বড়দের প্রতি তাচ্ছিল্য আত্মঘাতি প্রবণতা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২, মে, ২০২১, রবিবার
<strong>বড়দের প্রতি তাচ্ছিল্য আত্মঘাতি প্রবণতা</strong>

সৈয়দ শামছুল হুদাঃ কওমী অঙ্গনে এই এক মরণব্যাধি দেখা দিয়েছে।ভিন্নমতের কারণে, ভিন্ন দল হওয়ার কারণে, ভিন্ন মাসলাক হওয়ার কারণে এক শ্রেণির তরুন প্রজন্ম মানসিকভাবে এতটাই বিকার গ্রস্থতা নিয়ে বড় হচ্ছে যেটা আত্মঘাতি প্রবণতার পর্যায়ে চলে গেছে। বড়দের সকল মতামতই মানতে হবে এমন কোন কথা নেই। কিন্তু তাদেরকে তাচ্ছিল্যদৃষ্টিতে দেখা, তাদের নিয়ে উপহাস করা, ট্রলবাজি করা এক ধরণের অসুস্থতার লক্ষণ। পারিপার্শ্বিক জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞতার দুর্বলতা, দায়িত্ববোধহীনতা আমাদের মাঝে বড়দের ব্যাপারে কঠোর মনোভাব তৈরি করে। যে কারণে বড়দের মধ্যেও এক ধরণের অস্থিরতা কাজ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অতিতোষামোদি করি, আবার কখনো কখনো সীমাছাড়া, অভদ্রতার চরমসীমার মন্তব্য করি।

কওমী আলেমদের নিয়ন্ত্রিত কিছু রাজনৈতিক দল আছে, এসব দলের কর্মীদেরকে এ কাজে বেশি অগ্রগামি দেখা যায়। নিজেরা নিজেরা সর্বক্ষণ এক ধরণের কামড়াকামড়ি লেগেই থাকে। অনেক দূরে দৃষ্টি দেওয়ার তাদের কোন সুযোগই হয় না। আমরা বড়দের জানাযায় যেতে খুব আগ্রহী। কিন্তু বড়দের অনুসরণের ক্ষেত্রে আমাদের চরম দুর্বলতা। অনীহা। এক দলের নেতাকর্মীরা অন্য দলের সিনিয়র নেতাদের প্রতি , এক বড় মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদেরকে অন্য বড় মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকদের প্রতি তাচ্ছিল্য থেকেই এ রোগের সূত্রপাত। আল্লাহ তায়ালার কাছে এ রোগ থেকে পানাহ চাই। এর দ্বারা সত্যিকার অর্থে আমরাই আমাদের পায়ে কুড়াল মারছি। খুব কাছাকাছি সময়ে অনেক মুরুব্বি একসাথে চলে যাওয়ায় এখন আমরা মারাত্মকভাবে মুরুব্বি শুন্যতায় ভোগছি। এহেন অবস্থায় এখনো যারা আছে, আসুন, তাদেরকে নিয়ে ট্রলবাজি না করি। জনসম্মুখে তাদেরকে তাচ্ছিল্যের স্তরে নিয়ে না যাই।

কওমী মাদ্রাসাগুলো যে সকল মুরুব্বিগণ গড়ে তুলেছেন, তাদের নানা দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। পারিপার্শ্বিক সীমাবদ্ধতা থাকে। যেহেতু এগুলো কোন থোক ফান্ড দ্বারা নির্মিত হয় না, যেহেতু এগুলো কোন সরকারী সাহায্য পায় না, সেহেতু আমাদের যারা মুরুব্বি, যারা বড় বড় মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা, তাদেরকে অনেক কৌশল করেই এসব মাদ্রাসা গড়ে তুলতে হয়েছে। এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকতে পারে, তদুপুরি তাদের এই অবদানকে ছোট করে দেখার কোন সুযোগ নেই। গোটা কওমী জগতের লাখ লাখ তরুন আলেমের কাছে আমার আবেদন, নানা সীমাবদ্ধতার দেওয়াল টপকিয়ে আমাদের মুরুব্বিগণ যে সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সে সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমরা শ্রদ্ধাবনত হই। তাদের সীমাবদ্ধতাকে আমরা দুর্বলতা হিসেবেই ধরে নিয়ে সামনের দিকে আগানোর চেষ্টা করি।

কওমী মাদ্রাসাগুলো যে সব এলাকায় গড়ে উঠেছে, সে সব এলাকায় যে সব রাজনৈতিক দলের প্রভাব বেশি, অথবা আশে-পাশে যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশি তারা সে সব মাদ্রাসায় অঘোষিতভাবেই প্রভাব বিস্তার করে রাখে। আর সে সব কারণে ঐ সকল মাদ্রাসার মুহতামিম সাহেবগণ চাইলেই আর দশটা মাদ্রাসার মতো বিপ্লবে ঝাপিয়ে পড়তে পারেন না। অনেক বক্তা, তরুন আলেম, তরুন রাজনীতিবিদ উনারাও মাদ্রাসা করেছেন। আবার এসবের সাথে একদমই কোন সম্পর্ক নেই এমন লোকেরাও অনেক মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। স্বাভাবিকভাবেই সব মাদ্রাসাগুলোর ছাত্র-শিক্ষকদের জাতীয় ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া এক রকম হয় না। এটা মেনে নিয়েই আমাদেরকে বড়দের ব্যাপারে মন্তব্য করা উচিত।

আমাদের অনেক মুরুব্বি খুব অল্প সময়ের ভেতর বিদায় নিয়েছেন। ফলে আমরা এখন অনেকটা দিশাহারা অবস্থায় আছি। অভিভাবক শুন্যতায় ভোগছি। এসব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের বর্তমানে যে কয়জন মুরুব্বি আছেন, তাদেরকে আকাশের চাঁদ মনে করি। এদেরকে কোন মন্তব্য, বক্তব্য, অবস্থানকে নিয়ে আমরা জনসম্মুখে ট্রলবাজি না করি। হাতে গোনা কয়েকজন মুরুব্বি কওমীর রাহবার হিসেবে এখনো আছেন। তাদের মধ্যে আমি যদি নাম ধরেই বলি, তাহলে বলতে পারি, আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা, আল্লামা মাহমুদুল হাসান দা.বা. আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ, মাওলানা রুহুল আমীন, মাওলানা মুহাম্মদ সালমান, মাওলানা আব্দুল হামীদ পীর সাহেব মধুপুরি, মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা. মাওলানা সাজিদুর রহমান দা.বা. মাওলানা মুফতি মনসুরুল হক দা.বা. প্রমুখ আমাদের এখন রাহবার।

কারো রাজনৈতিক অবস্থান আমার পছন্দ নাও হতে পারে, কারো সিদ্ধান্ত আমার কাছে ভালো নাও লাগতে পারে, তদুপরি আমরা তাদেরকে নিয়ে এমন কোন মন্তব্য করবো না, যাতে গোটা কওমী অঙ্গনের ক্ষতি বয়ে নিয়ে আসে। উনাদের কেউ কেউ হয়তো বর্তমান সরকারের সাথে ঘনিষ্টতা রাখেন। কেউ হয়তো প্রচন্ড সরকার বিরোধী মানসিকতা রাখেন। এটা হতে পারে। আমরা উনাদেরকে শ্রদ্ধার আসনে রেখেই ভিন্নমত প্রকাশ করবো। হয়তো মুফতি রুহুল আমীন সাহেবকে আপনার পছন্দ না, ফরিদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের অবস্থান আপনার কাছে ভালো লাগে না, বা আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা. এর কোন সিদ্ধান্ত আপনার মনপুত: হয়নি, তদুপুরি তাদের মতের সাথে ভিন্নতা প্রকাশ করেন, কিন্তু শ্রদ্ধার সাথে। উনাদের যথাযথ অবস্থানের প্রতি সম্মান জানিয়ে করেন। আমরা কারোই কোন প্রকার ব্যক্তিপুঁজাও করবো না, আবার অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে উনাদের গালিগালাজও করবো না।

কওমী অঙ্গনের কতিপয় তরুনের মধ্যে একধরণের উগ্রতা দেখা যায়।এটা আগেও ছিল। শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ. মুফতি আমিনী রহ. প্রমুখদেরকেও এরা গণতন্ত্রের পুঁজারী, তাগুতের অনুসারী বলে গালি দিয়েছে। এখনো কতিপয় যুবক রাষ্ট্রশক্তির বাস্তবতা না বুঝে বড়দের নিয়ে অনেক তাচ্ছিল্যসুরে কথা বলে। এগুলো মোটেও ঠিক নয়। বড়দের সীমাবদ্ধতাও আমাদের বুঝতে হবে। উনারা চাইলেই একজন তরুনের মতো রাজপথে ঝাপিয়ে পড়তে পারেন না। কথায় কথায় সরকারকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখাতে পারেন না। উনাদেরও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা আছে, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা আছে, ভূ-কৌশলগত সীমাবদ্ধতা আছে, আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে। সব মিলিয়েই আমাদেরকে উনাদের মূল্যায়ণ করতে হবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে, আমাদের চেয়ে দ্বীনি চেতনা জাগ্রত রাখার ব্যাপারে উনাদের দায়বদ্ধতা একটু বেশিই। আল্লাহ উনাদের বড় বানিয়েছেন, নিশ্চয়ই উনাদের বিশেষ কোন আমল বা অবদান আছে।

যেহেতু কওমী মাদ্রাসাগুলো চলে সম্পূর্ণরূপে জনগণের সাহায্যে। তাদের নিজস্ব কোন আয়বর্ধক ব্যবস্থা নেই, সেহেতু বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কওমী মাদ্রাসার দায়িত্বশীলদের পক্ষে সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে অবস্থান নেওয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব না। যে সকল উলামায়েকেরাম স্বাধীন পেশার সাথে জড়িত, যাদের নিজস্ব আয়ের সোর্স আছে, তাদের পক্ষে স্বাধীনভাবে যে কোন অবস্থান নেওয়া সম্ভব। অন্যথায় নয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে পরিবেশ-পরিস্থিতি বুঝে কথা বলার, সামনে চলার তৌফিক দান করুন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন