চাঁপাইনবাবগঞ্জে কমিউনিটি সংক্রমণ নাকি ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্ট?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৮, মে, ২০২১, শুক্রবার
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কমিউনিটি সংক্রমণ নাকি ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্ট?

অনলাইন ডেস্ক: বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে কয়েকদিন ধরে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশেষ লকডাউনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ- ভারত সীমান্তবর্তী এই জেলার স্থানীয় প্রশাসন।

এই লকডাউন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে কারণ এটি এমন পরিস্থিতিতে দেয়া হয়েছে যখন ওই জেলায় এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে করোনা সংক্রমণ পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি।

অথচ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অন্যান্য এলাকার মতোই এই জেলাতেও করোনা সংক্রমণ এতো কম ছিলো যে সাধারণ মানুষের মধ্যে এর বিশেষ কোন গুরুত্বই ছিলো না। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবারের ঈদের পর যখন সংক্রমণের হার প্রায় ৭৫ শতাংশে উঠে যায়।

সেখানকার স্কুল শিক্ষক রওনক আরা বলছেন এখন ঘরে ঘরে রোগী এবং পরিস্থিতি নিয়ে অনেকের মতো তিনিও উদ্বিগ্ন।

“মানুষজন তেমন সচেতন ছিলো না প্রথম থেকেই। এখন ঘরে ঘরে করোনা রোগী কিন্তু কেউ বলছে না। বা জানেনা। যারা পরীক্ষা করছে তারা হয়তো জানতে পারছে বা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। যারা বাড়িতে ট্রিটমেন্ট নিচ্ছে তাদের অনেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে অসচেতনভাবে। আর ঈদের সময় বাজার খুলে দেওয়ায়আরো বেশি ছড়িয়ে গেছে,” বলেন তিনি।

কর্তৃপক্ষের হিসেবে বুধবারও ওই জেলায় সংক্রমণের হার ছিলো ৬০ শতাংশের বেশি। বুধবার দেয়া তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ ২৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৫৯ জনের পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে, যে জেলার তিন দিকে ভারতের সাথে সীমান্ত আছে বাংলাদেশের। জেলার পশ্চিমে পদ্মা নদী ও ভারতের মালদহ জেলা, উত্তরেও মালদহ জেলা এবং দক্ষিণে পদ্মা নদী ও মুর্শিদাবাদ জেলা।

আর রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৩১৬ কিলোমিটার দূরের এ জেলায় একটি স্থলবন্দর আছে, যা দিয়ে প্রতিনিয়ত ভারত থেকে পণ্য আসা যাওয়া করে। জেলার সিভিল সার্জন জাহিদ নজরুল ইসলামও বলছেন ঈদের পর থেকেই সেখানে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করে। যদিও তার দাবি লকডাউন শুরুর পর পরিস্থিতি উন্নতি হতে শুরু করেছে।

“ঈদের আগে সংক্রমণ হার ছিলো ৫ থেকে ১০ শতাংশ। ঈদে সারা দেশ থেকে লোকজন এসেছে। এ সময় মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে করোনা আর হবে না । আমরা অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু সফল হতে পারিনি। কিন্তু এখন আশার কথা এই যে সচেতনতা ফিরে আসছে।”

বাস্তবতা হলো লকডাউন ঘোষণার পরেও ধারাবাহিকভাবে ৫০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত এই জেলায়। সরকারি হিসেবে বছরে প্রায় তিন লাখ টন আম উৎপাদন হয় এবং প্রায় দশ হাজার কোটি টাকার আম বেচাকেনা হয় সেখানে। ফলে আমের মৌসুমের আগে থেকেই বাইরে থেকে এ ব্যবসার সাথে যুক্ত বিপুল সংখ্যক মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়, যা এবার শুরু হয়েছে ঈদের আগেই।

আবার তিন দিকে ভারত সীমান্ত হওয়ায় প্রচুর মানুষের যাতায়াত আছে। কিন্তু করোনার সংক্রমণ বাড়ার জন্য কোনটি মূলত দায়ী সেটি কোন ভাবেই পরিষ্কার নয় পর্যাপ্ত গবেষণার অভাবে। বরং সিভিল সার্জন বলছেন তাদের ধারণা কমিউনিটি সংক্রমণের কারণেই এমন অবস্থা তৈরি হয়েছে।

“চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী জেলা, কিন্তু স্পট মার্কিং করে যা দেখছি এগুলো অনেক ভিতরে। বিশেষ করে সংক্রমণ বেশি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, নাচোল, গোমস্তাপুর ও শিবগঞ্জের সদরের অংশ। এগুলো সীমান্ত থেকে অনেক ভেতরে। এটা থেকে বোঝা যায় আমাদের লোকাল সংক্রমণেরই বিস্তার হয়েছে।”

কিন্তু সেখানকার শনাক্তদের নমুনার জিনোম সিকোয়েন্স করে কি পাওয়া গেছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন এগুলো আইইডিসিআর পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখছে। পরীক্ষার ফল এখনো তাদের জানানো হয়নি। যদিও ঢাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে তারা সেখানকার ৪২টি নমুনা পরীক্ষা করে মাত্র একটি ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্ট পেয়েছে। আর বাকীগুলো মূলত দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়্যান্ট।

আইইডিসিআরের পরিচালক তাহমিনা শিরিন অবশ্য বলছেন এগুলো নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা এখনো চলছে। তিনি বলেন এসব ক্ষেত্রে ভ্যারিয়্যান্টকে তারা মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছেন না। কারণ ভাইরাস প্রতিনিয়ত তার চরিত্র বদল করে।

“আমরা দেখছি সংক্রমণ বাড়ছে। কন্টাক্ট ট্রেসিং চলছে। নমুনা নিয়ে এসেছি, কাজ চলছে। মার্চের দিকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছিলো। তখন অন্য জায়গায় কিছুটা হলেও কড়াকড়ি আরোপ বা নমুনা সংগ্রহ ও টেস্টিং হয়েছে সেটা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘাটতি থাকতে পারে। আবার এখন আমের মৌসুম। জনসমাগম বেশি হচ্ছে। এটাও এই পরিস্থিতির কারণ হতে পারে।”

অর্থাৎ নমুনা পরীক্ষায় ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্ট খুব বেশি শনাক্ত না হওয়ায় এটিকে স্থানীয় সংক্রমণ হিসেবেই দেখতে চাইছে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু স্থানীয় সংক্রমণ হলেও সেটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের লাগোয়া দুটি জেলা নওগাঁ ও রাজশাহীতে একই মাত্রায় সংক্রমণ বাড়েনি। অথচ এলাকা দুটির মানুষের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ ছাড়াও চলতি আম মৌসুমে তিন জেলাতেই অতিরিক্ত মানুষের সমাগম ঘটে আম বাণিজ্যের সূত্র ধরে।

নওগাঁর সিভিল সার্জন এ বি এম আবু হানিফ বলছেন সেখানে সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে তবে সেটি নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ার কারণে। তাই সংক্রমণ বৃদ্ধি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন নন।

“নওগাঁর অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ না। তবে স্বাভাবিকের চেয়ে শনাক্ত হার বেশি। যদিও নওগাঁর জন্য এটা সহনীয় কারণ নমুনা কম বলে শনাক্ত হার বেশি। শুরু থেকে গড়ে ১৪ শতাংশ হলেও গত দুই সপ্তাহে শনাক্ত ১৮ শতাংশের মতো। তবে নওগাঁ, রাজশাহী, বগুড়া-এই বেল্টে স্যাম্পলিং কম হওয়ায় আগে থেকেই পজিটিভ রেট বেশি।”

তবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো এই অঞ্চলে হঠাৎ করে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার পর এখান থেকে সংগ্রহ করা নমুনা ঢাকায় আইইডিসিআর পরীক্ষার জন্য নিলেও এখানকার স্বাস্থ্য প্রশাসনকে সেটি এখনো অবহিত করাই হয়নি যে ঠিক কোন কোন ভ্যারিয়্যান্টে এসব এলাকার মানুষ বেশি সংক্রমিত হচ্ছে।

আবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্টকে গুরুত্ব না দেওয়া হলেও বাস্তবতা হচ্ছে ভারতে যারা নিয়মিত বিভিন্ন পন্থায় আসা যাওয়া করেন তাদের আলাদা করে রাখার কোন উদ্যোগ বা ব্যবস্থা ছিলো না।

ফলে কেউ যদি ভাইরাস বহন করে উপসর্গহীন অবস্থায় বাংলাদেশে আসেন তাহলে তাকে চিহ্নিত করারই উপায় ছিলো না। তবে এটিও সত্য যে ভারতে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তাদের সবাই যে ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্টে আক্রান্ত তাও নয়। আর বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই ভারতীয় ছাড়াও যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ আফ্রিকান ভ্যারিয়্যান্টও শনাক্ত হয়েছে।

তবে রোগের প্রকোপ ও মাত্রা বিবেচনায় ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্টকেই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন চিকিৎসক ও গবেষকরা।

যশোরের বেনাপোল স্থল বন্দর দিয়ে সম্প্রতি যারা ভারত থেকে বাংলাদেশের প্রবেশ করেছেন তাদের মধ্যে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ধরণ শনাক্ত বেশ উর্ধ্বমুখী বলে মনে করা হচ্ছে।

দুই সপ্তাহ আগে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্টের অস্তিত্ব বাংলাদেশে প্রথম ধরা পড়েছিল যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোম সেন্টারের সহযোগী পরিচালক অধ্যাপক ইকবাল কবির জাহিদ অবশ্য বেশী উদ্বিগ্ন ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্ট নিয়েই।

“অনেকে উপসর্গহীন অবস্থাতেও আসেন। তাকে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টিনে না রাখা হলে সেটি ছড়াবে। এর আগে হোম কোয়ারেন্টিন করেই বিভিন্ন ধরন বাংলাদেশে ছড়িয়েছে। আমরা এগুলো মনিটর করছি। মঙ্গলবারও তিনটি পজিটিভ পেয়েছি। সিকোয়েন্স করলে হয়তো তিনটি বা দুটি ভারতীয় ধরন পাওয়া যাবে।”

মিস্টার জাহিদ বলছেন ভারতীয় ভ্যারিয়্যন্ট নিয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হলো এর মাধ্যমে রোগটি দ্রুত ছড়ায়। মৃত্যুও বেশি হয়। এবং চিকিৎসাও কাজ করে তুলনামূলক কম। তিনি বলছেন নমুনা পরীক্ষার জন্য এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার সময় চলে এসেছে এবং একই সাথে করোনাভাইরাসের কমিউনিটি ট্রান্সমিশন হচ্ছে কিনা সেজন্য জেনোম সিকোয়েন্সিংও জরুরি হয়ে পড়েছে।

তবে বাংলাদেশে সরকারি পর্যায়ে এখনো ব্যাপকভাবে এটি করা যায়নি। আইইডিসিআর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দিয়ে এটি করাচ্ছে আবার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, যারা যুক্তরাজ্য ভ্যারিয়্যান্ট প্রথমে চিহ্নিত করেছিলো, তাদের কোন নমুনা এখন দেয়াই হচ্ছে না।

এ অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেশি হবার পেছনে ভারতীয় ভ্যারিয়্যান্টের আলাদা কোন ভূমিকা আছে কি-না সেটার জন্য আরও পরীক্ষা নিরীক্ষা দরকার বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। তবে এর মধ্যেই সিলেট, কুমিল্লা, খুলনা, যশোর, দিনাজপুর এবং ঝিনাইদহসহ কয়েকটি সীমান্তবর্তী জেলায় সংক্রমণ কিছুটা বেড়েছে।

দিনাজপুরের সিভিল সার্জন আব্দুল কুদ্দুসও সেখানে সংক্রমণ বাড়ার জন্য হিলি বন্দর দিয়ে আসা যাওয়া করা পরিবহন কর্মীদের যথাযথ ব্যবস্থাপনায় না থাকার দিকেও ইঙ্গিত করেছেন। ওই বন্দর দিয়ে প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ ট্রাক ভারতে যাওয়া-আসা করে।

“জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ দুই শতাংশের নিচে চলে গিয়েছিলো। মার্চে বেড়ে আট শতাংশ হয়। এরপর সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশে উঠেছিলো। আরও পরীক্ষা করতে পারলে হয়তো আরও শনাক্ত হতো। এটাই আইইডিসিআরের নির্দেশনা যে যত পরীক্ষা হবে তত শনাক্ত করা যাবে।”

অথচ বাস্তবতা হলো ১৬ লাখ অধিবাসীর চাঁপাইনবাবগঞ্জে মঙ্গলবার মাত্র ২৭০ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে যার মধ্যে ১৫৯ জনই পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে। এমন কি রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় এই একদিনে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক হাজারের কম।

তাই পর্যাপ্ত নমুনা পরীক্ষার অভাবে উপসর্গহীন ব্যক্তিদের দ্বারা রোগটি আরও ছড়ানোর আশংকাই তৈরি হয়েছে। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন আন্তঃজেলা যোগাযোগে নিয়ন্ত্রণ ছাড়াও লকডাউনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতির আভাস পাচ্ছেন তারা।

বিজয়বাংলা/এনএম/২৮/৫/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন