বর্তমান কওমী মাদ্রাসা ও মূলধারা প্রসঙ্গ ___ড. সলিমুল্লাহ খানের সাক্ষাতকার

বিজয় বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২, মে, ২০২১, রবিবার
<strong>বর্তমান কওমী মাদ্রাসা ও মূলধারা প্রসঙ্গ ___ড. সলিমুল্লাহ খানের সাক্ষাতকার</strong>

নবনিতাঃ কওমী শিক্ষার্থীদেরকে মূলধারার শিক্ষার্থী মনে করা হবে কী না? এবং এদেরকে মুলধারায় আনার ব্যবস্থা কি?

ড. সলিমুল্লাহ খান: কিছুদিন আগে কোন একটা বইতে আমি পড়েছিলাম, “কোন জাতির ভবিষ্যত পরিকল্পনা করার সময় যারা অতীতকে হিসেবে নেয় না, তাদের পরিকল্পনা করার মতো কোন ভবিষ্যত নাও থাকতে পারে। ” আমি একটু অতীতের কথা বলি, বেশি দূর যাবো না, বাংলাদেশে যখন উইলিয়ান বেন্টিন বলে এক ভদ্রলোক ইংরেজদের গভর্ণর জেনারেল হয়েছিলেন। তিনি আপনারা জানেন যে বিখ্যাত প্রথা, সতিদাহ প্রথা যার হাত ধরে নিরুপন হয়েছিল। এটা হচ্ছে ১৮২৮-২৯ সনের কথা। তার কয়েক বছরের মধ্যে তিনি এক ভদ্রলোককে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তার নাম ছিল উইলিয়াম এডামস। তার সাথে রাজা রামমোহন এর খুব খাতির ছিল। রামমোহনের সকল সম্পত্তি তার নামে উইল করা হয়, মানে মারা গেলে তিনি সকল সম্পদ পাবেন। সেই ভদ্রলোক বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর একটি রিপোর্ট লিখেছিলেন। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ঐ মেকলের সময়ে। তিনি তিন খন্ডের একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছিলেন- বিহার, উড়িষ্যা, সমিত তথা তৎকালীন বাংলা তাতে তিনি দেড় লক্ষ প্রাইমারী স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা পেয়েছিলেন টোলসহ। এতগুলো প্রতিষ্ঠান তখন তিনি পেয়েছিলেন। বর্তমানেও বাংলাদেশে ৮০হাজারের বেশি প্রাইমারি স্কুল নেই। তাইলে এই যে এতগুলো প্রতিষ্ঠান ছিল, সেগুলো কীভাবে সম্ভব? তাহলে আমাদের মনে রাখতে হবে, এদেশে ইংরেজ আসার আগেও আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থাটা ছিল। গ্রামে পাটিগণিত, মাতৃভাষা এবং নিজ নিজ ধর্মীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়া হতো। হয় সংস্কৃত অথবা আরবি ভাষায়, সেটা শিখানো হতো। এটা হচ্ছে তৎকালীন মূলধারা। ইংরেজরা আসার পর যখন তারা স্কুল চালু করলো তখন আরেকটা মূলধারা তৈরি হলো। এমনকি ১৯৪৭সাল পর্যন্ত আমি যেই জায়গা থেকে এসেছি, প্রধানমন্ত্রী যেখানে “ডিজিটাল মহেশখালি” বলে একটা জায়গা উদ্বোধন করেছেন আমি হলো সেই রিমোর্ট আইল্যান্ডে জন্মেছি। আমাদের এখানে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কোন হাইস্কুল ছিল না। ক্লাশ এইট পর্যন্ত পড়া যেতো। এর নাম কি ছিল জানেন? বলা হতো মহেশখালি এমই স্কুল, এমই মানে মিডিল ইংলিশ স্কুল। এরপর সেটা মেট্রোকুলেশন স্কুল যেটা ১৯৪৬এর পর শুরু হলো। এত অগোছালো ছিল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের আধুনিক স্কুলকে বলাই হতো ইংলিশ মিডিল স্কুল। মিডিল শব্দটা পরে চলে গেছে। এখন বলা হয় মহেশখালি আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়। আমি কথাটা বলছি, মিডিল ইংলিশ স্কুল গুলোই বর্তমানে হয়েছে মেইনস্ট্রেইম স্কুল। আর দেশীয়গুলো হয়ে গেছে নন মেইনস্ট্রিম স্কুল। কিন্তু সেখান থেকে অনেক বড় বড় মনীষী বের হয়েছে। ভারতবর্ষের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় সন্দিপের মুজাফফর আহমদকে। তিনি কবি নজরুল ইসলাম থেকে ১০বছরের বড় এবং তার বন্ধু ছিলেন। তিনি কিন্তু মাদ্রাসার ছাত্র। এই যে কওমী যাদের বলা হচ্ছে তাদের ছাত্র। অধ্যাপক আবুল ফজল যিনি মানবতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত, তিনিও এই কওমী মাদ্রাসার ছাত্র। মক্তবে আমরা সবাই গেছি। মক্তবের অবদান সেটাতো অস্বীকার কোন সুযোগ নেই। সেখানে না বুঝে মুখস্থ করানো হয়। ছোটকালে আমরা আরবি পড়ছি, সেটার অর্থ না বুঝে।

কিন্তু এখন মেইনস্ট্রিম বলতে আমরা যেটা বুঝাচ্ছি, তারও আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন আছে। সেদিন কোন এক টেলিভিশনে আমি কথা বলছিলাম, এটা অনেকে না বুঝতে পেরে মিসকোড করে। অর্ধেকটা বুঝেই মন্তব্য করে বসে। ফলে কথা বলাটাই বিপদজনক হয়ে উঠেছে। আমি বলছি যে, বর্তমানে আমরা যেটাকে মূলধারা বলছি এটা প্রকৃত প্রস্তাবে উপনিবেশিক ধারা।

আমাদের প্রথম মূলধারা কি বঙ্গভবন? এটা উপনিবেশিক, আমরা আগে যেটাকে গভর্ণর জেনারেল ভাইসরয় বলতাম, সেটার নাম হয়েছে প্রেসিডেন্ট, আর গভর্ণর জেনারেল যেটাকে বলতাম, মানে সেই পদটার নাম হয়েছে প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ আগের দুটি পদকে আমরা দু জায়গায় ভাগ করে নিয়েছি। সেটা কি ভারতে, কি বাংলাদেশে, কি পাকিস্তানে, কি শ্রীলংকায়। বার্মাতেও তাই। আমরা উপনিবেশিক রাষ্ট্র কাটামো থেকে বের হইনি। সেইটাই হইছে মডার্ণ। অনেকেই বলে, কওমী মাদ্রাসা তথা দারুল উলূম দেওবন্দ সেদিন সৃষ্টি হয়েছে ১৮৬৬সালে, কথাটা আংশিক সত্য। কারণ এর আগেও তো মাদ্রাসা ছিল। আমি একটা উদাহরণ দিই আপনাকে, ইংরেজি ১৮২৮থেকে ১৮৪৮সাল পর্যন্ত এই ২০বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জমির চার ভাগ থেকে পাঁচভাগের একভাগ শতকরা ২০ভাগ ছিল এই মাদ্রাসার সম্পত্তি। লা খেরাজ সম্পত্তি। লা খেরাজ অর্থাৎ যাতে খাজনা দিতে হতো না। এগুলো বাংলার নবাবেরা দিয়েছেন। যারা স্বাধীন নবাব ছিলেন। এগুলো মোগল গভর্নররা দিয়েছেন এবং স্থানীয় জমিদাররা দিয়েছেন। এই জমিটা ইংরেজরা বাজেয়াপ্ত করে। ফলে মাদ্রাসাগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। সেইসময় ইংরেজিটা চালু হয়।

লক্ষ্য করুন, ১৮১৬সালে কলকাতায় যে মাদ্রাসা তৈরি হয় সেটার নাম হিন্দু কলেজ। মাদ্রাসা মানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বুঝাচ্ছি। সেইখানে নিয়ম ছিল, আপনি যদি প্রমাণ চান, রমেশ চন্দ্র মজুদমার ”ড্রিমসেস অব নাইনটিনস সেঞ্চুরি ব্যাঙ্গল” ১৯৬০এ বইটি বের হয়েছে, তাতে তিনি পরিস্কার লিখেছেন যে, “যে হিন্দু বলে কথিত নয়, সে ঐ কলেজে ভর্তি হতে পারবে না।” এই নিয়ম ১৮৫৩সাল পর্যন্ত চালু ছিল। উদাহরণ দিচ্ছি বিখ্যাত কবি, মাইকেল মদুসুদন যিনি ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন, রাজ নারায়ণের ছেলে। তিনি খ্রিষ্টান হয়েছিলেন বলে তিনি ঐ কলেজে পড়তে পারেননি। তাকে বিশপ কলেজে পড়তে হয়েছে হুগলিতে গিয়ে। এটাই ছিল নিয়ম। খ্রিষ্টানদের ভর্তি করাতে হচ্ছে বলে এরপর এটার নামকরণ করা হয় প্রেসিডেন্সি কলেজ।

আমি তাহলে বলি, মুসলমানরা তখনকার সময়ে ইংরেজি পড়তে চায়নি বলে একটা অপবাদ দেওয়া হয়, একথাটা সত্য নয়। কলিকাতায় ১৮৩০ এর দশকে দশহাজার মুসলমানের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি চিঠি গভর্ণর জেনারেলকে দিয়ে বলা হয় যে, আমরা ইংরেজি শিখতে চাই। আমাদের শিক্ষার ব্যবস্থা করুন। করা হয় নাই। করা হইছিল কখন? যখন ১৭৮০তে ওয়ারেন হেষ্টিংস কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসা তৈরি করেন। যেটার নাম আলিয়া মাদ্রাসা হয়েছে। এখন কওমী মাদ্রাসার লোকেরা ব্যঙ্গ করে ওদেরকে বলে : “তোমরা তো ওয়ারেন হেষ্টিংস এর মাদ্রাসার ছাত্র।” এবং আলিয়া মাদ্রাসার প্রিন্সিপ্যালরা বলছে ১৯৪৭পর্যন্ত প্রিন্সিপ্যাল ছিল ইংরেজ।

ওয়ারেন হেষ্টিংস এর মাদ্রাসা যখন তৈরি হয়েছে, তখন সকলের ধারণা টাকাটা কে দিয়েছে? নিশ্চয় বৃটিশের পক্ষ থেকে। তা কিন্তু সত্যি নয়। আমি বলি, ১৮১৩পর্যন্ত অর্থাৎ ঐ ঘটনার ৩৩বছর পর্যন্ত ইংরেজ সরকার ভারতের যে কোন প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি পয়সাও খরচ করেনি। প্রথম বরাদ্দ করে ১০হাজার পাউন্ড। অর্থাৎ এক লক্ষ টাকা। কখন? ১৮১৩তে। টোল শিক্ষার জন্য। ১৮২৩ আবার টাকা দেয়। সেটা আমি পড়ে বলবো। এখন ১৭৮০তে টাকাটা কোথায় পেয়েছিল? টাকাটা পেয়েছিল হাজী মুহাম্মদ মুহসিনের তহবিল থেকে। মহসিন কি করেছিলেন? তিনি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে এক কোটি টাকা/ রুপিস ধার দিয়েছিলেন। বছরে ৫টাকা সুদের হারে। তাহলে সুদ হতো বছরে ৫লাখ টাকা করে। এই টাকা থেকে শুধু কলিকাতা মাদ্রাসাই চলে নাই, দিল্লি কলেজ পর্যন্ত চলেছে। আমাদের বাংলাদেশে হেন কোন ভদ্রলোক নাই মুসলমান, হিন্দু সবাই যারা এই টাকা থেকে লাভবান হন নাই। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঐ টাকায় পড়াশোনা করেছেন এবং স্যার সৈয়দ আমীর আলি, স্যার আবদুর রহীম, আমি আরও লোকের নাম বলতে পারি, আমি আপনার সময় নষ্ট করবো না, এই হচ্ছে তৎকালীণ শিক্ষা ব্যবস্থা। সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটা পয়সাও খরচ করে নাই।

নবনিতা: মূলধারা বলতে আপনি বলছেন ঔপনিবেশিক শিক্ষাকেই আমরা মূলধারা বলছি। আমি যদি একটু পরিস্কার করে বলি, তাহলে বলতে পারি যে, বর্তমানে মুলধারা বলতে সাদামাটা কথায় যে ধারায় লেখাপড়া করলে সরকারি চাকুরি পাওয়া যায়। আরেকটু খুলে বললে বলা যায়, যে ধারায় লেখাপড়া করলে সমস্ত খরচ সরকার দেয় সেটাকেই মূলধারা বলা হতে পারে।

নবনিতাঃ এই ধারায় কওমীদের আনা উচিত কী না? জরুরী কী না? মূলধারার লোকদের আশঙ্কা যে, কওমী শিক্ষার সনদ এভাবে দেওয়া ঠিক আছে কী না বা কওমী শিক্ষা ব্যবস্থায় যে বিশ্বাসে তাদের বড় করে সেই বিশ্বাসটি মূলধারায় ঢুকে যাবে কী না? তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করার দ্বারা?
সলিমুল্লাহ খান : মুলধারা বলতে আমরা যেটাকে বৃটিশ সেদিন চালু করেছে, সেটাকেই বুঝাচ্ছি। কওমী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা বৃটিশের শিক্ষাটা গ্রহন করেনি। কারণ? আমরা মাত্র সেদিন স্বাধীনতা দাবি করা শুরু করেছি। মহাত্মা গান্ধি দেশে ফেরার পর অর্থাৎ ১৮১৮সালে তিনি যখন দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরলেন তখন তিনি অসহযোগ, খেলাফত আন্দোলন শুরু করলেন। তখনও পুর্ণ স্বাধীনতা দাবী করা শুরু হয়নি। তারও আগে ঐ কওমীদেরই এক হুজুর স্বাধীনতা দাবি করে বসেন। ঐ কওমী মাদ্রাসারই একজন মৌলুভি এ দাবিটা করেছিলেন। তার নাম মাওলানা হযরত মোহানী। আরো ছিলেন মাওলানা আজাদ সোবহানি। তিনি ছিলেন মাওলানা ভাসানির শিক্ষক। মাওলানা ভাসানি কিন্তু ঐ লাইনের লোক। আমার বক্তব্য হচ্ছে ভারত বর্ষে স্বাধীনতা সংগ্রামে এই যে ইংরেজি শিক্ষিত যারা আমরা, তাদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম বড় রাজনৈতিক সংগঠন ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। ভারতীয় জাতীয় মহাসভা যেটাকে বলা হতো। তারা কখনো স্বাধীনতা দাবি করেননি ১৯৩০এর আগে। এমন কি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ যেটা ঢাকাতে গঠিত হয়েছিল ১৯০৬সনের ডিসেম্বরের ৩০তারিখে। সেইটা কখনো স্বাধীনতা দাবি করেনি। তারা ইংরেজের অধীনে বড়জোর স্বায়ত্বশাসন দাবি করেছিলেন। এই মৌলুবিরা আগে দাবি করেছিলেন, ভালোর জন্য হোক, মন্দের জন্যই হোক। সমস্যাটা হচ্ছে, শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে ওরা শুধুমাত্র চাকুরী নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখেননি। হয়তো তারা ভুল করেছেন, কিন্তু তারা দেশের জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত ছিলেন। তারা ১৮৫৭এর বিদ্রোহের পরে দেওবন্দ তৈরি করেন। দেওবন্দের ২০বছর পরে কংগ্রেস তৈরি হয়। কংগ্রেসের ২০বছর পরে মুসলিম লীগ তৈরি হয়। মুসলিম লীগের প্রায় ১৫বছর পরে কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয়।

নবনিতা : সরকারি হস্তক্ষেপের বাইরে থাকা এই বিদ্রোহটা তাহলে তাদের পূরণো …
সলিমুল্লাহ খান: আমরা জানি, ভদ্রলোকরা জানি, মূলধারার লোকরা জানি, এটা বোকামি ছিল। কিন্তু সে বোকামির মধ্যে একটা জেদ ছিল। এটাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে। তারা একদিকে এটা ভুল করেছিলেন, অপরদিকে তারা এটা শুদ্ধও করেছিলেন। সভ্যতার সংকটে রবীন্দ্রনাথ কী লিখেছিলেন ১৯৪১এ? তিনি বলেছিলেন, জানি একদিন ইংরেজ এই ভারতবর্ষ ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে। পেছনে কিছু আবর্জনা তারা রেখে যাবে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, সেই আবর্জনাকে আবার আমরা গৃহে পরিণত করবো। প্রাসাদে পরিণত করবো।

আমি তাদের প্রতি সম্মান জানিয়েও বলি, তারপরও তারা যখন পাকিস্তান হলো, তখন মওলানারা দুভাগ হয়ে গেলেন। হোসাইন আহমদ মাদানী ছিলেন একপক্ষে। তিনি ১৯৩০ এ ইকবালের সাথে এ নিয়ে বিতর্কেও লিপ্ত হলেন যে, ভারতবর্ষ ভাগ করা যাবে না। উনি ভারত বিভাগ সমর্থন করেননি। উনিই আল্লামা আহমদ শফী’র গুরু। এখনো তারা ভারত বিভাগ সমর্থন করেন না। তারা পাকিস্তানকে বেদাত মনে করেছেন। এই জন্য তারা জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। তারপর তাদের মধ্যে আবার একদল তৈরি হয়ে গেলো, শিব্বির আহমদ উসমানী, উনারা আবার পাকিস্তান সমর্থন করলেন। পরবর্তীতে তাদেরই একটি অংশ পাকিস্তান তালেবান হয়েছে, জঙ্গি হয়েছে। আমি সে দিকে যাচ্ছি না।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ড. জাফর ভাইয়ের সাথে আমি সবিনয়ে একটু প্রতিবাদ করবো। ১৯৭১সালে স্বাধীনতার বিপক্ষে কওমিরা যতটা বিরোধিতা করেছে তারচেয়ে বেশি বিরোধিতা করেছে অন্য লাইনের লোকেরা। যেমন জামায়াত ইসলামীর নেতৃত্বে যে আলবদর বা আল শামস বাহিনী হয়েছে রাজাকারতো ছিলই, সেইগুলোতে যারা পার্টিসিপেট করেছে তারা কেউ কওমীর লোক নয়। কওমিরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন নাই, আবার বিরোধিতাও করেন নাই। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কয়জন বিরোধিতা করেছে পাকিস্তানের? ১৯৭১এর ২৫মার্চ ৪০দিন পার না হতেই ৫মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলেছে। আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরীর বইতে দেখেন, মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি, শতকরা ৭৫জন শিক্ষক তারা কাজে যোগ দিয়েছিল তাদের কলিগদের লাশের ওপর দিয়ে। তাদের টাকার দরকার ছিল। অধ্যাপক কবির চৌধুরীকে আমি অত্যন্ত বেশি সম্মান করি, কিন্তু কবির চৌধুরীর ভাই মনির চৌধুরী শহীদ হয়েছেন, আর তিনি ৯ মাসের যুদ্ধের সাড়ে ৮মাসই বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন।

নবনিতা: আমরা কি তাহলে কওমীকে হুমোজিনাস বা একগোত্রীয়ভাবে ভাবছি? রাজনৈতিক হেফাজতের মতো উচ্চবিলাসের দৃষ্টিতে ভাবছি কি না?
সলিমুল্লাহ খান : কওমী মাদ্রাসার লোকেরা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেন নাই, কিন্তু পক্ষেও কিছু করেন নাই। এই অবস্থাটা হচ্ছে পরাজয়ের লক্ষণ। কওমী মাদ্রাসার লোকেরা যখন তারা দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছিল তখন তারা বৃটিশ সরকারের সহযোগিতাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ যুদ্ধে অংশগ্রহন করতে না পারার যে বেদনা, যে গ্লানি, সেটা তাদেরকে অবজ্ঞেয় করে রেখেছে। এজন্য শিক্ষিত লোকেরা কিছুটা অবজ্ঞাপূর্ণ বিদ্রুপ মিশ্রিত হাসি তামাশার দৃষ্টিতে তাকায়।

আরেকটা কারণ, এখানে শ্রেণি কথাটাকে আনতে হবে। এদের অধিকাংশই গরীব শ্রেনি থেকে আসেন। কিন্তু গরীব শ্রেনি থেকে আসলে মানুষ অটোমেটিকেলি বিপ্লবি হয় না। তাদের ধ্যান ধারণা কোড আনকোড মধ্যযুগীয়। তাদের ধ্যান-ধারণা প্রতিক্রিয়াশীল। তাদের ধ্যান-ধারণা শুধু রক্ষণশীল নয় উল্টোমুখি। এই যে জাতীয় সংগীত গাওয়া ঠিক হবে কী না এগুলো পশ্চাদপদ চিন্তার উদাহরণ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তারা তো আমাদের স্বজন, এখন তাদেরকে কি স্বদেশী হিসেবে দেখবো নাকি শত্রু হিসেবে নিবো, তাকে কি বুঝাবেন নাকি অন্য ব্যবস্থা নিবেন?

আমি আপনাকে সক্রেটিস সম্পর্কে একটি বলতে চাই, সক্রেটিস যখন পিরাউস থেকে ফিরতে চাচ্ছিলেন তখন তাকে যারা জোর করে বাধা দিচ্ছিল। তখন তিনি তাদের বলছিলেন, আমি যদি আপনাদেরকে বুঝিয়ে বলি, তাহলে কি আমাকে যেতে দিবেন? তখন তারা বলেছিল, আমরা যদি আপনার কথা না শুনে কানে তোলা দিয়ে রাখি, তাহলে আপনি আমাদের বুঝাবেন কী করে? আমি আপনাদের সেই কথাটাই বলবো, আমাদের এখানে কথা বলতে শুরু করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কওমী মাদ্রাসার সনদকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, নাকি অন্য কোন উদ্দেশ্য দিয়েছেন সেটা বড় কথা নয়। এটা আগেও দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। খালেদা জিয়ার সময়েও দেওয়া হয়েছিল। কাজেই বিষয়টি অশ্রুতপুর্ব, অদৃশ্যপূর্ব অভূতপূর্ব নয়। সমস্যা হচ্ছে, এখন কেন দিলেন? সেই আলোচনায় যেতে আমি বেশি আগ্রহী নই।

এই স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে এই কারণে, ইংরেজিতে একটা কথা আছে, আপনি আইনের ছাত্রী, আপনি বুঝবেন, ডিফেক টু এন্ড ডি ইউরে. ডিফেক্ট তো আমাদের চেয়েও বেশি পড়ে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলছিলেন, ওরা কি পড়ায়? আমি বলছিলাম, আপনি কি পড়ান? এটা বলার কারণে তো আমাকে শত্রু মনে করা শুরু করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়ে এসেছি, মাদ্রাসায় পড়ি নাই, আমি জানি, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রীতে আমরা এখন অনেক ভুয়া ডিগ্রী দিই। এখানে ভালো ডিগ্রীর লোকও আছে। আপনিও বেরিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। আমিও বেরিয়েছি। আপনি ভালো ডিগ্রী। আমি ভুয়া ডিগ্রীওয়ালা। মানে আমি কিছুই না। ভুয়া মানে আমি এক অক্ষর লেটিন জানি না। কিন্তু আমি কি করে রোমান ’ল পাশ করলাম?

নবনিতা : আমরা মনে করি, তারা মধ্যযুগীয় অনেক ধ্যন-ধারণার মধ্যে তারা আছেন, তারা জাতীয় পতাকা তুলেন না, জাতীয় সংগীত গায় না, তাহলে তাদের এই বিষয়টাতো ভোটে প্রভাব ফেলার কথা। কিন্তু ভোটেতো এর কোন রিফলেকশন দেখি না। ২০০৮সনে তারা জাতীয় নির্বাচনে ভোট পেয়েছেন ৬.৮। আর ৪.৭ ভোট পেয়েছে জামায়াতে ইসলাম।
সলিমুল্লাহ খান : পাটিগণিতে আমি কখনো ভালো ছিলাম না। আমি বলি, হিসাব করবো না, আমরা বলবো, স্বাধীন হও। স্বাধীন যে হতে চায় না, তাকে জোর করেতো স্বাধীন করা যায় না। বিখ্যাত দার্শনিক রোশো বলেছেন, “ফোরস টু বি ফ্রি”, এ কথাটার মধ্যে স্ববিরোধ আছে। আমরা সবাই স্বাধীন হতে চাই, কিন্তু যে স্বাধীনতা চায় না? উদাহরণ দিই, এখন বলা হচ্ছে, সব ছেলে-মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে। কোন ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে সেটা মা-বাপ ঠিক করবে। এটা হচ্ছে আর্ন্তজাতিক মানবাধিকারের প্রশ্ন। সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণায় আছে। এখন দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, কেউ কেউ স্কুলে যেতে চায় না, ধরুন, আমাদের বিখ্যাততম কবি নজরুল ইসলাম তিনি স্কুলে যেতে পারেননি, তিনি .. বছর বয়সে যুদ্ধে চলে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্কুলে যাবেনই না। কিন্তু এদেরকেতো বাধ্য করা যাবে না। এখন আমরা যারা যেতে চাই, শুধু সুযোগের অভাবে যেতে পারছি না, হাওড়ে থাকি বলে অনেকে স্কুলে যেতে পারছে না। কিন্তু আমাদের ব্রাক কী করেছে? তারা একট দুর্দান্ত কাজ করেছে। তারা বাঘের মতো বললো, চার বছর পড়ালেই শিক্ষা হয়। এটার নাম নন ফরমাল শিক্ষা। উপআনুষ্ঠানিক শিক্ষা। এটা গরীবের জন্য জায়েজ, ধনীর জন্য না। এই যে দেশে চৌদ্দ রকমের প্রাথমিক শিক্ষা, এটা নিয়ে তো কেউ কোন কথা বলছে না। এবতেদায়ী থেকে নুরানী শিক্ষা, কিন্ডারগার্টেন শিক্ষা, তাহলে এখানে ভীতিটা কোথায়? আপনি গরীবের ছেলে বলে চার বছরেই আপনার নন ফরমাল শিক্ষাই যথেষ্ট হয়ে যাবে, আর আমার বার বছরেও শিক্ষা পূর্ণ হবে না এটা কেন? প্রাচীন ভারতে আমরা পড়েছি, “দ্বাদশ বর্ষ গুরুগৃহে থাকিয়া বিদ্যা অভ্যাস শেষে তিনি স্নাতক হইলেন।” প্রাচীন ভারত থেকেই এটা চলে আসছে। গুরুগৃহে থেকে তাকে সকল কাজ করতে হতো। লেখাপড়া শেষে নদীতে স্নান করে তাকে বিদায় জানানো হতো, সেই থেকে স্নাতক। মুসলমানরা মাথায় একটি পাগড়ি দিয়ে দিতো, ইউরোপিয়ানরা মাথায় একটি টাসল দিচ্ছে। এই যে, টাসল মাথায় দিয়ে একবার ডানে একবার বামে মাথা ঝুঁকায়, সব এসেছে ইসলাম থেকে। সবকিছু ইসলাম থেকে নকল করেছে ইউরোপ। এই যে আমাদের ডক্টর ডিগ্রী, মাষ্টার ডিগ্রী, ব্যাচেলর ডিগ্রী, সবগুলোই ইসলামী ডিগ্রীর অনুকরণ মাত্র। আগে বলা হতো, ফকীহ, মুফতি এবং মুদাররিস, ঐ তিনটাই ডক্টর, মাষ্টার, ব্যাচেলর হয়ে গেছে। এখন যেটাকে এসএসসি বলা হয় এটাকে একসময় বলা হতো, মেট্রোকুলেশন, ৬০এর দশকে বলা হতো এন্ট্রান্স, মাদ্রাসায় এটাকে বলে, দাখিল। আর দাখিল মানে প্রবেশিকা অর্থাৎ এন্ট্রান্স। মূলত: খুব একটা বিভেদ নেই।

তাহলে কথা হচ্ছে, এখানে কোথায় যেন একটা দূরত্ব আছে। সবাই বলছে, আমরা একমুখি শিক্ষা চাই। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু কিন্তু আছে। দূরত্ব আছে। আমি বলি, মাওসেতুং বলেছিলেন, “শতফুল ফুঠতে দাও”। শিক্ষার উদ্দেশ্য কি? সেটার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। হ্যাঁ, নিচের দিক সবাই একই রকম পড়বে। কারণ সব মানুষের বাচ্চাতো মানুষের বাচ্চাই। সাদা, কালো, হিন্দু, মুসলিম বলেতো কোন ভেদ নাই। মানুষ তার ভাষা শিখবে, মানুষ তার হিসাব করা শিখবে, জগতকে জানবে, দেশকে, পরিবেশকে ভালোবাসতে শিখবে।

*নবনিতাঃ মাদ্রাসায় যারা পড়ছেন, তারা বলছেন তারা আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য পড়ছেন, হাফেজ হওয়ার জন্য পড়ছেন, তাতে অসুবিধা কি? তাতে আমাদের নাক গলাতে হবে কেন?
সলিমুল্লাহ খান : এডাম স্মিথ বলে এক ভদ্রলোক বলেছিলেন, বেনিফিট অব ডিভিশন অব লেবার, লেখাপড়ায়ও বেনিফিট অব ডিভিশন অব লেবার আছে। সবাইতো ডাক্তার হতে পারবে না, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারবে না। আমরা কি বলি, সবাইকে বুয়েটে যেতে হবে? সবাই বুয়েটে যাইতেও হবে না, পারবেও না। কাজেই আমরা যেটাকে আরবিতে বলি ইলমে কালাম, অর্থাৎ ধর্মতত্বের জ্ঞান, সেটা উচ্চ পর্যায়ে গিয়ে পড়বে। নীচের দিক দিয়ে সবাইকে তার মাতৃভাষাটা জানতে হবে। মানুষের মনের ভাব আছে বলেই মানুষের ভাষা। আপনি কোন ভাষায় কথা বলবেন, সেটা দেশ ভেদে নির্ভর করবে। তাহলে আপনাকে যদি কুরআন শরীফ পড়তে হয়, তাহলে আরবি ভাষা জানতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত: সেটা আপনার মাতৃভাষা নয়। মাতৃভাষার ভিন্ন যে কোন ভাষা শিক্ষা করাটা বর্তমান যুগে আমি বলবো, অপরাধের শামিল। কিন্তু আমরা আমাদের তিন বছরের বাচ্চাকে কিন্ডারগার্টেনে পড়াচ্ছি।

কিন্ডারগার্টেন নিয়ে তো কোন কথা বলি না। সেখানে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছি। সেটাকে তো আপনি কখনো অপরাধ হিসেবে বলছেন না, বলার সাহস করছেন না। কিন্ডারগার্টের নিয়ে এখানে আলোচনা করবেন? এটাতো রাজকাহন, এটাতো মন্ত্রীকাহনে পরিণত হবে। আমি এই জন্যই বলবো, ন্যায় বিচার করতে হবে। আমাদের যেমন একমুখি শিক্ষা দরকার, তেমনি বৈচিত্রও দরকার।

নবনিতাঃ তাহলে কওমী শিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুললে, ইংরেজি শিক্ষা নিয়েও প্রশ্ন তুলতে হবে।
সলিমুল্লাহ খান : কিন্তু তারপরও আমি বলবো, আমরা কোথায় ট্যাক্স দিই, আপনি জানেন ইংরেজিতে একটা পচা কথা আছে, “দিয়ার ইজ নো সাচ থিঙ্কস এজ এ ফ্রি লাঞ্চ” বিলটা কাউকে না কাউকে দিতে হয়। বিনা পয়সায় দুপুরের খাবারটাও হয় না, এটা হয়তো আপনার করপোরেশন খাওয়ায়। বিলটা কাউকে না কাউকে শোধ করতে হয়। তাহলে লেখাপড়ার এই খরচটা কে দিবে? যেখানে আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে শিক্ষা দেওয়া হয় এটাই হচ্ছে মূলধারা। কিন্তু যারা এই কোষাগার থেকে কিছু নিতে চাচ্ছে না, তারাতো এদেশেরই বাতাস খায়, নিঃশ্বাস নেয়, তাহলে তারা মূলধারার বাইরে হতে পারে না। আমরা মূলধারার বাইরে বললে বলবো, তাহলে উনাদেরকে ঠ্যাঙ্গারচরে পাঠিয়ে দেন? আমি বলি যে, দেশের মূলধারা বলতে সেটাই বুঝাবো, আমাদের কৃষক, আমাদের শ্রমিক যে উৎপাদন করে সেটাই। এখন আমি একটা তাত্ত্বিক কথা বলি, এই যে হেফাজত সমস্যা, এই যে কওমী মাদ্রাসা সমস্যা, এইগুলো সব বিস্ফোটক, মানে আলামত মাত্র। ভেতরের রোগটা কি সেটা আমাকে দেখতে হবে। কাটামোগত সমস্যা আছে সেটা বুঝতে হবে। গায়ে জ্বর উঠেছে বটে। কিন্তু এটা কী কারণে হয়েছে সেটা দেখতে হবে। আমার মুল যে সমস্যাটা সেটা হলো কৃষক সমস্যা। পাকিস্তান আমলে কী বলা হয়েছিল, কৃষিপ্রধান পশ্চিম পাকিস্তানীদের সাথে আমাদের শিল্পের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল। আমাদের দেশেও বড় বড় শহরগুলোতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে ঢাকা, চট্রগ্রামসহ বড় শহরগুলিতে। এখনো গ্রামগুলো শোষিত, বঞ্চিত হচ্ছে। ভারতের স্বাধীনতার প্রায় ৭০বছর হতে চললো, বাংলাদেশের কথা বাদ দেন, ভারতে এখনো সেখানে শতকরা ৫০জন মানুষ অক্ষরজ্ঞানহীন। এই যে কৃষক সমস্যার সমাধান হয়নি, এই যে শ্রেণি বৈষম্য সেটাই আসল সমস্যা। যেটাকে আমরা ধর্ম সমস্যা বলি, সেটা কৃষক সমস্যারই একটি অংশ মাত্র।

নবনিতাঃ এই কথাটি আপনি খুব সুন্দর বলেছেন যে, আমরা ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন হই না, অথচ মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।
সলিমুল্লাহ খান : আমরা কেন একটা জাতীয় শিক্ষা ধারা চালু করতে পারি নাই, ১৯৭২সালে কুদরতে খোদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হলো, ২০১০এ সরকারী শিক্ষানীতিতেও একমুখি শিক্ষার কথা বলা হলো, সবাই বলছে জাতীয় শিক্ষার মাধ্যম জাতীয় ভাষা হবে। কিন্তু আজকে আমরা সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা দুই জায়গায় ব্যর্থ হয়েছি। শিক্ষা ক্ষেত্রে এবং ব্যর্থ হয়েছি বিচার বিভাগেরক্ষেত্রে। আরো বহুক্ষেত্রে। কাজেই একটা কথা আছে, “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণ সমদহে”। আমরাতো অন্যায় সহে যাচ্ছি। না করলেও। আমাদের আলোচনার মধ্যেই সেই অন্যায় প্রকাশ পায়। ন্যায়ের ভিত্তিতেই শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।

রাজকাহনে দেওয়া বক্তব্যের অনুলিখন।
অনেক সময় নিয়ে ভিডিও বক্তব্যকে অনুলিখন করে পাঠকদের কাছে পেশ করা হল। আশাকরি সবাই উপকৃত হবেন ইনশাআল্লাহ।

অনুলিখন: সৈয়দ শামছুল হুদা

#এমআরটি

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন