নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতায় ‘ঋতু’

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১২, মে, ২০২১, বুধবার
নারীর স্বাস্থ্য সচেতনতায় ‘ঋতু’

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা কঠিন ব্যাপার। বিশেষ করে মেয়েদের পিরিয়ডের ক্ষেত্রে সামাজিক, শারীরিক, মানসিকসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা থাকে। পরিবার, সমাজ কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান; সবাই পিরিয়ডের বিষয়টি এড়িয়ে চলে। এ বিষয়কে ট্যাবু হিসেবে চিন্তা করা হয়। মনে হয়, মেয়েদের পিরিয়ড হওয়াটা লজ্জার বিষয়। পিরিয়ড চলাকালে মেয়েদের স্টু্কলে আসতে দেওয়া হয় না, খেলতে দেওয়া হয় না। পরিবার থেকে আসে বাধা। থাকে নানা ধরনের বিধিনিষেধ। অল্প বয়সী একটা মেয়ের মনে এত ভয়ভীতি তৈরি করা হয়, যা একটা মেয়েকে ছোট থেকেই হীনমন্য করে রাখে।

পিরিয়ড একজন নারীর যেমন স্বাভাবিক ব্যাপার, তেমনি গর্বেরও। এ কারণেই আমাদের প্রজন্মের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। এমনটাই মনে করেন ‘ঋতু’র প্রতিষ্ঠাতা শারমিন কবির। আমাদের দেশের অন্য মেয়েদের মতো শারমিন কবির নিজেও ব্যক্তিজীবনে এ ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অন্তর্মুখী স্বভাবের। এ জন্য সব সময় মানসিক চাপে থাকতেন। এ ব্যাপারটা সব সময় তাকে নাড়া দিত। বড় হয়েছেন কিশোরগঞ্জে। স্টু্কল-কলেজও এখানে। পরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাবিদ্যার ওপর স্নাতক ও টেসলে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। তিনি সব সময় ভাবতেন- পিরিয়ডের মতো স্বাভাবিক বিষয়কে কেন লজ্জা, ভয়ভীতির সঙ্গে নেওয়া হয়। এ চিন্তা থেকেই শুরু করেন গবেষণা। দেখতে পান, শুধু বাংলাদেশ নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক উন্নত দেশেও এই পিরিয়ড বিষয়কে হেয় করে দেখা হয়। ফলে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে তিনি ‘ঋতু’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এ বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে প্রথমদিকে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ শুরু করলেও সন্তুষ্ট ছিলেন না। যেখানে সমাজ বা পরিবার সচেতন নয়, সেখানে একটা মেয়েকে কীভাবে তিনি সচেতন করবেন। আগে পরিবার, সমাজ, বাবা-মা, শিক্ষক, ক্লাসের সহপাঠীদের এ ব্যাপারে সচেতন করতে শুরু করলেন। তিনি মনে করেন, পিরিয়ড ব্যাপারটা যখন সবাই জানবে, তখন একটা মেয়ের মধ্যে লজ্জা ও ভয়ভীতি থাকবে না। তখন সেও মনে করবে- তার সঙ্গে সবাই আছে। সে আর একা নয়। সে জন্য এই সম্প্রদায়কে যুক্ত করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে পিরিয়ড বিষয়ে সেশন নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। টেকসই সম্প্রদায় গড়ে তোলার জন্য প্রতিটা স্টু্কলে একবার না গিয়ে তিনজন মেয়ে, দু’জন ছেলে ও একজন শিক্ষকের সমন্বয়ে ঋতু সাথী তৈরি করেন। সেই সঙ্গে একজন গাইনোকলজিস্টের ব্যবস্থাও করেন। ঋতু সাথী হিসেবে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও জিনিসপত্র পাঠানো হয়। মূল উদ্দেশ্য হলো, পুরো স্টু্কলকে পিরিয়ড ট্যাবুহীন ঘোষণা করা। এ ছাড়া প্রতিটি স্টু্কলে একটি ঋতু হেলথ কর্নার তৈরি করা হয়। সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময়ে এই ঋতু সাথীরা সেখানে বসেন। বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে পিরিয়ড কেন হয়- যাবতীয় বিষয় বিস্তারিত তুলে ধরতে শারমিন ২০১৯ সালে ইএমকে সেন্টারের সহযোগিতায় ‘ঋতু কমিক বই’ নামে একটি বই প্রকাশ করেন। সামাজিক কর্মকাণ্ড কীভাবে বেগবান করা যায়, সে লক্ষ্যে ২০১৮ সালে সুইডেনে অনুষ্ঠিত লিডারশিপ প্রোগ্রামে তিনি অংশগ্রহণ করেন,যেখানে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ২৯ জন তরুণ সংগঠক অংশগ্রহণ করেন। আমাদের দেশে স্যানিটারি ন্যাপকিন তুলনামূলক ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক মেয়ে এখনও কাপড় ব্যবহার করে। এ সমস্যা সমাধানে তিনি বিশেষ ধরনের ঋতু স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে নিয়ে আসেন। করোনাকালে অসচ্ছল ৫০০ মেয়েকে পুরো এক বছরের জন্য ঋতু স্যানিটারি ন্যাপকিন বিতরণ করেন। এই ঋতু স্যানিটারি ন্যাপকিনের একটা বিশেষ গুণ, এটা স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশবান্ধব। সামাজিক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর একুমেন ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন শারমিন। তিনি স্বপ্ন দেখেন পিরিয়ড ফ্রেন্ডলি বাংলাদেশ বিনির্মাণের, যেখানে প্রতিটি মেয়ে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করবে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সচেতন হবে।

বিজয়বাংলা/আশরাফ/১২ মে ২১’

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন