা বেশি তিনি দান করতেন। তাই আমরা আমাদের দানের হাতকে বাড়িয়ে দেব।

রাসুল সা. মিসওয়াক করতেন। প্রতিদিন আমরা সে অভ্যাসটা চালু করব। রাসুল সা. বলেছেন, এই মিসওয়াক কতটা উপকারী যদি জানতে তাহলে আমরা উম্মতরা মিসওয়াক নিয়েই পড়ে থাকত। আমার উম্মতের জন্য যদি কঠিন না হতো তাহলে মিসওয়াককে ফরজ বলে আখ্যায়িত করতাম।

এরপর যদি আপনার সামর্থ্য থাকে তাহলে আপনি ওমরা করবেন। রাসুল সা. বলেছেন, আমার যে উম্মত রমজানে ওমরা করল সে যেন আমার সাথে হজ করল।

শেষ দশ দিন বেশি বেশি আমল করা। রাসুল সা. রমজানের রাতে ঘুমাতেন না। কিন্তু শেষ দশকে তিনি সবাইকে নিয়ে ইবাদত করতেন। এরপরের বিষয় হলো সময় থাকলে এতেকাফ করা। আপনি যদি ইতেকাফ করেন তাহলে কদর আপনার নসিব হবে। শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে ইবাদত করা। আমরা শেষ দিকে সাদাকাতুল ফিতর আদায় করব।

আরেকটি হচ্ছে পুরো রমজানজুড়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা এবং মুক্তির জন্য দোয়া করব। আরেকটি হচ্ছে নফল অর্থাৎ সাধারণ যে আমলগুলো আছে সেগুলো আমরা বাড়িয়ে দেব।

সর্বশেষ দুটি বিষয় হলো গোনাহ পরিত্যাগ করা ও তাকওয়া অর্জন করা। পবিত্র কুরআন শরীফে বলা হয়েছে, সিয়াম আল্লাহ তায়ালা ফরজ করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। তাকওয়াবান তাকেই বলে যে সব সময় চিন্তা করে যে আমি যা কিছু করছি আল্লাহ দেখতে পাচ্ছেন।

সর্বশেষ বলবো, আপনার অধীনস্ত যারা আছেন তাদের কাজটাকে হালকা করে দেওয়া। তাদের ওপর চাপিয়ে না দেওয়া, তাদের কষ্ট না দেওয়া। আপনি যেমন রোজা রেখেছেন আপনার অধীনস্ত লোকও রোজা রেখেছে। তাই তার কাজ যদি হালকা করে দেন তাহলে সওয়াব পাবেন।

কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যে কথাগুলো বললাম আমরা যেন তার অনুপাতে চলতে পারি তার তওফীক যেন আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেন। আমিন!

লেখিকা – আলেমা ক্বারিয়া জুলায়খা ইয়াছিন।
মুহাদ্দিসা – নাছিরপুর মহিলা টাইটেল মাদ্রাসা, দিরাই, সুনামগঞ্জ।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন