চীনা রকেটের পৃথিবীতে পড়া নিয়ে কেন এত তোলপাড়

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১১, মে, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>চীনা রকেটের পৃথিবীতে পড়া নিয়ে কেন এত তোলপাড়</strong>

চীনা মহাকাশ স্টেশনের জন্য লং মার্চ ফাইভ বি রকেটে করে মডিউল পাঠানো হয় ২৯শে এপ্রিল।
(এবিষয়ে বিস্তারিত শুনতে পাবেন বিজ্ঞানের আসরে। পরিবেশিত হবে ১২ই মে, বুধবার, রাত সাড়ে দশটায় পরিক্রমা অনুষ্ঠানে)
চীনের একটি রকেটের ধ্বংসাবশেষ অনিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীতে আছড়ে পড়ে গত রবিবার। তার আগে এটি কোথায় পড়বে – তা নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। কেননা ১৮ টন ওজনের এই ধ্বংসাবশেষ ছিল মহাকাশে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় আবর্জনাগুলোর একটি।
মহাকাশে আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন, যা চীনকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না, তার মতো চীনও একটি স্পেস স্টেশন তৈরি করছে। ধারণা করা হচ্ছে এটি কাজ শুরু করবে ২০২২ সালে। এর আগে তাতে আরো বেশ কিছু অংশ বা মডিউল যুক্ত করতে হবে। এরকমই একটি মডিউল ২৯শে এপ্রিল পাঠানো হয় চীনের লং মার্চ ফাইভ বি রকেটে করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাধারণত মডিউল মহাকাশে নিক্ষেপ করেই বুস্টার রকেটের প্রধান অংশ সাথে সাথেই পৃথিবীতে পড়ে যায়। কিন্তু চীনের রকেটটি পৃথিবীর কক্ষপথ পর্যন্ত চলে গিয়েছিল।
চীনের এই লং মার্চ ফাইভ বি বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রকেট।
আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একজন বিজ্ঞানী ড. অমিতাভ ঘোষ বলছেন, “চীন পৃথিবীর প্রায় দুশো মাইল উপরে একটি মহাকাশ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। এই লং মার্চ ফাইভ বি রকেট স্পেস স্টেশনটিকে পৃথিবীর কক্ষপথে রাখতে সাহায্য করেছিল। সেটা করতে গিয়ে রকেটটি ওই অরবিটে চলে যায়।”
এর পর চীনা রকেটটি দুশো মাইল উচ্চতায় পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতে শুরু করে। দশ থেকে বারো দিন কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে একসময় এটি ধীরে ধীরে পৃথিবীর দিকে নেমে আসতে শুরু করে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীতেই একটা আতঙ্ক তৈরি হয়। রকেটটি কোথায় পড়বে তা নিয়ে শুরু হয় জল্পনা কল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র চীনা রকেটের এই অনিয়ন্ত্রিত প্রত্যবর্তনের তীব্র সমালোচনা করে।
তবে নাসার বিজ্ঞানী ড. ঘোষ বলছেন, এই রকেটের এভাবেই পৃথিবীতে পড়ে যাওয়ার কথা ছিল।

ভিডিওর ক্যাপশান,
রকেটের মসৃণ অবতরণের পথে যত চড়াই-উৎরাই
মহাকাশে কোন কিছু পাঠাতে হলে প্রচণ্ড শক্তির প্রয়োজন হয় আর সেই কাজটি করতে গিয়ে রকেটকে ব্যবহার করা হয় উৎক্ষেপণ যান হিসেবে। এই রকেটের বড় অংশেই থাকে জ্বালানি যার সাহায্যে এটি মহাকাশে কিছু বহন করে নিয়ে যাওয়ার শক্তি অর্জন করে।
সেই রকেট উপরে গিয়ে তার কাজ শেষ করে আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। কিছু ক্ষেত্রে সেটা কয়েক মিনিটের মধ্যে নেমে যায় আবার কিছু ঘটনায় আরো কিছু সময় লাগে।
“এরকম হওয়ারই কথা ছিল। মডিউলটায় তো জ্বালানি ছিল না। এজন্য আলাদা একটি যানের দরকার যাতে জ্বালানি থাকে। মহাকাশ যান কিন্তু শুধু রকেটের একেবারের উপরের অংশটুকু। আর বাকিটা সবই জ্বালানি। জ্বালানির পুরো কন্টেইনারটি পৃথিবীতেই থেকে যায় ও পৃথিবীতে পড়ে যায়। শুধু উপরের অংশটি চলে যায় আউটার স্পেসে,” বলেন ড. ঘোষ।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে রকেটটি যখন পৃথিবীতে পড়ে তখন কি সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব?
বিজ্ঞানীরা বলছেন, নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব যেমনটা স্পেস এক্স তাদের ফ্যালকন-নাইন রকেট দিয়ে করে আসছে। এখনও পর্যন্ত এই রকেটটি দশবার ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে তাদের খরচও পড়ছে অনেক কম।
অমিতাভ ঘোষ বলেন, “এটাকে বলা হয় নির্দেশিত পথে নিচে নামানো বা গাইডেড ডিসেন্ড। কিন্তু এটা একেবারেই নতুন প্রযুক্তি যা গত পাঁচ-দশ বছরে তৈরি করা হয়েছে। চীন এখনও এই প্রযুক্তি অর্জন করতে পারেনি।”
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই রকেটের কারণে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। চীনও বলে আসছিল এনিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাদের অভিযোগ ছিল যে পশ্চিমা মিডিয়া একটা ভয়ের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে।
চীনের লং মার্চ ফাইভ বি রকেট।
ছবির ক্যাপশান,
চীনের লং মার্চ ফাইভ বি রকেট।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চীন যে মহাকাশে এতো বড় শক্তি হয়ে উঠছে এবং নিজেদের স্পেস স্টেশনও তৈরি করতে সক্ষম হচ্ছে এজন্য দেশটিকে কেউ কৃতিত্ব দিচ্ছে না কিন্তু তাদের একটি রকেট পড়ে যাওয়া নিয়ে হৈ চৈ লাগিয়ে দিয়েছে।
এর আগেও বেশিরভাগ সময় রকেট পানিতে পড়েছে। নাসার বিজ্ঞানী ড. ঘোষ বলছেন, এটাও একটি স্বাভাবিক বিষয়।
“দেখুন, পৃথিবীর চার ভাগের তিনভাগই হচ্ছে সমুদ্র। তাহলে মহাকাশ থেকে চোখ বন্ধ করে যদি কিছু ফেলা হয় তার সমুদ্রে পড়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর স্থলভাগে পড়লেও পৃথিবীর ২৫ শতাংশ স্থলের বেশিরভাগ এলাকাতেই মানুষ থাকে না। ফলে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি খুব কমই থাকে।”
তিনি বলেন, “লটারি জেতার সম্ভাবনা যতটুকু, একটি রকেটের আপনার বাড়ির বাগানে পড়ার সম্ভাবনাও ততটুকু।”
সত্তরের দশকের শেষের দিকে ৭৭ টন ওজনের আমেরিকান স্কাইল্যাব নামের একটি রকেটের ধ্বংসাবশেষ অস্ট্রেলিয়ার জঙ্গলে গিয়ে পড়েছিল। এই ঘটনায় প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ক্ষমা চেয়েছিলেন। তবে তাতেও কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। বেশিরভাগই অংশ পড়েছিল ভারত মহাসাগরে।
চীন তার স্পেস স্টেশনটি তৈরি করতে গিয়ে ২০২২ সাল পর্যন্ত এরকম আরো দশটি মডিউল মহাকাশে পাঠাবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এর ফলে আগামীতেও এই একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। তাতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
চীনের লং মার্চ ফাইভ বি রকেট সমুদ্রে পড়ার আগে তার বেশিরভাগই আগুনে পুড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।
“মহাকাশ থেকে রকেট যখন পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন রকেটটি প্রচণ্ড দ্রুত গতিতে নিচের দিকে নামতে থাকে এবং বাতাসের সঙ্গে তার সংঘর্ষ হতে শুরু করে। তখন রকেট গরম হতে থাকে। এক পর্যায়ে তাপমাত্রা যদি দেড় হাজার ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড হয়ে যায় তখন ধাতব পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও তাতে আগুন লেগে যাবে।”

সুত্র : বিবিসি

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন