আমরা চাকুরী করি ভাই

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৪, মে, ২০২১, মঙ্গলবার
আমরা চাকুরী করি ভাই

তুষার আব্দুল্লাহ ::

সাংবাদিকরা যেন আসমান। যেখানে ঋতুভেদে পাঠক, শ্রোতা দর্শকের চাহিদা তৈরি হয়। কখনও রোদ, কখনও বৃষ্টি, মেঘ এমনকি ঈষাণ কোণের ঝড়ও। সবাই যখন বৃষ্টি চাচ্ছেন, তখন কোনও একজন তার ব্যক্তিস্বার্থে রোদ প্রত্যাশা করছেন। আসমান সে ক্ষেত্রে অসহায়। একজনের বায়না তার মেটানো সম্ভব হয় না।

আমরা যারা গণমাধ্যমে কাজ করি, তাদের কাছে রাষ্ট্র, জনমানুষের প্রত্যাশা সে রকমই। বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক দল আমাদের যেমন সাহসী ও নিরপেক্ষ দেখতে চায়, সরকারে গেলে তারা ততটাই আমাদের নতজানু দেখতে চান। যে কাজগুলো ছিল অনিয়মের, সেগুলোই তখন পজিটিভ বাংলাদেশের খবর। সরকারে থাকা রাজনৈতিক দল, তাদের সমর্থক এবং বিরোধী দলে থাকা রাজনৈতিক দল, তাদের তোপের মুখে থাকতে হয় বরাবর। সবাই চান তাদের ‘সুতোর পুতুল’ হয়ে থাকি।

আমাদের নাচাতে আরেক দল জুড়ে গেছে বহু আগেই, শিল্প গোষ্ঠী। সুতো তাদের হাতেও। যেমনে নাচাবেন, তেমনি নাচতে হবে আমাদের। কারণ, তাদের হাতে গণমাধ্যম চালানোর জ্বালানি- বিজ্ঞাপন এবং পুঁজি। তারা নাখোশ হলে দুটো নলই শুকিয়ে যাবে। জ্বালানি সংকটে বিকল গণমাধ্যম। গণমাধ্যমে খবর তৈরির মিস্ত্রি জোগালি আমরাই। ইট-বালু-সিমেন্ট-সুরকি জোগাড় করে খবর বানাই। খবর ফেরি করি। কিন্তু খবর তৈরিতে কতটুকু সিমেন্ট-বালু দেবো, তার এখতিয়ার কিন্তু সব সময় আমাদের থাকে না। আমরা নির্দেশিত থাকি। কম বেশি করার মুরোদ নেই। কখনও রাজমিস্ত্রিদের মতো নিজের মতো দেওয়ার চেষ্টা করি, ধোপে টিকে না। মালিকের কথাই শেষ কথা। এমন দিন আমাদের সব মিস্ত্রিদের কাছেই প্রায় নিয়মিতই আসে, তৈরি খবর ভেঙে ফেলতে হয়। ফেলে দিতে হয় ড্রেনে। কখনও তা প্রকাশ হওয়ার সুযোগ পায় না। সরকার চোখ রাঙায় তা নয়। সামাজিক ক্ষমতা, পুঁজির রাঙা চোখ ওই নির্মাণ ভেঙে দেয়। আমরা নিজের গড়া নির্মাণের চোখের জলে ভাসান দেই।

আজকাল পাথর চোখে আর জলও আসে না। সরকার, পুঁজি ছাড়াও গণমাধ্যম যারা পরিচালনা করেন বা মধ্যবিত্ত নীতিনির্ধারক তাদের ব্যক্তিস্বার্থের বলিও হয় অনেক নির্মাণ। স্বীকার করতে বাধা নেই, এই পেশাতে বুদ্ধিবৃত্তিক ঘাটতি প্রকট হচ্ছে, সেজন্যও অনেক নির্মাণে ত্রুটি থেকে যায় এবং ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটছে। এজন্য কোনও গণমাধ্যমের বা সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের কাঠগড়ায় তোলা যাবে না। একেকটি নির্মিত খবরের হেলে পড়া বা ভেঙে পড়াতে ওই গণমাধ্যমের শুধু সাংবাদিকই নয়, সব স্তরের কর্মীদের দীর্ঘশ্বাস, নীরব প্রতিবাদ, কখনও মৃদু-সরব প্রতিবাদ এবং অসহায়ত্বের কথা খবরের ভোক্তারা জানেন না।

স্বীকার করে নিচ্ছি, অন্য সব পেশার মতো সাংবাদিকদেরও নৈতিক স্খলন হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছি আমরা। পুঁজির পাহারাদার কুকুরের আচরণও করে যাচ্ছি। মালিকের অপরাধে সঙ্গত দিতেও পিছিয়ে থাকছি না। কিন্তু এই সংখ্যা কতিপয়। সবাইকে গড় অপবাদের ভাগিদার করার সুযোগ নেই। আরেকটি বিষয় লক্ষ করা জরুরি– গণমাধ্যম কর্মীরাই একমাত্র পেশাজীবী, যারা নিজেরা নিজ পেশার আত্মসমালোচনা করেন। এই সমালোচনা করতে গিয়ে বিভাজন তৈরি হচ্ছে। সিন্ডিকেট তৈরি হচ্ছে। কারণ, সমালোচনা ব্যক্তিপর্যায়ে চলে যাচ্ছে। যা এই পেশার মানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

গণমাধ্যম ক্রমশ দুরারোগ্য ‘অতি’ তে আক্রান্ত হচ্ছে। যখন সরব তখন অতি সরব হচ্ছে কোনও কোনও ঘটনায়। সেই সরবে আবেগের মিশ্রণ থাকছে। ওই আবেগ দিয়ে গণমাধ্যমই দোষীকে শনাক্ত করছে। একাধিক ঘটনায় গণমাধ্যমের এই আবেদন পরে আত্মবিলাপে পরিণত হয়েছে। ইউটার্ন নেওয়াও গণমাধ্যমের এক প্রকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অতি নীরব থাকাটাও পুরাতন রোগ। তবে বেশিক্ষণ থাকতে পারছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপে। এমন বহু ঘটনার উদাহরণ দেওয়া যাবে টক অব দ্য কান্ট্রিতে নীরব সব গণমাধ্যম। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শক্তি নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে।

দৃশ্যমাধ্যম ও পত্রিকারও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আছে। কিন্তু মূল সংস্করণের সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের বিস্তর তফাৎ। অবশ্য তফাৎ খানিক কমেও আসছে, হাততালি মানে লাইক ভিউ পেতে বেপরোয়া গণমাধ্যম এখন কোনও নীতি নৈতিকতা মানছে না। ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেল আর দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের ইউটিউব বা অবয়বপত্র আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ছে। যখন পাঠক, দর্শকের আগ্রহের বা স্পর্শকাতর কোনও ঘটনা ঘটে, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গণমাধ্যম কতটা স্নায়ুর চাপে ভুগছে। চাপ আড়াল করতে গিয়ে বড় বড় দুর্ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলছে তারা। এসব দুর্ঘটনার জন্য গণমাধ্যমের গড় কর্মীদের দায়ী করার সুযোগ নেই। কারণ, দিনশেষে তারা ওই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক মাত্র। তাদেরও পরিবারের প্রয়োজনে, বাজারে যেতে হয়। শেষ কথা হলো– আমাদের  পাঠক, দর্শকরা আমাদের নিয়ে যা-ই ভাবেন না কেন, আমরা কিন্তু চাকরি করি ভাই।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
সূত্র- বাংলা ট্রিবিউন
বিজয় বাংলা/শরিফ চোধুরী/৪ মে/২১

 

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন