আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রাঃ ২১ রামাদানে শাহাদাত বরণ করেন

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৪, মে, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী ইবনে আবু তালিব রাঃ ২১ রামাদানে শাহাদাত বরণ করেন</strong>

মারজান আহমদ চৌধুরী: কুফা শহরের বাইরে কয়েকটি পুরোনো পানির কূপ ছিল। প্রায়ই সেখানে চলে যেতেন আমিরুল মু’মিনীন সায়্যিদুনা মাওলা আলী রাদ্বিআল্লাহু আনহু। একাকী বসে বসে ভাবতেন ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। কী সব দিন তিনি দেখে এসেছেন! শৈশব, কৈশোর কেটেছে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ঘরে। সায়্যিদা খাদিজা রা. তাঁকে লালনপালন করে বড় করেছেন। মাত্র ৮ বছর বয়সে আলী ঈমান এনেছিলেন। এরপর পুরো জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পাক কদমে, আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে। কি দা’ওয়াত, কি জিহাদ— নবী যেখানে, আলীও সেখানে। ইসলামকে তিনি মক্কার মরুভূমি থেকে শূন্য অবস্থায় উঠে গিয়ে তিন-তিনটি মহাদেশে ডানা মেলে উড়তে দেখেছেন। আর আজ পৌঢ় বয়সে তাঁর চোখের সামনে ইসলামের বিজয় কেতন অবদমিত হচ্ছে। মালা থেকে ছিড়ে ছিড়ে পড়ছে ইসলামের মণিমুক্তা। জামাল, সিফফিন, নাহরাওয়ান— পরপর তিন বছরে তিনটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কমপক্ষে ৭০ হাজার মুসলমানের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আলী রা. কূপের পাশে পা ঝুলিয়ে বসে অঝোর ধারায় কাঁদতেন।

ইসলামের স্বর্ণখচিত ইতিহাস বারবার আমাদেরকে মনে করিয়ে দেয়, আলী কে ছিলেন। হিজরতের সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ আলীকে নিজের বিছানায় শুইয়ে রেখে মক্কা ত্যাগ করেছিলেন। কত বড় ভরসা ছিল আলীর ওপর! বদর যুদ্ধে কাফিরদের পক্ষ থেকে যখন মুবারাযা তথা মল্লযুদ্ধের আহ্বান করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ ﷺ তখন অন্য দুজনের সাথে আলীকে সামনে এগিয়ে দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কত গর্ব ছিল আলীকে নিয়ে! খন্দকের যুদ্ধে কুরাইশদের বীরযোদ্ধা আমর ইবনে আব্দে উদ-এর আহ্বানে একাই এগিয়ে গিয়েছিলেন আল্লাহর সিংহ আলী। নিজ হাতে খতম করেছিলেন সেই অহংকারীর দম্ভ। খায়বারের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ ﷺ আলীর হাতে তুলে দিয়েছিলেন ইসলামের পতাকা। কত আশা ছিল আলীর প্রতি! আলী সেই আশার মান রেখেছিলেন। ইহুদিদের দুর্ভেদ্য কেল্লার তুরণ ভেঙ্গে হাতের ঢাল বানিয়ে তিনি খায়বার বিজয় করে এনেছিলেন।

আল্লাহর হাবীব ﷺ আলীকে যতটা ভালোবাসতেন, ততটা ভালোবাসা অন্য কারও ভাগ্যে জুটেনি। প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতিমাকে তিনি আলীর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। ফাতিমার সাথে রাগ করে আলী যখন মসজিদের মেঝেতে শুয়ে পড়েছিলেন, রাহমাতুল্লিল আলামীন ﷺ তখন আলীকে তুলে নিজ হাতে শরীরের ধুলোবালি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। ভালোবেসে নবীজি তাঁকে ‘আবু তুরাব’ বলে ডাকতেন। আসলেই আলী ছিলেন মাটিওয়ালা। যে মাটিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কদম পড়েছে, আলী সেই মাটিকে বুকের সাথে লাগিয়ে নিয়েছেন। কন্যা ফাতিমা ও নাতিদ্বয়ের সাথে আলীকে চাদরের ভেতরে ঢুকিয়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ দুআ করেছিলেন, “আল্লাহ এরা আমার পরিবার। এদেরকে তুমি পাক করে দাও।” নাজরানের খ্রিস্টানদের সাথে যখন মুবাহালার পরিস্থিতি এসেছিল, তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ আলী, ফাতিমা ও নাতিদ্বয়কে নিয়ে মাঠে এসেছিলেন। তাবুক যুদ্ধে আল্লাহর নবী ﷺ আলীকে মদীনায় রেখে যেতে চাচ্ছিলেন। আলী অবাক, “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি যুদ্ধে যাবেন আর আমি এখানে নারী ও শিশুদের সাথে বসে থাকব? লোকে কী বলবে?” রাহমাতুল্লিল আলামীন ﷺ জবাব দিয়েছিলেন, “আলী, তুমি আমার জন্য সেরকম, যেরকম হারূন ছিলেন মুসার জন্য।” আলী ছিলেন নবীর সহকারী, সহযোগী, সহায়ক।

আবু বকর , উমর ও উসমান রাদ্বিআল্লাহু আনহুম— তিন খলিফার ২৫ বছরব্যাপী খিলাফাতকালে আলী ছিলেন তাঁদের প্রধান পরামর্শক, প্রধান বিচারক। ইলমে নববী থেকে আলীর চেয়ে বেশি ইলম আর কেউ হাসিল করেননি। আলীর চেয়ে নবীর অধিক নিকটবর্তী আর কেউ ছিলেন না।

উসমান রা. এর শাহাদাত এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিশৃঙ্খলার পর আলী ছিলেন সর্বশেষ উপায়, যার হাত ধরে খিলাফাতকে আবার উমর রা. এর সময়কার শৌর্যবীর্যে ফিরিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু মুনাফিকদের ষড়যন্ত্র, সিরিয়াবাসীর পক্ষ থেকে অবিরাম প্রতিবন্ধকতা এবং খারেজিদের উৎপাত সেই উপায়কে সুযোগে পরিণত হতে দেয়নি। মুনাফিকদের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের ফলাফলস্বরূপ উষ্টীর যুদ্ধ (৩৬ হি.), সিরিয়াবাসীর বিদ্রোহের ফলে রক্তক্ষয়ী সিফফিনের যুদ্ধ (৩৭ হি.) এবং খারেজিদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধ (৩৮ হি.) খিলাফাতে রাশীদার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। দুই বছরের মাথায় জগতের নিকৃষ্টতম ব্যক্তি আবদুর রহমান ইবনে মুলজিমের হাতে শাহাদাত বরণ করেছিলেন আলী রা.। এরপর তাঁর পুত্র হাসান রা. ছয়টি মাস ধরে খিলাফাতে রাশীদাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সিরিয়াবাসীর কারণে সেই চেষ্টাও ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল।

এক উমর ইবনে আবদুল আযীযের স্বল্পকালীন শাসনকাল (৯৯-১০১ হিজরি) ব্যতীত বনু উমাইয়ার পুরোটা শাসনামলে লোক ডেকে মজলিস বসিয়ে, এমনকি জুম’আর খুতবায় মিম্বরের ওপর দাঁড়িয়ে সায়্যিদুনা মাওলা আলীকে গালাগাল করা হতো। নবীজির দেয়া ‘আবু তুরাব’ নাম ধরে আলীকে লা’নত করা হতো। আলীর পক্ষের যারা, তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হতো। নবী-পরিবারের সদস্যদের ওপর প্রয়োগ করা হতো সীমাহীন চাপ। বনু উমাইয়ার গুণ্ডারা চেয়েছিল আলীর মাহাব্বাতকে মুমিনের অন্তর থেকে সরিয়ে দিতে। কিন্তু তারা পারেনি। আমরা আলীকে প্রাণাধিক ভালোবাসি, ভালোবাসব। আমাদের নবী ﷺ বলেছেন, “মুমিন ব্যতীত কেউ আলীকে ভালোবাসবে না। আর মুনাফিক ব্যতীত কেউ আলীকে ঘৃণা করবে না।”

বিদায় হজ থেকে ফিরে আসার পথে খুম নামক জায়গায় খুতবা দেয়ার সময় রাসূলুল্লাহ ﷺ আলীর হাত ধরে বলেছিলেন, “আমি যার মাওলা (অন্তরঙ্গ বন্ধু), আলী তার মাওলা।” আমরা আলীকে আমাদের মাওলা বিশ্বাস করি এবং মৃত্যু পর্যন্ত বিশ্বাস করে যাব।

আজ ২১ রামাদানের রাত। আজ থেকে ১৪০২ বছর পূর্বে, ৪০ হিজরি সনের ২১ রামাদান মাওলা আলী ইবনে আবি তালিব রাদ্বিআল্লাহু আনহু শাহাদাত বরণ করেছিলেন। আল্লাহর কাছে হাত উঠাই, আল্লাহ যেন আমাদের পক্ষ থেকে শত-সহস্র-লক্ষ-কোটি সালাম আমাদের মাওলা সায়্যিদুনা আলী আলাইহিস সালামের রূহের ওপর পৌঁছে দিন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন