ফ্যান পাওয়ার’ বদলে দিলো ফুটবলের প্রকৃতি

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২১, এপ্রিল, ২০২১, বুধবার
ফ্যান পাওয়ার’ বদলে দিলো ফুটবলের প্রকৃতি

ফুটবলে একটিও কিক না মেরেই শেষ হয়ে গেল একটি লিগ।

বহু বিতর্কিত ইউরোপিয়ান সুপার লিগের অকাল মৃত্যুকে এভাবেই ব্যাখ্যা করা চলে।

যে ১২টি ক্লাব নিজেদের মধ্যে একটি ফুটবল কার্টেল তৈরির চেষ্টা করেছিল, তা মুখ থুবড়ে পড়েছে ৪৭ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটের মধ্যে।

মঙ্গলবার রাতে যখন ‘বিগ সিক্স’ নামে পরিচিত ছ’টি ইংলিশ ক্লাব — আর্সেনাল, লিভারপুল, চেলসি, ম্যানচেস্টার সিটি, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আর টটেনেহাম হটস্পার — যখন একে একে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘোষণা করলো, তখনই বোঝা গিয়েছিল এই ইএসএল-এর মৃত্যু ঘণ্টা বেজে গেছে।

কিন্তু বিশ্ব সেরা ক্লাবগুলোর মধ্যে একটা নিয়মিত আয়োজনের এই উদ্যোগ কেন ভেস্তে গেল? ইএসএল-এর ধারণাটি কী ভুল ছিল?

“ইএসএল-এর কর্ণধাররা মোটেই টের পাননি যে ফ্যানরা, বিশেষভাবে ইংলিশ ফ্যানরা, এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন,” বলছেন ফুটবল বিশ্লেষক ফিল মিনসুল, “এসব ফ্যান নিজেদের ফুটবলের রক্ষক এবং ফুটবলিং ঐতিহ্যের ধারক-বাহক বলে মনে করেন।”

তিনি বলছেন, ফ্যানরা দেখলেন এই সুপার লিগ গঠনের মধ্য দিয়ে ফুটবলের ধারাবাহিকতা বিনষ্ট হবে এবং ছোট ছোট ক্লাবগুলোর সামনে আশাব্যঞ্জক কোন ভবিষ্যৎ থাকবে না।

ইএসএল-এর উদ্যোক্তাদের ভুলটা হয়েছিল এখানেই, বলছেন তিনি, তারা ভেবেছিলেন ছোট ছোট ক্লাবগুলো টাকার লোভে পড়বে এবং ইএসএল পক্ষে কথা বলবে।

ঐ প্রস্তাবে বলা হয়েছিল ইউরোপের এলিট ক্লাবগুলোকে নিয়ে একটি বিশেষ ফুটবল লিগ চালু করা হবে। উদ্দেশ্য: সেরা ক্লাবগুলির মধ্যে নিয়মিতভাবে ম্যাচের আয়োজন করা।

পনেরটি প্রতিষ্ঠাতা ক্লাব থাকবে ইএসএল-এর স্থায়ী সদস্য। বারোটি ক্লাবের নাম তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করা হয়, এবং বলা হয় আরও তিনটি ক্লাব এতে যোগ দেবে।

এর বাইরে প্রতি মৌসুমে আরও পাঁচটি টিম এই লিগে অংশ নেবে। তবে তাদের যোগ্যতা কীভাবে নির্ধারিত হবে তার বিস্তারিত জানা যায়নি।

আর এই প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মর্গান। শুধুমাত্র এই লিগের সদস্য হওয়ার সুবাদেই প্রতিষ্ঠাতা ক্লাবগুলো পাবে ৪২৫ মিলিয়ন ডলার। ২০২০ সালে চ্যাম্পিয়ান্স লিগ জিতেছিল যে দলটি, এটা তার আয়ের চারগুণ বেশি।

কিন্তু ইএসএল-এর উদ্যোক্তারা তাদের চিন্তাভাবনাগুলো গুছিয়ে ব্যাখ্যা করতে এবং স্টেকহোল্ডারদের আগে থেকে সময় নিয়ে এব্যাপারে প্রস্তুত করতে পারেননি বলে মনে করছেন ক্রীড়া ভাষ্যকার মিহির বোস।

“ফুটবল ফ্যানরা যে আমেরিকান এনএফএল কিংবা এনবিএর মতো একটা এক্সক্লুসিভ টুর্নামেন্ট ধাঁচের আয়োজন মেনে নেবে না সেটাও তারা বুঝতে পারেননি।”

ইউরোপীয় ফুটবলের মেরিট-ভিত্তিক পিরামিড ব্যবস্থার সাথে এটা সাংঘর্ষিক, বলছেন তিনি।

ফুটবলে আমেরিকান কায়দাকে ‘না’
সুপার লিগের উদ্যোক্তাদের মধ্যে যেসব ইংলিশ ক্লাব রয়েছে তার প্রধান তিনটি ক্লাব – আর্সেনাল, লিভারপুল এবং ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মালিক আমেরিকান। মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই মালিকদের হাতে নানা ধরনের আমেরিকান ক্লাব রয়েছে।

করোনাভাইরাস মহামারিতে প্রবল লোকসানের মুখোমুখি হয়ে তারা যে তাদের আয় বাড়াতে ইএসএল-এর মতো উদ্যোগে সমর্থন জানাবে তা স্বাভাবিক।

ফুটবল বিশ্লেষক ফিল মিনসুল মনে করছেন, ইএসএল-এর উদ্যোক্তাদের অঙ্কের হিসেবে আরেকটি বড় ভুল ছিল ইউয়েফার প্রতিক্রিয়া।

“এরা ভেবেছিলেন ইউয়েফার প্রতিক্রিয়া হবে খুবই নরম গোছের,” বলছেন তিনি, “কিন্তু ইউয়েফা ইএসএল-বিরুদ্ধে যেরকম কঠোর বক্তব্য দেবে এবং কঠোর শাস্তির হুমকি দেবে, তারা এতটা আশা করেনি।”

মাঠে নামলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী
বিতর্কটা যখন ফুটবল মাঠ ছাড়িয়ে বাইরে চলে যায় এবং রাজনীতিকরা তাতে যোগদান শুরু করে, তখন ইএসএল ভবিষ্যৎ আরো নড়বড়ে হয়ে পড়ে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন মঙ্গলবার ফুটবল এসোসিয়েশন, প্রিমিয়ার লিগ এবং ফ্যানক্লাবগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করেন।

এরপর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে যে বিবৃতি জারি করা হয় তাতে বলা হয় হাতে গোনা ক‌’জন ক্লাব মালিক যা করছে তাতে সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।

ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে এরকম সরাসরি হুমকি পুরো পরিস্থিতিকে পাল্টে দেয় বলে বলছেন মিহির বোস।

ইএসএল-এর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে জাতীয় দল থেকে প্লেয়ারদের বাদ দেয়া, বিদেশি প্লেয়ারদের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করার পাশাপাশি ক্লাবগুলোর জন্য কর মওকুফসহ নগদ অর্থের ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছিল।

“প্রশাসনের নানা ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়েই বড় ক্লাবগুলোকে চলতে হয়”, বলছেন তিনি, “সরকার চাইলে ক্লাব এবং প্লেয়ারদের জন্য নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।”

তবে মিহির বোস এবং ফিল মিনসুলের মতো বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইএসএল-এর স্বপ্ন আপাতত ভঙ্গ হলেও এটা মানুষের মন থেকে একেবারে দূর হয়ে যাবে না।

কারণ ইউয়েফা এবং ফিফার মতো প্রতিষ্ঠানগুলিতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলোর সুরাহা না করলে ইএসএল-এর দাবি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে।

মিহির বোস বলছেন, ইউয়েফা এবং ফিফা মূলত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এদের সমস্যা দূর করতে হলে সরকারকে ফুটবল জগতের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রক নিয়োগ করতে হবে।

ফুটবলের বিবর্তনের ধারাকে এই দুটি প্রতিষ্ঠান একেবারেই অস্বীকার করতে পারে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন