রাষ্ট্রশক্তির রুদ্ররোষের সামনে অসহায় হেফাজত

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৩০, এপ্রিল, ২০২১, শুক্রবার
<strong>রাষ্ট্রশক্তির রুদ্ররোষের সামনে অসহায় হেফাজত</strong>

সৈয়দ শামছুল হুদাঃ একটি রাষ্ট্রশক্তি কী পরিমান ক্ষমতা রাখে তার সাথে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এর নেতাকর্মীরা নতুন করে পরিচিত হলো। অনেক আলেমের এ সম্পর্কে হয়তো কোন ধারণাই ছিল না। যারা কোনদিন কল্পনা করেনি গ্রেফতার হবে, তারা আজ রিমান্ডের পর রিমান্ডে। যারা ইজ্জতের সাথে এতদিন দিন কাটাচ্ছিল, তাদের হাতে আজ হ্যান্ডকাপ। আজকে রাষ্ট্রশক্তি যদি চায়, গোটা হেফাজতকে শুধু জেলে কেন, বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিবে, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যেমনটা আমরা দেখেছি মায়ানমারের ক্ষেত্রে। সেখানে দেখেছি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে নাফ নদীতে কীভাবে ঠেলে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের সাথে কোন বিশেষ গোষ্ঠী টিকতে পারে না এটাই বাস্তবতা।

তবে কথা হলো নৈতিকতার প্রশ্নে। আজকে বাংলাদেশের কওমী অঙ্গনের অনেক আলেমের ওপরে যে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে তা স্বাধীনতার পরে এতদিন কল্পনা করা যায়নি। কল্পনার বাইরের বিষয়টিই এখন বাস্তব। এতজন শীর্ষস্থানীয় আলেম একসাথে কারাগারে যাওয়ার ঘটনা ইতিপুর্বে কখনোই ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। কঠোর এবং কঠিন এক বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশের আলেম সমাজ। রীতিমতো ঝড় বয়ে যাচ্ছে আলেম সমাজের ওপর দিয়ে। আল্লাহ তায়ালা উদ্ভুত পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক করে দিন। সকলের প্রতি ইহসান করুন।

এটার জন্য শুধু রাষ্ট্রই দায়ী আমি এ কথাও বলবো না, আমাদেরও কিছু দায় আছে।, আমাদেরও অসর্তকতা আছে বলে আমি মনে করি। বিশেষকরে বাংলাদেশের যারা বর্তমানের ওয়ায়েজ তাদের মধ্যে অনেক রাজনীতিবিদ আলেমও আছেন তাদের অনেকেই ভুলে গিয়েছিলেন যে, ওয়াজের ময়দানটা রাজনীতির মাঠ নয়। রাজনীতির ভাষা এবং ওয়াজের ময়দান দুটোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরণের মার্জিন টানা ছিল। সেটা আমরা অনেকেই অতিক্রম করে ফেলেছিলাম। এর জন্য একটি বিপর্যয় আসবে তার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি আসবে সেটা কখনো ভাবিনি। এতটা ভয়াবহভাবে আসবে সেটাও কল্পনা করিনি।

এক্ষেত্রে রাষ্ট্রশক্তি এতটাই কঠোর অবস্থানে চলে গেছে যা দেখে রীতিমতো আমরা শিউরে উঠছি। স্রোতের টানে এমন সব আলেমদেরকে আজ গ্রেফতার করা হয়েছে যাদের ব্যাপারে রাষ্ট্রবিরোধী কোন প্রকার বক্তব্য দেওয়া, হুঙ্কার দেওয়ার কোন অভিযোগ নেই। শুধুমাত্র হেফাজতের নতুন কমিটিতে আছেন এই অপরাধেই হয়তো উনাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ফরিদপুরের মাওলানা আবুল হোসাইন সাহেব এমনি একজন আমার পরিচিত বয়স্ক মানুষ, উনার অনেক ওয়াজ শুনেছি। কখনোই উনি রাজনৈতিক বিষয়ে মাহফিলে কথা বলেন বলে জানা নেই। তেমনি চট্টগ্রামের মাওলানা গোলাম রব্বানী ইসলামাবাদী একজন ভদ্র মানুষ। মাঝে মাঝে কিছু লেখালেখি করেন। কোন ধরণের রাজনীতির সাথে উনাদের সম্পৃক্ততা নেই বলেই জানি।

আজকে এটা প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, রাষ্ট্রশক্তির সামনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ সত্যিই অসহায়। খুবই দুর্বল। আর এটাও প্রমাণিত যে, হেফাজতের সাথে যারা আছেন, তাদের অধিকাংশই আর্থিকভাবে খুবই দুর্বল। পরনির্ভরশীল। এটা সরকার বুঝতে পেরে রাষ্ট্র প্রথমেই তাদের দুর্বলতার জায়গায় শক্ত আঘাত হেনেছে। অতঃপর এক এক করে সবাইকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাচ্ছে কোন প্রকার বাধা ছাড়াই।

রাষ্ট্রশক্তির কাছে বিনীতিভাবে অনুরোধ করবো, আলেমদেরকে এই পবিত্র মাসে একটু ছাড় দিবেন। আপনারা নিশ্চয়ই এটা বুঝতে পারছেন যে, বিভিন্ন মাহফিলে যে সকল বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, অথবা হেফাজতের ব্যানারে আয়োজিত বিভিন্ন সমাবেশে যে সকল বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, এগুলো স্রেফ মুখের বুলি ছাড়া আর কিছুই নয়। মাওলানা রফিকুল ইসলাম রিমান্ডে খুব সুন্দর করে সত্যি কথাটাই বলেছে। জোশের মধ্যে বলে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন।

অসংখ্য আলেমের পরিবারে আজ চরম দুর্দিন নেমে এসেছে। উনাদের অনেকেই আইন-আদালত সম্পর্কে অভিজ্ঞতা রাখেন না। এসব খরচ চালানোর কোন সামর্থ রাখেন না। সরকারের কাছে আরো একটি বিষয় পরিস্কার বলতে চাই, সেটা হলো, সামান্য কয়েকজন আলেমের হুঙ্কার ইত্যাদির কারণে যদি আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল বড় একটি অংশের ওপর জুলুম অব্যাহত থাকে, তাহলে সেটা হিতে বিপরীত হয়ে যেতে পারে। আলেমদের অধিকাংশই দুর্বল। কিন্তু কিছু আলেম আছেন যাদের মহান রবের সাথে সম্পর্কটা সবল। তাদের আহাজারি আপনাদের মসনদের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

আর আলেম সমাজের অতীত ইতিহাসটা যদি দেখা হয়, তাহলে দেখবো যে, জুলুম করে, শক্তি প্রয়োগ করে ভারত উপমহাদেশের আলেম সমাজকে দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। যদি তৃতীয় কোন শক্তিকে খুশি করার জন্য আলেমদের ওপরে সীমাহীন জুলুম নেমে আসে, সেটা সকলের জন্যই ক্ষতির কারণ হবে। তাই রাষ্ট্রশক্তি এবং আলেম সমাজের প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বর্তমানের সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যায় সে পথেই কল্যাণ। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বর্তমান সদস্য সচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম সাহেব সেই আহবানটাই রেখেছেন। আলোচনার মাধ্যমে সবকিছু সমাধানের আহবান জানিয়েছেন। আমি মনে করি, সেটা যথার্থ।

আর পবিত্র হাদীসের বাণী অনুসারে দুনিয়াটা আলেমদের জন্য কারাগারতুল্য, আর কাফেরদের জন্য স্বর্গতুল্য এটা পরিস্কার বার্তা দেয় যে, আলেমগণ এসব সাময়িক শাস্তিতে ভীত হবেন না। তাদের সামান্য ভুলের জন্য হয়তো এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটা কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ। আলেমগণ নবীর ওয়ারিশ। তারা সম্পদের পাহাড় গড়তে দুনিয়াতে আসেননি। আর্থিক দুর্বলতার ভিতর দিয়েই উনারা ওরাসাতুল আম্বিয়ার দায়িত্ব পালন করে যান। তাদের প্রতি সুন্দর আচরণ করার জন্য রাষ্ট্রের সকল স্তরের দায়িত্বশীলদের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

আল্লাহ তায়ালা দেশের আলেম সমাজকে বর্তমান এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠার তৌফিক দান করুন। যে সকল পরিবারে বিপদ নেমে এসেছে তাদেরকে সবরে জামিল ইখতিয়ার করার তৌফিক দান করুন। আসুন, আমরা সকলে আমাদের ভাইদের জন্য প্রাণখুলে এই মাহে রমযানে দুআ করি। আল্লাহ তায়ালা আমাদের ভাইদের জেলখানার ভিতরেও ঈমান ও গায়রতের সাথে থাকার তৌফিক দান করুন।

30.04.2021

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন