ঠগীতন্ত্রের হোয়াইট টাইগারদের নারী শিকারের পার্শ্বগল্প

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৩০, এপ্রিল, ২০২১, শুক্রবার
<strong>ঠগীতন্ত্রের হোয়াইট টাইগারদের নারী শিকারের পার্শ্বগল্প</strong>

বাংলাদেশের বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে যৌন প্রতারণা ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ ওঠায় চমকে গেছেন অনেকে। বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর উত্থানের মহাকাব্যে এ তো এক নোকতা সাইডস্টোরি। কিন্তু আসল কাহিনী নারীক্রয় নয়, আসল কাহিনী সম্পদহরণ। দেশের ও মানুষের সম্পদহরণ এবং বিপদের সময় পলায়নই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়া পুঁজিপতি ‘হোয়াইট টাইগার’দের ইতিহাস। ভারতীয় লেখক অরবিন্দ আদিগার বিখ্যাত উপন্যাস হোয়াইট টাইগার নিয়ে নেটফ্লিক্স যে রূদ্ধশ্বাস সিনেমা বানিয়েছে, তা অনেক ধনকুবেরের পারিবারিক সিলসিলা। গল্পটা এক দরিদ্র যুবকের। বড়লোকের প্রতারণায় তার জীবন ধ্বংস হয়ে যায় যায় অবস্থায় সেও শিখে ফেলে খেলার মাফিয়া নিয়ম। একদিন সেও নাম লেখায় কোটিপতি হোয়াইট টাইগারদের ক্লাবে। বহুল কথিত ‘এশিয়ার উদীয়মান ব্যাঘ্র’দের গল্পের এই অন্ধকার দিকটায় হঠাৎ হঠাৎ অপরাধের ঝলকানি পড়ে বটে, অন্যসময় সবই সাফ-সুতরা।

বাংলাদেশ এখন এরকম অজস্র হোয়াইট টাইগারদের অভয়ারণ্য। মাঝে মধ্যে এদের কারো কারো নোজ ডাইভ পতন হলেও, উদীয়মানদের উত্থান বন্ধ হয় না। বুদ্ধি, যোগাযোগ আর ক্রাইমের পথে একজনের হাতে বিপুল পুঁজি জড়ো হলে তিনি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হন। গোষ্ঠী বলতে মূলত পরিবার, ব্যক্তিমালিকানা আর রাষ্ট্রের আশ্রয়। এই তিনে মিলে তাঁরা হয়ে ওঠেন গ্রিক উপকথার টাইটান। গ্রিক পুরাণে মানুষ আর দেবতাদের মধ্যে স্থান ছিল টাইটানদের। টাইটানরা যে কোনো মানুষকে হত্যা করতে পারতেন। কেবল দেবরাজ জিউস বা বড় দেবতাদের দিকে চোখ তোলার ক্ষমতা ছাড়া আর সব কিছু তাদের জন্য জায়েজ। আইন যে স্তরে কাজ করে, তাঁদের মাথা বিরাজ করে তার অনেক ওপরে, ক্ষমতার মেঘলোকে। বাংলাদেশের হোয়াইট টাইগারেরাও উর্ধ্বলোকের জীব।

আমরা কেবল তাদের জমজমাট উত্থানের গল্পটাই দেখি, ব্যক্তিজীবন থাকে সাধারণের চোখের অনেক অনেক আড়ালে। কেবল কখনো তাঁদের কেউ ভুল সময়ে ভুল জায়গায় ভুল আচরণ করে ফেললে, জনতা হায় হায় করে ওঠে।

জেলাশহরে সুবাদারি আদালত বসিয়ে মৃত্যুদণ্ড, নির্যাতন, জ্যামে বিরক্ত হয়ে এক হুইপপুত্রের রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা, খুনের আসামির দায়মুক্তি, ঢাকার এক ব্যাংকের এমডিকে সিকদারদের ভাইদের গুলি ও অপহরণ, ফরিদপুরের ব্লাড ব্রাদারস রুবেল ও বরকেতের লুটপাট, হাজি সেলিমের পুত্রের ডেরায় টর্চার সেল, শেখ তন্ময় এমপির কার্গো জাহাজের ধাক্কায় লঞ্চডুবিতে গণমৃত্যু কিংবা বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি’র যৌনজীবনের সঙ্গে একটি মেয়ের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা সেরকমই হঠাৎ আলোর ঝলকানি। তাহলেও তাদের মূল কাজ কিন্তু নারী ভোগ, অপহরণ কিংবা রাস্তায় গুলিবাজি করা না। এসব করার জন্য অন্য লোক আছে। তাঁদের মূল কাজ জমি, নদী, বন, ব্যাংক দখল করা। সরকারি অনুমোদনের বলে দ্রুতসময়ে বিপুল মুনাফা হাসিল করা। রাষ্ট্রের যেসব মালিকপক্ষের মদদে তাঁরা ফুলে-ফেঁপে উঠছেন তাঁদের সঙ্গে লাভের অংক ভাগাভাগি করে নেওয়া। এদের ইতিহাস আইন, প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে মাথা তোলার ইতিহাস। দুর্নীতিতন্ত্র না বলে একে ঠগীতন্ত্রের ক্রিমিনাল অর্থনীতি বলাই সঠিক। ক্রিমিনাল অর্থনীতি ও মাফিয়া রাজনীতির বিবাহের সংসারের নামই ঠগীতন্ত্র। হোয়াইটা টাইগারদের মধ্যে যাঁরা ভিভিআইপি স্তুরে উঠে যান, তাঁরা ঠগীতন্ত্রের একেকজন যুবরাজ।

এই যুবরাজ টাইটানদের উত্থানের পথে রক্ত, অশ্রু, হত্যা, ধোঁকাবাজি ও অন্যায়ের সবটা কখনো জানা হয় না। কেবল কোনো ভুল বা অসাবধানতার বাতাসে পর্দাটা সরে গেলে, এক ঝলকে দেখা যায় ভেতরের রগরগে অনৈতিক ও অপরাধমূলক ছায়াছবি। অতি বড় আশাবাদী ছাড়া সকলেই জানেন, অচিরেই তাঁদের অপরাধগুলি থেকে আলো সরে যাবে। কিছুদিনের নীরবতা ও ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের পর তাঁরা আবার স্বমহিমায় হাজির হন। এ কাজে তাঁদের রয়েছে পোষা পত্রিকা ও চ্যানেল, বুদ্ধিজীবী ও মাওলানা, প্রশাসনযন্ত্রের প্রসারিত হাত। এমনকি ভূমিদখলের হিস্যা দিতে তাঁরা বিচারকদের জন্যও আবাসন প্রকল্প প্রস্তুত রাখেন।

যুবরাজদের ধনকুবের হওয়ার মূল গল্পের পার্শ্ব কাহিনীতে পাওয়া যায় নারীদের। মাফিয়া অর্থনীতি, ঠগবাজ রাজনীতির টাইগারদের টনিক হলো নারী। তাঁদের ব্যবসা ও যোগাযোগ মসৃণ রাখতেও নারীদের লাবণ্য ব্যবহৃত হয়। পুরুষের অনেক টাকা ও ক্ষমতা হলে নারীক্ষুধা বেড়ে যায়। সাধারণত দুই ধরনের নারীরা এই ঠগীতন্ত্রে জড়িত হন। পাপিয়াদের মতো নারীরা সাধারণত শিকারীর ভূমিকায় থাকেন। আর গুলশানের ফ্ল্যাটে যাঁর লাশ ঝুলে ছিল সেই মুনিয়ার মতো নারীরা হন শিকার। মাঝেমধ্যে কোনো হোয়াইট টাইগারের লেজে আগুন জ্বললেও অজস্র বাঘ-বাঘিনী ঠগীতন্ত্রের সেবা করে ধন্য হচ্ছেন। টিকটিকির লেজ যেমন খসে গেলে আবারও গজায়, তেমনি নতুন মুখেরাও মাফিয়াতন্ত্রের লেজের মতো গজাতে থাকে। রাজনীতির চেরাগে ঘষায় এরা পায় সব সম্ভবের জাদুকরী ক্ষমতার কৃপা।

সমাজে অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, ততই এঁদের মওকা মেলে। তাদের কায়কারবার অবাধ করার জন্য গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সংবিধান, আইনের শাসন, নিরপেক্ষ প্রশাসনিকতাকে চাপে-তাপে চাহিদামাফিক গলিয়ে নিতে হয়। পেছনে লাঠি আর সামনে মূলা ঝুলিয়ে বলা হয়, যে যেভাবে রাজি সেভাবেই রাজি অবস্থায় আসো। আসতে হবেই।

আগে বাংলাদেশ ছিল দুর্নীতিগ্রস্থ দেশ। কিন্তু এখনকার অবস্থাকে শুধু দুর্নীতি বললে চুরি আর ডাকাতির পার্থক্য থাকল কই? চোর চুরি করে কৌশলে, লুকিয়ে। লুকিয়ে করার কারণে সবটুকু কেড়ে নিতে তার অসুবিধা। কিন্তু ব্যাংক–বিমা, জায়গা–জমি, প্রতিষ্ঠান ও পদ দখল করতে হলে জায়গামতো বলপ্রয়োগ করতে হয়। আইন-প্রশাসন-সমাজকে ক্ষমতার জোরে বাঁকাতে হয়। বলপ্রয়োগের মিশেলের জন্যই দুর্নীতির চেয়ে এটা চরিত্রগতভাবে আলাদা। এই ঠগীতন্ত্র কেবল বাংলাদেশের ব্যাপার না। দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কটি দেশ এই পর্যায়ে ঢুকে পড়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ইউসিএল প্রেস থেকে ‘দ্য ওয়াইল্ড ইস্ট: ক্রিমিনাল পলিটিক্যাল ইকোনমিজ ইন সাউথ এশিয়া’ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলায় বললে, ‘বুনো পূর্ব: দক্ষিণ এশিয়ার অপরাধমূলক রাজনৈতিক অর্থনীতিগুলো’। উনিশ শতকের আমেরিকার বুনো পশ্চিমের মতো এটা হলো এশিয়ার বুনো পূর্ব।

ভঙ্গুর গণতন্ত্র ও দুর্বৃত্ত অর্থনীতি এই ধরনের ‘লিজেন্ড’, ‘গডফাদার’, ‘আম্মাজান’, ‘বড় ভাই’, ‘বস’, ‘দাবাং’, ‘হোয়াইট টাইগার’ চরিত্রের উর্বর বীজতলা। বসবাসের অযোগ্য, চরম বৈষম্যপূর্ণ, নোংরা ও অপরাধে ভরা নগরগুলোতে এরা গড়ে তোলে নিজস্ব স্বর্গ, বাহিনী আর রাজত্ব। গত এক দশকে যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর বাংলাদেশে ঘটেছে, তার অপরাধজগতের আলো-আঁধারিতে এঁদের বিচরণ।

এঁরা গতিশীল, খোলস বদলাতে ওস্তাদ। নেতা থেকে ব্যবসায়ী, মাফিয়া থেকে এমপি, লাভজনক সংস্থার পদাধিকারী থেকে বড় ব্যবসায়ী অথবা নেতা হওয়াই এঁদের আত্মজীবনী। এখন তো বিদেশ অবধি এঁদের দৌরাত্ম্য। সেটাই ‘সেকেন্ড অপশন’, সেটাই ‘সেকেন্ড হোম’। সম্প্রতি কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি এমপি পাপুল তো এঁদেরই বর্ধিত সংস্করণ। ক্রিমিনাল অর্থনীতিতে কয়েক বছরেই একেকজন হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যেতে পারেন। এঁরা দেখনেওয়ালা নন, এঁরা করনেওয়ালা। রাজনীতির শিল্পকে এঁরা মাফিয়াগিরির শিল্পে পরিণত করেন। এই রাজনীতি জনগণের ক্ষমতায়ন নয়, ঔপনিবেশিক কায়দার পাবলিক রিলেশন। জনতাকে বিভক্ত, ভীত এবং ধর্মমুখী করে বিদেশে ফরচুন বানাবার আবডাল হলো উদীয়মান শ্বেত ব্যাঘ্রদের রাজনীতি।

এঁদের অভিযাত্রা রোমাঞ্চকর, শ্বাসরুদ্ধকর ও ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ক্ষমতার বীজতলায় মাথা গজানো পাতি নেতারা স্বপ্ন দেখে শাহেদ কিংবা সম্রাট ভাইদের মতো হবে। একজন প্রতিষ্ঠিত মাফিয়ার নেতা, এমপি, শিল্পপতি, বিজনেস ম্যাগনেটে পরিণত হওয়ার শেষ ধাপটা খুব বিপজ্জনক। ক্যাসিনো সম্রাট, জি কে শামীম, খালেদ বা পাপিয়ার মতো আপনি শেষ ধাপে আটকে যেতে পারেন। এর মানে এই নয় যে ক্রিমিনাল অর্থনীতি খাবি খাচ্ছে। ক্ষমতার বীজতলায় অপেক্ষা করছে অনেক নতুন মুখ। প্রতিটি বিতর্কিত নির্বাচনী বসন্তে এঁদের সংখ্যা বাড়ে।

পিঁপড়া নিজের ওজনের চেয়ে আট গুণ বেশি ভারী জিনিস টানতে পারে। সাধারণ মানুষকে বহন করতে হয় বিপুল ওজনদার মাফিয়াদের লুণ্ঠনের ভার। আর বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও এলিট অংশটা নিজেকে বহনে অক্ষম বলে ভর করেন ঠগীতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতার ওপরে। দেশটাও আরও এগিয়ে যায় দুর্নীতির ডোবা থেকে ঠগীতন্ত্রের খাদের দিকে।

এই বাস্তবতায় হোয়াইট টাইগার কিংবা তাদের ওপরঅলাদের অপরাধের বিচারের আশা করা চরম অবাস্তব। মৃত্যুর পরও এমপি আসলামুল হকের নদীদখল করে বানানো প্ল্যান্ট সরানো যায়নি। হাজার হাজার একর জমি, লাখো কোটি বেহাত টাকা, কিংবা একচেটিয়া ব্যবসার কাফফারা কে আদায় করবে? তারাই রাষ্ট্র, তারাই সিস্টেম, তারাই মালিক। তাঁদের সাময়িক অসুবিধা দেখে হয়তো অবদমিত জনগণের ‘মালয় দ্বীপের শেয়ালে, মুরগী এঁকে দেয়ালে’ টাইপের আমোদ হয়। কিন্তু টাইটানরা ‘আনটাচেবল’। মানুষ কখনো তাদের স্পর্শ করতে পারে না। এই খেলাই চলবে হরদম হরদম হরদম, যতদিন না নতুন কোনো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থে শাসনের নতুন নিয়ম কায়েম করে। কোনো সন্দেহ নাই, সেটা হবে বিরাট রক্তক্ষয়ী ঘটনা।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন