রামাদান ২১ | রামাদানের শেষ দশকের ই’তেকাফ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৪, মে, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>রামাদান ২১ | রামাদানের শেষ দশকের ই’তেকাফ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে সহায়ক</strong>

মাওলানা নাঈম আহমদঃ আমরা প্রথমে জানবো ইতিকাফ কী? ইতেকাফ বলা হয়, ইবাদতের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করা। ইতিকাফের উদ্দেশ্যে বিশ রামাদানের সুর্যাস্তের আগে আগেই মসজিদে প্রবেশ করতে হবে এবং ঈদের রাতে সূর্যাস্তের পর মসজিদ থেকে বের হবে। রাসূলে আরাবী সা. সারা জীবন রামাদানের শেষ দশকে ইতিকাফ করেছেন। এমনকি ওফাতের বছরও ২০ দিন ইতিকাফ করেছেন।

রমজান মাসের শেষ দশকে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদত করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। যে কোনো মাসেই ফজরের সালাত জামাতের সাথে আদায় করে সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করা সওয়াবের কাজ মর্মে হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করে যিকির-আযকার করে, অতঃপর সূর্য উপরে উঠে গেলে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, তার আমলনামায় পূর্ণ একটি হজ্ব ও পূর্ণ একটি উমরার সওয়াব লিখে দেওয়া হবে। [সুনানে তিরমিজি: হাদিস নং-৫৮৩]

প্রিয় পাঠক! চিন্তা করুন, অন্যান্য মাসে যদি এই সওয়াব হয়, রামাদান মাসে তার সওয়াব কী হবে! কারণ, রামাদানের সওয়াব আল্লাহ নিজে দিবেন বলে ঘোষণা করেছেন। যেমন, সহীহ মুসলিমের এক হাদীসের একাংশে রয়েছে- আদম সন্তানের প্রতিটি কাজের বিনিময়কে দশ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। আল্লাহ বলেন, তবে সওমের প্রতিদান ব্যতিত। কেননা, সওম একমাত্র আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব. বান্দা আমারই জন্য খাদ্য-পানীয় ও কামপ্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে। [হাদীস নং-২৭৬৩]

রামাদান মাসে ই’তেকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া। ই’তেকাফ তিন প্রকার। যথা:- ওয়াজিব, সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ ও মুস্তাহাব। (১) ওয়াজিব ই’তেকাফ হল, কেউ ই’তেকাফের মান্নত করলে তার উপর ই’তেকাফ করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (২) সুন্নাতে মুয়াক্কাদায়ে কিফায়া হল: রামাদান মাসের শেষ দশকে ই’তেকাফ করা। (৩) মুস্তাহাব ই’তেকাফ: যে কোন সময় ই’তেকাফের নিয়ত করে মসজিদে অবস্থান করা।

ই’তেকাফকারীর জন্য মুসলমান হওয়া, জ্ঞানবান হওয়া শর্ত, গোসল ফরয এমন অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হওয়া উচিত। কারণ, হায়েযগ্রস্থ, নেফাসগ্রস্থ ও যুনুবীর জন্য মসজিদে প্রবেশ বৈধ নয়।

রামাদানের শেষ দশকে মসজিদে ই’তেকাফ করতে ইচ্ছুক ভাইয়েরা! আপনারা এখনই দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন যে, বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করবো। কেননা, কুরআন তেলাওয়াত সর্বোত্তম যিকির। তাছাড়া কুরআনের প্রতিটি হরফের বিনিময়ে উত্তম প্রতিদান দেওয়া হয়। আর প্রতিটি উত্তম প্রতিদান দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। তাছাড়া কুরআনে কারীম তার পাঠকারীর জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হবে।

ই’তেকাফ অবস্থায় আমাদের উচিত, ফরয নামাজের পাশাপাশি বেশি বেশি নফল সালাত অর্থাৎ ইশরাক, চাশত, আউওয়াবীন ও তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা। মহান রবের কাছে বিনীতভাবে কাকুতি-মিনতি করা, কায়মনোবাক্যে তাঁর কাছে দু’আ-মোনাজাত করা। বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য ই’তেকাফের জন্য প্রয়োজন, যবানকে সংযত রাখা; বেশি বেশি যিকির-আযকার করে যবানকে সতেজ ও সিক্ত রাখা। “যবানে যিকরুল্লাহ যে লয় হর-হামেশা/ কঠিন বিপদেও সে তাঁকে পায় সর্বদা। মাওলার যিকিরে যবান সিক্ত যার/ হালাওয়াতুল ঈমান (ঈমানের স্বাদ) অনুভব হয় তার।”

ইবনে রজব হাম্বলী (রহঃ) স্বীয় গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রতিদিন ১২ হাজার বার “সুবহানাল্লাহ” এর যিকির করতেন। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল, আপনি এত বেশি যিকির করেন কেন? জবাবে তিনি বলেন, আমি এই যিকিরের মাধ্যমে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভের আশা করি।

ইমাম হাকেম (রহঃ) বলেন, একদা এক বেদুঈন রাসূলে আরাবী (সাঃ)-এর নিকট এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলামের তো বহু আমল রয়েছে, তার মধ্য থেকে কিছু আমল আপনি বাতলে দিন! তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে বললেন, সর্বদা তুমি তোমার জিহ্বাকে আল্লাহর যিকির দ্বারা সিক্ত রাখবে। [সুনানে তিরমিযী: হাদীস নং-৩৩৭৫]

রামাদানের শেষ দশকের বিজোড় রাত্রে আমাদের উচিত, কদর লাভ করার চেষ্টা করে যাওয়া; যে রাত হাজার রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এব্যাপারে সহীহ বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে- “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে পুণ্যের আশায় কদরের রাতে কিয়াম করবে (সালাত আদায় করবে) তার পূর্ববর্তী যাবতীয় গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।” (সুবহানাল্লাহ) [হাদীস নং-১৯০১]

রাসূলুল্লাহ সা. রামাদানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে কদর অনুসন্ধান করতেন এবং তাঁর সাহাবীদেরকেও কদর অনুসন্ধানের নির্দেশ দিতেন। এমনকি তাঁর পরিবার-পরিজনদেরকেও কদর অনুসন্ধানের জন্য জাগিয়ে দিতেন। এক হাদীসে রয়েছে- আম্মাজান আয়েশা রা. রাসূলুল্লাহ সা.-কে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কদরের রাতে কী দু’আ পড়বো? জবাবে রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, এই দু’আ পাঠ করা: উচ্চারণ, আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আ’ফউন কারীমুন, তুহিব্বুল আ’ফওয়া, ফা’ফু আ’ন্নী। যার অর্থ হল: “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। আমাকে ক্ষমা করে দিন।” [মুসনাদে আহমাদ: হাদীস নং-২৫৭৪১]

রব্বে কারীম আমাদেরকে এই মহৎ ইবাদতের জন্য কবুল করুন! তার রহমতের চাদরে আমাদের আবৃত করে নিন। আমীন ইয়া রাব্বাল আ’রশিল আ’যীম।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন