জোশের সাথে হুঁশ বজায় রাখি

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৯, এপ্রিল, ২০২১, সোমবার
<strong>জোশের সাথে হুঁশ বজায় রাখি</strong>

ওয়ালী উল্লাহ আরমানঃ মামলায় নাম থাকাটা আনন্দের বিষয় নয়। গ্রেফতারের পর কোমরে রশি আর হাতে হাতকড়া পরে পুলিশ ভ্যান, থানা হাজত আর জেলখানার সময়গুলো ‘চলো যুদ্ধে যাই’ টাইপের কোনো রোমান্টিকতা নয়। যার আর্থিক সংগতি ও পারিবারিক ব্যাকআপ আছে, যোগাযাগ ও তদবিরের স্থান রয়েছে, তারা আইনি পথে ছুটতে পারেন। যারা সবদিকেই দুর্বল, তারা জানেন মামলা আর কারাবন্দিত্ব কতোটা যাতনাদায়ক, বিভীষিকাময়। তাও যদি হয় করোনার কারণে একবছর যাবত আর্থিক দৈন্যে ভোগা ওলামা, তোলাবা বা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের, তাহলে তো কথাই নেই।

ফেইসবুকে দেখলাম গতরাতে গাজীপুরে এক পরিবারের চারজন আলেম ভাইকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এই ঘটনা শহরে হবার কারণে তাও আমাদের চোখে পড়েছে। কিন্তু মফস্বল আর তৃণমূলের অবস্থা শোচনীয়। সিলেটের সবচেয়ে আলেম অধ্যুষিত ও প্রভাবিত জৈন্তাপুরে গতকালের স্লোগান শুনে আমার নিকট বর্তমান প্রতিকূল সময়ের বাস্তবতা আরো ভালোভাবে ফুটে উঠেছে।
ব্যক্তিগত ঝামেলায় পরিবার ভোগে, আর সংঘবদ্ধ ঝামেলায় গোটা আলেম সমাজ, মসজিদ, মাদরাসাকে জের টানতে হয়। অসংখ্য ‘সংগ্রামী’ চেতনা লালনকারী ফেইসবুকারকে চিনি, কিছুদিন যাবত যাদের আওয়াজ একদম বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ তার বাড়ি, কিংবা বাবার মসজিদ-মাদরাসায় পুলিশ গিয়েছিলো। নেতৃস্থানীয়দের সাথে প্রশাসনের ব্যবহার আর সাধারণের প্রতি আচরণে বিশাল ফারাক রয়েছে। কারণ নেতাদের ওপর ক্যামেরার ফোকাস আর মানুষের সতর্ক দৃষ্টি থাকে। যা সাধারণের জন্য থাকে না।

একাধিক মাদরাসার কথা বলতে পারি, যেখানে বিশেষ স্থান থেকে ফোন দিয়ে অযথাই জানতে চায়- ‘আপনাদের ওখানে নাকি হেফাজতের মিটিং হচ্ছে?’ এটা তাদের প্রেশার ক্রিয়েটে রুটিন ওয়ার্ক। কিন্তু ছোট/মাঝারি মাদরাসাওয়ালাদের ওপর এর প্রভাব পড়ে ব্যাপক। আপনি দেশের কেন্দ্রে বসে এটা উপলব্ধি করতে পারবেন না।

প্রশাসনকে গালি দেবার আগে নিজেদের কর্মকাণ্ড চিন্তা করা দরকার। প্রশাসনকে আপনি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ দিলে সে নিবে না? আমরা‌ বলবো- ‘আওয়ামী লীগ ১০০/২০০ বছর ক্ষমতায় থাকলেও আমাদের আপত্তি নেই!’ আমরা বলবো- ‘হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। কাউকে ক্ষমতা থেকে নামানো বা ওঠানো আমাদের কাজ নয়!’ কিন্তু কার্যক্রম হবে রাজনৈতিক। তৎপরতায় সরকার ফেলে দেবার ছাপ ফুটে উঠবে। তাহলে সরকার আমাদেরকে প্রতিপক্ষ জ্ঞান করবে না?
আপনি বলবেন- ‘প্রতিবাদ করা, দাবি আদায়ের আওয়াজ তোলা আমার নাগরিক অধিকার।’ বাঁশখালীর ঘটনায় দেশের বিবেক বলে পরিচিত সাংবাদিকদের মুখেও কোনো রা নেই দেখেও কিছু ‘…….না বুঝলে তেজপাতা।’

দেশের সবচেয়ে সংঘবদ্ধ ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠনটি ২০১৫ সাল থেকে মাঠে ময়দানে প্রতিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন ছেড়ে ঘরোয়া দাওয়াতি কাজে মনোনিবেশ করেছে। তাদের কথা হলো- ‘জনগণের জন্য আমাদের তৎপরতা। তারাই যদি এতে শামিল না হয়, তাহলে আমাদের শক্তিক্ষয় অনেকটা আত্মঘাতী।’ তারা তাদের নীতিনির্ধারণ থেকে সবসময় কেবল আন্দোলন করতে চায় এমন নেতাদের নিষ্ক্রিয় করে আপাতত শক্তি ধরে রাখতে গঠনমূলক কাজে মনযোগ দিয়েছে। তাদের নৈতিক মনোবল উঁচু মার্গের। সাংগঠনিক সংহতি দুর্দান্ত। আর্থিক সংগতি ঈর্ষণীয়। আহত বা অসুস্থদের চিকিৎসায় একাধিক মানসম্পন্ন হাসপাতাল ও মেডিকেল আছে। কেউ আইনি ঝামেলায় পড়লে তার পক্ষে যেকোনো আদালতে দাঁড়ানোর মতো যোগ্য আইনজীবী রয়েছে। মুক্ত জীবনে না ফেরা পর্যন্ত সন্তানের লেখাপড়া এবং পরিবারের খরচ যোগানোর সাংগঠনিক উদ্যোগ রয়েছে। এরপরেও তারা ঘর গোছানোর কাজে মনোনিবেশ করেছে। অথচ আমরা নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করে শক্তির অবশিষ্টটুকু নিঃশেষ করলাম রাজনৈতিক দাবিতে।

যদি বলেন, ‘মোদী বিরোধী আন্দোলনে আমাদেরকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়েছে,’ তাহলে তো এটা আরো শক্তভাবে প্রমাণ হয় যে, আমাদের নেতৃত্বে দুর্বলতা আছে। কারণ নেতারা আবেগের চেয়ে বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিবেন। অবশ্যই আমাদেরকে দ্বীনের কথা বলতে হবে। প্রতিবাদ প্রতিরোধের সাথে সাথে সংগ্রামী চেতনাও থাকতে হবে। আবার সময়টাও বুঝতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা সামনে রেখে এমন কথা না বলা, এমন সিদ্ধান্ত না দেওয়া, যা হঠকারি ও আত্মঘাতী হয়। যারা এমন করে, এ ধরনের অদূরদর্শী নেতৃত্ব থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাই।

জনগণের সেবক দাবিদার কর্তাব্যক্তিদেরও বুঝা উচিত যে, আলেম-ওলামারা মানুষের নৈতিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধির জন্য কাজ করেন। দ্বীনের পথে হক কথা বলা তাদের দায়িত্ব। ২৬-২৮ মার্চ দেশে কী হয়েছে, এর নেপথ্যে কারা ছিল, সরকার তা ভালোভাবেই জানে। কিন্তু আলেমদের অদূরদর্শিতায় সায়েস্তা করার সুযোগ পেয়ে আক্রোশের সবটুকু মিটিয়ে আইন প্রয়োগের সময় আল্লাহর বিচারের ভয় করা উচিত। আজ সামান্য জাগতিক ক্ষমতায় নিরীহ মানুষের ওপর বাড়াবাড়ির আগে অসীম ক্ষমতার অধিকারী সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় করা উচিত। মজলুমের বদদোয়া বিনা বাঁধায় আল্লাহর আরশে পৌঁছে যায়।

যারা পবিত্র মাহে রমজানে গ্রেফতার হয়েছেন তাদের নিরাপত্তা, সুস্থতা ও মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করি এবং আইনি মোকাবেলাও হোক।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন