মাওলানা মামুনুল হকের উত্থানের কাঙ্খিত উপাখ্যান

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৯, এপ্রিল, ২০২১, সোমবার
মাওলানা মামুনুল হকের উত্থানের কাঙ্খিত উপাখ্যান

কলমেঃ সৈয়দ শামছুল হুদা।

কিছু মানুষ দুনিয়াতে ভাগ্যের বরপুত্র হিসেবেই জন্মগ্রহন করে। অনেক মানুষ জীবনভর শ্রম, মেধা, যোগ্যতার সর্বোচ্চ প্রয়োগ ঘটিয়েও যে জায়গায় যেতে পারে না, কিছু মানুষ ভাগ্যক্রমে সেই জায়গাটাই এমনিতেই পৌঁছে যায়। তার ওপর যদি তারা নিজেদেরকে আরো সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে তাদের ঠেকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য ব্যাপার। আল্লামা মামুনুল হক দা.বা. তেমনি একজন সৌভাগ্যের বরপুত্র। আল্লাহ তায়ালা তাকে এমন একটি পরিবারে জন্ম দিয়েছেন, যেই পরিবারটি বাংলাদেশের সমস্ত আলেমদের কাছে সম্মানের জায়গা। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজীজুল হক রহ. এমনই এক ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ যার তুলনা মেলা ভার। তাঁর ঔরসে জন্ম নিয়ে মামুনুল হক সাহেব এমনিতেই এক ডিগ্রী উপরে চলে গেছেন।

এরপর একে একে যোগ্যতার সবদিক দিয়ে চেষ্টা করে অর্জন করেছেন অনেকগুলো সফলতা। তিনি কুরআনের হাফেজ। শুধু তিনিই হাফেজ না, এ পরিবারের ছেলে-মেয়ে সকলেই হাফেজ। এরপর শেষ করেছেন কওমী মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রী দাওরায়ে হাদীস। পাশাপাশি জেনারেল ধারা থেকেও নিয়েছেন সর্বোচ্চ ডিগ্রী। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে এমএ করেছেন। এমফিল করছেন। এছাড়াও অনেক প্রশিক্ষণমূলক কোর্সে অংশগ্রহন করে নিজেকে একজন পরিশ্রমি মানুষ হিসেবে প্রমাণিত করেছেন। তিনি পরিবার এবং বাপের নামেই শুধু পরিচিত হতে পারতেন। তিনি সে পথে যাননি। নিজের প্রয়োজনে আরো বেশি কিছু অর্জন করেছেন।

তিনি একাধারে সংগঠক, যুব মজলিস গঠনের মাধ্যমে নিজের প্রতিভা বিকাশে এবং একটি কাঙ্খিত জনগোষ্ঠী নির্মাণ করতে কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। দেশে হাজার হাজার যুবমজলিসের সাহসী কর্মী তৈরি করেছেন, যারা তাঁর জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত। তাঁরই ধারাবাহিকতায় জামিয়াতুত তারবিয়্যাহ প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিয়েছেন।

তিনি একজন সম্পাদক। একটি মাসিক পত্রিকা নিয়মিত সম্পাদনা করেন। লেখালেখি করেন। অনেকগুলো বই তিনি ইতিমধ্যেই রচনা করেছেন। যুব মজলিসের কর্মীদের প্রশিক্ষিত করতে নিজেই অনেকগুলো বই লিখেছেন। কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তরুন ও যুবকদের কীভাবে গড়ে তুলতে হবে, তার নির্দেশনা এসব বইতে রয়েছে। তাঁর ক্ষুরধার লিখনী হাজারো কর্মীদের অনুপ্রেরণা যোগায়।

যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি সম্মুখ সারিতেই থাকেন। আল্লাহ প্রদত্ত আরো একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি যেখানে দাঁড়ান, মাশাআল্লাহ, উনাকে আর আলাদা করে চিনাতে হয় না। যেমনি লম্বা দেহের অধিকারী, তেমনি একটি বলিষ্ঠ কণ্ঠ তাকে এমনতেই পরিচিত করিয়ে দেয়। একজন রাজকীয় নেতার যেমন বডি হওয়া দরকার, মামুন সাহেব তেমনি একজন। তাঁর কথায় যেমন নমনীয়তা আছে, তেমনি আছে কঠোরতাও। অনেকবার তাঁর সাথে ঘরোয়া বৈঠকে কথা বলেছি, খুব কাছে থেকে দেখেছি, তাঁর সম্মোহনী শক্তি আমাদেরকে মোহিত করেছে। তাঁর প্রতি ভালোবাসাই তৈরি করেছে। অন্তরের গভীর থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাই তৈরি করেছে।

তিনি কারাগার থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানুষ নন। কারাগারে যাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর আছে। ১৩সালের হেফাজত আন্দোলনের পর তিনিও কারাগারে নীত হয়েছিলেন। আর কারাগার থেকে বের হয়ে প্রকাশ করেছিলেন, “আমি কারাগার থেকে বলছি” বই। তিনি বাতিলের সামনে যেমন হুঙ্কার দিয়ে উঠতে পারেন, তেমনি, বড়দের কাছে নতও হতে পারেন। তিনি আল্লামা কাসেমী রহ. এর দরবারে গিয়ে হুজুরের পায়ের কাছে জড়োসড়ো হয়ে বসতে দ্বিধা করেননি, আল্লামা বাবুনগরী দা.বা. এর সামনে নিজেকে একেবারে বিলিয়ে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। তিনি ২০২১এর ১৭এপ্রিল আবারও কারাগারে বন্দি হয়েছেন। এটা তাঁর জীবনকে আরো সুন্দরভাবে গড়তে সাহায্যই করবে।

মামুন সাহেব কেন হঠাৎ করেই এতটা আলোচনায় চলে আসলেন? এ প্রশ্নেই কিছু কথা বলতে হয়। বাংলাদেশের কওমী অঙ্গনে খুব কাছাকাছি সময়ে অনেক মুরুব্বির একসাথে বিদায় ঘটেছে। ২০২০সালকে কওমী অঙ্গনের জন্য আমুল হুজুন বলা যেতে পারে। অসংখ্য শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বি একসাথে বিদায় নিয়েছেন। সারা বাংলাদেশের বড় বড় মাদ্রাসার অনেক মুরুব্বি মনে হয় আমাদের প্রতি রাগ করেই একসাথে চলে গেছেন। ফলে ইসলামী ধারার রাজনীতিতে ব্যক্তিত্বের প্রকট সংকট দেখা দেয়। এ কারণে মাওলানা মামুন সাহেবকে একেবারে সামনের কাতারে চলে আসার সুযোগ করে দেয়। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আসতে তাকে বাধ্য করে।

এর সাথে এশিয়া মহাদেশে রাজনীতির ময়দানে অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো, পরিবারতান্ত্রিকতা। মাওলানা মামুনুল হক সাহেব নিজের যোগ্যতায় যেমন অগ্রগামী, তেমনি বাবার পরিচয়টাও তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয় খুব সহজেই। কওমীর তরুন প্রজন্ম তাকে বিনা দ্বিধায় গ্রহন করে নেয়। ফলে, তিনি যেখানেই যান, সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়তে শুরু করে মানুষ। আর বর্তমান সরকারের আমলে যেহেতু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত, রাজনীতি পুরোই নিয়ন্ত্রিত সেই সময়ে তিনি মাহফিলগুলোতে খুব বলিষ্ঠকণ্ঠে কথা বলতে বলতে মানুষের হৃদয় জয় করে নিতে সক্ষম হন। এসব কারণে হিংসে কাতর কিছু মানুষ তাকে সাউন্ড গ্রেনেড বলতে খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

মামুনুল হকের সাহস, তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং কাছাকাছি সময়ে বড় বড় মুরুব্বিদের বিদায়ে মাওলানা মামুনুল হককে খুব বেশি অসময়ে একেবারে লাইম লাইটে আসার সুযোগ করে দেয়। ফলে বাঙ্গালীর সেই পূরণো প্রবাদ, অন্যতম পরিচিত শব্দ, পরশ্রীকাতরতার শিকার হতে থাকেন মাওলানা মামুনুল হক। তাঁর উত্থানকে অনেকেই ভীতির চোখে দেখতে শুরু করেন। কী ইসলামী অঙ্গন, কী সরকারি মহল, কী বামপাড়ার নাস্তিক-মুরতাদ মহল। সবজায়গাতেই তাকে নিয়ে তৈরি হয় আলোচনার নতুন ক্ষেত্র।

আলোচনার এই লাইম-লাইটে আসার কারণেই মাওলানা মামুনুল হক সাহেবকে নিয়ে জনতার মধ্যে যে আগ্রহ, যে আবেগ সৃষ্টি হয়, সেটার সাথে সমন্বয় সাধন করে কুলিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি পড়ে গেছেন খ্যাতির বিড়ম্বনায়। আর সেই গনচাহিদার প্রেক্ষাপট থেকেই তিনি নিজ থেকে বলেন, আমিতো আসলে নেতা হতে চাইনি, অর্থাৎ জনগণ যেই জায়গাটায় মামুন সাহেবকে দেখতে আগ্রহী সেই জায়গায় এত দ্রুত তিনি যেতে এখনো প্রস্তুত হননি। কিন্তু পরিস্থিতি, মিডিয়া, মাঠের শুন্যতা বয়সের তুলনায় তাকে অনেক বেশি উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। তিনি এর ভারসাম্য রক্ষা করতে পারেননি বলেই বড় ধরণের হোচট খেয়েছেন। তাঁর প্রতি চাহিদার পারদ এত বেশি যে, এখন আর তার পক্ষে রাস্তার ধার থেকে এক প্যাকেট বাদাম কিনে খাওয়ার আর কোন সুযোগ নেই। উনি সেটা বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি সরলমনে নিজের পকেটের টাকা দিয়ে রাস্তার ধার থেকে বাদাম কিনতে খেতে গিয়েছেন। আর তখনিই বিপর্যয়টা দেখা দিয়েছে।

মামুন সাহেব নিজে না চাইলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে মামুন সাহেবকে গণ মানুষের নেতা হিসেবে দেখতে চাই। আর তাই তিনি যখন বলেন, আমাদের জাতীয় মিডিয়ার দরকার নেই, আমাদের সাড়ে তিন লক্ষ মসজিদ আছে, তখন কষ্ট পেয়েছি। গ্রেফতারের সময়ে কিন্তু উনার চতুর্পাশে জাতীয় মিডিয়াই ছিল, এখানে কোন ইমাম থাকার সুযোগ হয়নি। সুতরাং উনাকে জাতীয় মিডিয়ার মধ্যেই বন্ধু খুঁজে বের করতে হবে। উনাকে প্রচন্ড শত্রুর ভিতর থেকেই বন্ধু খুঁজে নিতে হবে।

জাতীয় রাজনীতি থেকে যতই তিনি দূরে থাকতে চান, তাকে জাতীয় রাজনীতিতেই হাল ধরতে হবে। নতুবা তাকে শুনতে হবে, “কই বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস? তার দলের মহাসচি গ্রেফতার, অথচ তাদের কোন খোঁজই নেই।” কই এখন হেফাজতে ইসলাম, যার দলের ঢাকা মহানগরীর মহাসচিব গ্রেফতার, অথচ তাদের কোন খবরই নেই।”

সুতরাং হে প্রিয় মামুন ভাই, আপনাকে গণ মানুষের নেতাই হতে হবে। বিশেষ কোন গোষ্ঠীর নেতা না। আপনাকে গোটা দেশের মানুষ ভালোবাসতে শুরু করেছে। মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগিশ, মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা আকরম খাঁ প্রমুখ যে জায়গাটায় থেকে রাজনীতি করেছেন, আপনাকে সেই জায়গাটায় দেখতে চাই। আপনি শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা, আর মাহফিলের সীমিত পরিসরে থাকতে পারেন না। আপনাকে দেখতে চাই জাতীয় সংসদে, আপনাকে দেখতে চাই, সব রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত সভায়। আপনাকে দেখতে চাই, জাতিসংঘে, আপনাকে দেখতে চাই বিশ্বরাজনীতির নতুন অতিথি হিসেবে।

আজ আপনি জেলে বন্দি, আপনি রাজনীতির পাঠটা ভালো করে রপ্ত করুন। বঙ্গবন্ধুর মতো আপনিও গণমানুষের নেতা হবেন, জেলখানায় জেলিরা আপনার ব্যবহারে পাগলপারা হয়ে যাবে সেই জায়গায় দেখতে চাই। আপনি সকল ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে, নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করে সামনের দিনে আরো সুন্দরভাবে নেতৃত্ব দিবেন সেই আশাকরি। সেই স্বপ্ন দেখি।

আজ উলামাদের ওপরে যে রাষ্ট্রীয় ঝড় নেমে এসেছে তাকে কীভাবে এখনই থামাতে হয়, সেই চিন্তাও জেলখানায় বসে করবেন আশাকরি। যদিও আমার এই লেখা পড়ার সুযোগ আপনার এখন নাই, তদুপরি, আশাকরি কোন না কোনভাবে আপনার মন পর্যন্ত আমার এই আবদার চলে যাবে। আপনি আবার ফিরে আসবেন বীরের বেশে। সকল প্রকার ভুল-ভ্রান্তির যবনিকাপাত করে। জেলখানায় থেকেও আপনি সকল সাথীদের সাহস যোগাবেন। দেশবাসিকে শান্তনার বার্তা শোনাবেন।

আপনার বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি । জীবনে এমন অসংখ্য আরো ঘাত-প্রতিঘাত আসতেই থাকবে। আপনি যত উপরে উঠতে চাইবেন, ততই পরশ্রীকাতরদের হিংসা বাড়তে থাকবে। আ্ক্রোশ বাড়তে থাকবে। এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে আশাকরি অনেক বড় জায়গায় আপনাকে দেথতে পাবো।
আপনি আবার বীরের বেশে আমাদের মাঝে ফিরে আসুন সেই কামনায়।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন