কওমী মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত: কওমীপন্থীরা কি এদেশের হাফ নাগরিক?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৮, মে, ২০২১, শনিবার
কওমী মাদরাসায় রাজনীতি বন্ধের সিদ্ধান্ত: কওমীপন্থীরা কি এদেশের হাফ নাগরিক?

কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড আগ বাড়িয়ে একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মাদরাসায় ছাত্র শিক্ষক রাজনীতি বন্দ থাকবে। শুনেছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও এমন একটি সরকারী সিদ্ধান্তের কথা আলেমদের সমঝোতা বৈঠকে প্রদান করেছেন।

সরকার শুধু দুধ চেয়েছিলো আলেমরা গাভীসুদ্ধ দান করে এসেছেন! এই সিদ্ধান্তকে অনেকে বাহবা দিচ্ছেন, কেউ বলেছেন সময়ের কৌশলী সিদ্ধান্ত। সরকার সংশ্লিষ্ট অনেকে বলছেন, এটা হেফাজতের সাময়িক কৌশল। সরকারের রোষানল থেকে নিজেদেরকে বাঁচাতে তারা এমন একটি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন মাত্র।

বাংলাদেশে কওমী মাদরাসা অঙ্গন সম্পর্কে যারা ওয়াকিফহাল আছেন, তারা বলতে পারবেন, কোন কওমী মাদরাসায় ছাত্র রাজনীতি ঘোষণা দিয়ে করা হয়না। বরং প্রায় সকল মাদরাসায়ই লিখিত অলিখিত নিয়ম রয়েছে, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ।

আলোচিত মাদরাসা হাটহাজারী থেকে ছাত্র সংগঠন করার অপরাধে বহু ছাত্রকে বহুবার বহিষ্কার করা হয়েছে। এই চিত্র বাংলাদেশের প্রায় সব বড় বড় মাদরাসার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের ছাত্র জীবনে দেখেছি, এসব মাদরাসায় হরকাতুল ইসলামের কিছু পোলাপান থাকতো। এদের কাজই ছিলো কোন কোন ছাত্র সংগঠন করে, এই তালিকা মাদরাসা কর্তৃপক্ষের নিকট সরবরাহ করা। কারণ তাদের মতে গণতান্ত্রিক উপায়ে রাজনীতি করা কুফরি। এরা সংগঠন সংশ্লিষ্ট ছাত্রদেরকে বহিস্কার করানোটা তাদের ঈমানী দায়িত্ব মনে করতো।

এছাড়া ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে মোটা দাগে তিনটা অভিমত ছিলো, ছাত্র রাজনীতি হারাম, ছাত্র রাজনীতি আর অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে করা সমান এবং ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদেরকে বেয়াদব বানিয়ে দেয়। ১৯৯২ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ছাত্র সংগঠনে সক্রীয় থাকার ফলে দেখার সুযোগ হয়েছে, ছাত্র সংগঠনের ব্যপারে উলামায়ে কেরামদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?

খোদ শায়খুল হাদীস রহঃ এর মাদরাসা জামেয়া রাহমানিয়াতেই ছাত্র সংগঠন করা এতেটা নির্বিঘ্ন ছিলোনা। এই মাদরাসা থেকেও বিভিন্ন সময়ে ছাত্ররা বহিষ্কার হয়েছে ছাত্র সংগঠন করার অপরাধে। মাদরাসা সংশ্লিষ্টদের একটা মানসিকতা হলো, ছাত্ররা নিয়মতান্ত্রিক কোন সংগঠনে জড়াবেনা। শুধু মিছিল মিঠিং হলে তারা অংশগ্রহণ করবে।

এজন্য স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও কওমী মাদরাসা ভিত্তিক সুসংগঠিত কোন ছাত্র সংগঠন তৈরী হয়নি। এ অঙ্গনে ছাত্র মজলিস নামক একটি ছাত্র সংগঠন তৈরীর চেষ্টা হয়েছিলো কিন্তু তাও সেরকম সফল হতে পারেনি। হতে পারেনি এই আলেমদের কারণেই। আলোচিত মামুনুল হকও তোমনি একজন আলেম। তার সংগঠন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসে ছাত্র সংগঠনের ব্যাপারে তার মানসিকতা, ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে তার আচরণ কেমন এসবের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী আমি নিজেই।

এরা প্রকাশ্যেই বলতো,
ছাত্র সংগঠন করার দরকার কী?
রাসূলের সময় কি ছাত্র সংগঠন ছিলো?
এবং ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে তাদের অপমানজনক আচরণ, অবমূল্যায়ন এবং এদের বিরুদ্ধে নানা কূটকৌশল করা এসব নিয়মিত ঘটে আসছে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ছাত্র সংগঠনকে অকার্যকর রাখার এমন কোন কাজ বাকী রাখেনি মামুনুল হক যা উনি করেনি। সর্বশেষ সংগঠনের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সংগঠনের নিজস্ব ছাত্র সংগঠনের বাইরে নিজের অনুসারী ছাত্রদেরকে নিয়ে উনি পৃথক সংগঠন করেছেন, বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিস। মূল দল এই ভূঁইফোর ছাত্র সংগঠন বিলুপ্ত করার সময়সীমা বেধে দেয়ার পরও তিনি তা করেননি। এই কাজটি সংগঠনের নীতি আদর্শ ও সংবিধান পরিপন্থী হওয়ার পরও মামুনুল হকের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি খেলাফত মজলিস। কেন? কারণ ব্যক্তি মামুন ততোদিনে সংগঠনের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন।

হেফাজতের ক্ষেত্রেও তাই। এখানেও মাওলানা মামুনের বিতর্কিত রিসোর্ট কাণ্ডের পর হেফাজত কোন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
কেন?
কারণ ব্যক্তি মামুন হেফাজতের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছেন। এই অসময়ে এবং অনিয়মতান্ত্রিক বড় হয়ে উঠার খেসারত দিচ্ছে বাংলাদেশের কওমী অঙ্গন।
হেফাজতের কর্মকাণ্ড শুরু থেকই অনিয়মতান্ত্রিক, অসাংগঠনিক, অপরিকল্পত এবং হুজুগে।
এবং এসব কিছুর মূলে হলো, কওমী অঙ্গনে নিয়মতান্ত্রিক কোন রাজনৈতিক সংগঠনের চর্চা না থাকা। এদের ছাত্রদের এসব হটকারী বহু কাজ আমরা দেখতে পেয়েছি অতীত ও চলমান সময়ের আন্দোলনে। এদেরকে কন্ট্রোল করতে পারেনি দল। এসকল ছাত্ররা কখন কোন কাজ করবে, কোনটা করতে পারবেনা এর কোন নির্দেশনা তাদের সামনে ছিলোনা। একটি অনিয়মতান্ত্রিক সংগঠন হওয়ার কারণেই তা ছিলোনা। যে কারণে তারা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়েছে হাইয়্যা বলাল জিহাদ। এরা থানায় করেছে আক্রমণ, এরা জ্বালিয়ে দিয়েছে আলাউদ্দিন সঙ্গীতাঙ্গন, রেল স্টেশনে করেছে অগ্নি সংযোগ। অথচ এর পরিণতি কী হতে পারে তা ভাবার তো পরিপক্ষতাও এদের ছিলোনা। এই হটকারী দলবাজী তাদেরকে অতীতেও অনেক বিপদে ফেলেছে এবং বর্তমানেও এসব ছেলেরা তাদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের কিছু গবেট আছে, যারা হেফাজতের সহিংস আন্দোলনে জামাত বিএনপিকে দায়ী করে। এরা জানেনেও না হেফাজতের ছায়ায় আশ্রয় নেয়া হরকত ও কথিত জিহাদপন্থী ছেলেরা এই সহিংসতার জন্য মূল দায়ী। এতো বিশাল সংখ্যক উগ্রপন্থী ছাত্র থাকলে নিজেদের সর্বনাশের জন্য জাামত বিএনপির প্রয়োজন হয়না।

সুতরাং এখন এসে কওমী মাদরাসায় যদি নিবন্ধিত রাজনৈতিক সংগঠনের ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়, অচীরেই কওমী মাদরাসায় আবার কট্টরপন্থী, উগ্র ও কথিত জিহাদপন্থী গুপ্ত সংগঠনগুলোর তৎপরতা বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং এর বিষবাষ্প কওমী মাদরাসাকে আবারও জঙ্গী তৈরীর প্রজননকেন্দ্র সাব্যস্ত করার প্রেক্ষাপট তৈরী হবে। এদেশে আবার বাংলা ভাই, শায়খ আব্দুর রহমান, শেখ ফরীদ এবং মুফতি হান্নান তৈরী হবে। আজকের হেফাজতের সামনের সারিতে যারা আছেন তারাও মূলত নিয়মতান্ত্রিক কোন সংগঠন চর্চাকারী কোন ব্যক্তি নন, খুঁজ নিলে দেখা যাবে এরাও কোন না কোন ভাবে “যেরযবরপেশের” লোক।

সর্বোপরি এই সিদ্ধান্ত মৌলিক মানবাধিকার এবং বাংলাদেশের সংবিধান পরিপন্থী। কারণ সংবিধান এদেশের যে কোন প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিককে সংবিধানের অধীনে থেকে যে কোন রাজনৈতিক দল গঠন, সভা সমাবেশে অংশ গ্রহণের অধিকার দিয়েছে। আজকে এসে যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে কওমী মাদরাসা শিক্ষিতরা কি এদেশের হাফ সিটিজেন বা অর্ধেক নাগরিক?

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন