ভারতে হিসেবেই ধরা হচ্ছে না যেসব মৃত্যু

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১২, মে, ২০২১, বুধবার
ভারতে হিসেবেই ধরা হচ্ছে না যেসব মৃত্যু

ইন্টারন্যশনাল ডেস্কঃ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার সম্পাদকের স্ত্রী এপ্রিলের ১ তারিখে তার মেয়েকে কোভিড-১৯ টেস্ট করানোর জন্য এক সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান।

হাসপাতালে যখন তারা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, তখন দেখলেন স্ট্রেচারের ওপর দুটি ব্যাগে মোড়ানো লাশ পড়ে আছে। গান্ধীনগরের এই হাসপাতালের কর্মীরা জানালেন, কোভিড-১৯ এ মারা গেছে এই দুজন।

হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে মা-মেয়ে এই ঘটনাটি জানালেন রাজেশ পাঠককে, যিনি সন্দেশ পত্রিকার স্থানীয় সংস্করণের সম্পাদক ।

মিস্টার পাঠক সেই সন্ধ্যাতেই তার রিপোর্টারদের ফোন করলেন এবং এই ঘটনাটি আরও তদন্ত করে দেখার সিদ্ধান্ত নিলেন।

তিনি বলছিলেন, “কারণ তখনো পর্যন্ত সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে গান্ধীনগরে কোভিড-১৯ এ কারও মৃত্যুর কথা জানানো হচ্ছিল না।” পুরো গুজরাট রাজ্যে সেদিন নয়জন মারা গেছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছিল।

এর পরদিন সন্দেশ পত্রিকার একদল রিপোর্টার সাতটি শহরের যেসব হাসপাতালে কোভিড রোগীদের চিকিৎসা করা হয়, সেখানে ফোন করা শুরু করলেন। আহমেদাবাদ, সুরাট, রাজকোট, বরোদা, গান্ধীনগর, জামনগর এবং ভাবনগর- এই সাত শহরের হাসপাতালগুলোতে কোভিডে মারা যাওয়া রোগীদের সংখ্যার হিসেব রাখছিলেন তারা।

‘সন্দেশ’ গুজরাটি ভাষায় প্রকাশিত ৯৮ বছরের পুরনো এক সংবাদপত্র। ঐদিন হতে পত্রিকাটি প্রতিদিন কোভিডে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা প্রকাশ করে যাচ্ছে। তাদের প্রকাশিত সংখ্যা সরকারি হিসেবের কয়েকগুণ।

“হাসপাতালগুলোতে আমাদের নিজস্ব সূত্র আছে। আমাদের কোন রিপোর্ট সরকার আজ পর্যন্ত অস্বীকার করেনি। কিন্তু তারপরও আমরা নিজেরা সব তথ্য যাচাই করে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চেয়েছি।”

পত্রিকাটি এরপর রিপোর্টার পাঠিয়ে সরেজমিনে কিছু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার সিদ্ধান্ত নিল। ১১ এপ্রিল সন্ধেবেলায় দুজন রিপোর্টার এবং একজন ফটোগ্রাফারকে তারা পাঠালো আহমেদাবাদের ১ হাজার ২০০ শয্যার সরকারি হাসপাতালের মর্গে।

প্রায় ১৭ ঘণ্টা ধরে সেখানে থেকে তারা দেখলেন, মর্গের কেবল একটি দরোজা দিয়েই ৬৯টি মরদেহ বাইরে এনে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়েছে। পরেরদিন গুজরাটে সরকারি হিসেবে বলা হচ্ছিল পুরো রাজ্যে ৫৫ জন মারা গেছে, এর মধ্যে ২০ জন আহমেদাবাদে।

১৬ই এপ্রিল রাতে এই সাংবাদিকরা চলে গেলেন ১৫০ কিলোমিটার দূরের আহমেদাবাদে। সেখানে তারা ২১ টি শ্মশান পরিদর্শন করলেন। সেখানে তারা লাশ রাখার বডি ব্যাগ এবং লাশ দাহ করার চিতার সংখ্যা গুনলেন। শ্মশানের রেজিস্টার ঘেঁটে পরীক্ষা করলেন এবং কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বললেন। যেসব চিরকুটে মৃত্যুর কারণ লেখা থাকে, সেগুলো দেখলেন। ছবি তুলেন, ভিডিও ধারণ করলেন।

তারা দেখলেন, বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ”অসুস্থতা”। অথচ এসব মৃতদেহ দাহ করা হয় সবচেয়ে কঠোর সতর্কতার নিয়ম মেনে। সেই রাতের শেষে তারা গুনে দেখলেন দুশোর বেশি মৃতদেহ সেখানে ছিল। কিন্তু পরেরদিন আহমেদাবাদের সরকারি হিসেবে মৃতের সংখ্যা ২৫ বলে উল্লেখ করা হলো।

পুরো এপ্রিল মাস জুড়ে সন্দেশ পত্রিকার রিপোর্টাররা সাতটি শহরে কোভিডে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা গণনা করে গেছেন কঠোর অধ্যবসায়ের সঙ্গে। ২১শে এপ্রিল তাদের গণনা অনুযায়ী মারা গিয়েছিল ৭৫৩ জন। গুজরাটে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হানার পর এটি ছিল একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। এরপর ৫ মে এই পত্রিকার রিপোর্টাররা বরোদা শহরে ৮৩টি মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করেন। আর সেদিন সরকারি হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩।

গুজরাটের সরকার অবশ্য মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর কথা অস্বীকার করে বলছে, তারা কেন্দ্রীয় সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়ম-কানুন মেনেই গণনা করছে।

কিন্তু অন্যান্য সংবাদপত্রের রিপোর্টেও মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর কথিত অভিযোগের ব্যাপারে রিপোর্ট প্রকাশ পেতে থাকে। যেমন ইংরেজি সংবাদপত্র দ্য হিন্দু তাদের এক রিপোর্টে জানায়, তাদের কাছে তথ্য আছে যে, এই সাতটি শহরে ১৬ এপ্রিল কোভিড প্রটোকল মেনে দাহ করা হয়েছে ৬৮৯টি দেহ, অথচ পুরো গুজরাট রাজ্যে সেদিন মৃতের সংখ্যা ৯৪ বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, কেবল গত মাসেই হয়তো গুজরাটে কোভিড-১৯ এ মৃত্যুর সংখ্যা দশগুণ কমিয়ে দেখানো হয়েছে।

মহামারির কারণে লোকজন শোকপ্রকাশের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিতে পারছেন না। কিন্তু সংবাদপত্রগুলো শোক সংবাদে ভরা। আর এসব শোক সংবাদ থেকেও ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হচ্ছে:

কিন্তু গুজরাটে যেরকম হারে মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হচ্ছে সেটা বিশাল এবং এজন্যে সেখানে হাইকোর্ট পর্যন্ত রাজ্য সরকারের ভর্ৎসনা করেছে। গুজরাটে এখন ক্ষমতায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি।

গত এপ্রিলে হাইকোর্টের বিচারকরা বলেছিলেন, “প্রকৃত চিত্র আড়াল করে রাজ্য সরকার এ থেকে কোন ফায়দা পাবে না। বরং সঠিক তথ্য আড়াল করে বা ধামাচাপা দিলে ভয়, এবং আস্থার অভাবের আরও গুরুতর সমস্যা তৈরি হবে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আরও আতংক ছড়িয়ে পড়বে।”

অনেকের বিশ্বাস, কোভিডে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে অন্যান্য যে অসুখে তারা ভুগছিলেন সেটার কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র আমলা আমাকে জানিয়েছিলেন, কেবল যাদের পরীক্ষা করে কোভিড-১৯ ধরা পড়ছে এবং যারা ‘ভাইরাল নিউমোনিয়ায়’ মারা যাচ্ছেন, তাদেরকেই কোভিড-১৯ এর মৃত্যুর হিসেবে ধরা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানি অবশ্য বলেছেন, “প্রতিটি মৃত্যু তদন্ত করা হচ্ছে এবং একটি ‘ডেথ অডিট কমিটি’ তার হিসেব রাখছে।”

ভারতে ”মিলিয়ন ডেথ স্টাডি” বলে বেশ বড় একটি গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটি অব টরোন্টোর প্রভাত ঝা। তার মতে, মর্গে বা শ্মশানে মৃতদেহ গণনা করে সেটাকে সরকারি সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে না, কারণ সরকারি পরিসংখ্যান আসে কিছুটা দেরিতে। এমনকি যুক্তরাজ্যেও করোনাভাইরাসে মৃতের সরকারি সংখ্যা পরে সংশোধন করা হয়। কারণ কিভাবে এই গণনা করা হবে, সেটা পর্যালোচনা করা হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়েই করোনাভাইরাসে মৃত্যুর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেখানো হচ্ছে।

ডঃ ঝা বলেন, “মহামারির সময় মৃত্যুর সংখ্যার হিসেব পাঠানো এবং তার রেকর্ড রাখার সিস্টেমটা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে পড়ে। কাজেই তথ্য হালনাগাদ করতে কর্মকর্তারা একটু সময় নেন। কিন্তু তাদের অবশ্যই তথ্য হালনাগাদ করতে হবে, সব মৃত্যুর সংখ্যা রেকর্ড করতে হবে। হাসপাতালে আর শ্মশানে বডি ব্যাগ গোনার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টির ব্যাপারটা সেদিক থেকে বেশ ভালো একটা কৌশল, কর্তৃপক্ষ যেন প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।”

তবে যে সাংবাদিকরা এই কাজটা করছেন, তাদের জন্য এটি ছিল ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা।

হিতেশ রাঠোর সন্দেশ পত্রিকায় ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করেন। মৃতের সংখ্যা গণনার কাজটি কিরকম যন্ত্রণাদায়ক ছিল তার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি।

“লোকজন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছিল এবং তারপর বডি ব্যাগে মৃত অবস্থায় বেরিয়ে আসছিল।”

শ্মশানে গিয়ে তিনি দেখেন সেখানে লাশের দীর্ঘ মিছিল, দাহ করার আগে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। হিতেশ রাঠোর বলেন, এই দৃশ্য তাকে মনে করিয়ে দিয়েছে “ভারতে নোট বাতিলের পর ব্যাংকগুলোর সামনে মানুষের যে দীর্ঘ লাইন” দেখেছিলেন, সেকথা। নরেন্দ্র মোদী ২০১৬ সালে ভারতীয় রূপীর বড় অংকের নোট বাতিলের বিতর্কিত সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।

“পাঁচ বছর পর আমি হাসপাতাল, মর্গ আর শ্মশানের বাইরে একই ধরণের লাইন দেখলাম। তবে এবারের লাইনটা বেঁচে থাকার জন্য মরিয়া চেষ্টা করছে এমন মানুষ আর মরা মানুষদের।”

রনক শাহ হচ্ছেন সন্দেশের সেই রিপোর্টারদের একজন, যিনি নানা হাসপাতালে গিয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলছেন, একটি হাসপাতালের লাউডস্পিকারে বাবার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে তিন সন্তান যেভাবে বিলাপ করে কেঁদে উঠেছিল, সেটা তাকে প্রচণ্ড-ভাবে ধাক্কা দেয়।

“ওরা বলছিল, বাবাকে হাসপাতাল থেকে তুলে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছিল ওরা। কিন্তু সাত ঘণ্টা পর তাদেরকে বাবার লাশ নিয়ে ফিরতে হয়।”

সন্দেশ পত্রিকার আরেক রিপোর্টার দীপক মাশলা সেই দলটির নেতৃত্ব দেন যেটি শ্মশানগুলিতে গিয়ে মৃতের সংখ্যা যাচাই করেছে। দীপক বলেন, ভয় আর মানসিক ধাক্কা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।

“আমি দেখেছি বডি ব্যাগে সন্তানের লাশ নিয়ে বাবা-মা এসেছে, শ্মশানের কর্মচারীদের টাকা দিয়ে বলছে, ‘দয়া করে আমার সন্তানকে নিয়ে দাহ কর। ওরা এমনকি নিজের সন্তানের লাশ স্পর্শ করতে ভয় পাচ্ছিল।”

ইমতিয়াজ উজ্জাইনওয়ালা এই দলের আরেক রিপোর্টার। তার বিশ্বাস মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর হার অনেক ব্যাপক, কারণ তিনি এবং তার সহকর্মীরা মাত্র একটি হাসপাতালের মৃতের সংখ্যা গণনা করেছিলেন।

তিনি বলেন, “আহমেদাবাদে ১৭১টির বেশি বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়। সেগুলোর সংখ্যা কিন্তু কেউ গুনছে না।”

বিজয়বাংলা/এনএম/১২/৫/২০২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন