একটি বাস্তব ঘটনাঃ কওমি মাদ্রাসাকে সংকীর্ণ মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসা উচিত

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৩, জুন, ২০২১, বৃহস্পতিবার
<strong>একটি বাস্তব ঘটনাঃ কওমি মাদ্রাসাকে সংকীর্ণ মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসা উচিত</strong>

আব্দুল্লাহ আল ফারুকঃ দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে বাংলাদেশে ফিরে আসি ২০০৪-০৫ শিক্ষাবছরে।

সে বছর নরসিংদীর একটি শীর্ষ মাদরাসা থেকে মাওলানা নূর হুসাইন কাসেমি রহ. এর কাছে উসতায চেয়ে আবেদন পেশ করা হয়। হুজুর আমাকে বাদ রমাযান সেখানে প্রেরণ করেন। মাদরাসাটি ছিল মরহুম সন্দ্বীপের পীর সাহেব রহিমাহুল্লাহর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান। চমৎকার মাদরাসা। সন্দ্বীপের পীর সাহেব রহিমাহুল্লাহর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিটি মাদরাসা শতভাগ নিয়ম-শৃঙ্খলার সাথে পরিচালনা করতেন।

শুরু হলো আমার নতুন জীবন। শিক্ষকতা জীবনের প্রথম দিনগুলো বেশ ভালোই কাটছিল। কিন্তু এখানে এসে দুটি অবাঞ্ছিত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম আমাকে প্রচণ্ড ধাক্কা দেয়।

১.
এখানে বাংলাভাষাকে অচ্ছুত বানিয়ে রাখা হতো। সকল উসতাযদের দৃষ্টিতে উর্দুই হলো মহান ইলমি ভাষা। বাংলা ভাষায় ‘নূর’ নেই। পরীক্ষার হলে একজন শীর্ষ শিক্ষক প্রতিদিন ঘোষণা করতেন, ‘আমার কিতাবে কেউ যদি বাংলায় উত্তর লেখো, তাহলে ঘোড়ার ডিম পাবে।’

২.
সবাইকে জুব্বা পরতে হবে। কেউ কানিফাড়া পাঞ্জাবি পরতে পারবে না। সেখানে জুব্বা নিয়ে এতোটাই বাড়াবাড়ি করা হতো যে, একবার মাদরাসার মাহফিল উপলক্ষে শিক্ষকগণ পরামর্শে বসেন। আলোচনা হচ্ছিল, মাহফিলে কাকে প্রধান অতিথি হিসেবে দাওয়াত দেওয়া যায়।

তখন মাদানি রহ. এর সুযোগ্য সাহেবযাদা মাওলানা আসআদ মাদানি রহ. বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেটাই ছিল হযরতের শেষ বাংলাদেশ সফর। একজন শিক্ষক হযরতের নাম প্রস্তাব করলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রস্তাব নাকচ করে মাদরাসাটির ভাইস প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালনকারী শাইখুল হাদিস সাহেব বললেন, ‘না, তাঁকে দাওয়াত দেওয়া যাবে না। কারণ, তিনি কানিফাড়া পাঞ্জাবি পরেন। তাঁকে আনা হলে মানুষের আকিদত নষ্ট হয়ে যাবে।’
চিন্তা করুন, প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ শিক্ষকের মানসিকতাও কতটা গলিত ছিল! অথচ সন্দ্বীপের পীর সাহেব সেই আসআদ মাদানি রহ. এরই পিতার খলিফা।

মহান আল্লাহর শোকর, আমি সেই মাদরাসায় দু’ বছর শিক্ষকতা করেছি। এরপর নূর হুসাইন কাসেমি রহ. আমাকে সেখান থেকে তাঁর পরিচালনাধীন জামিয়া সুবহানিয়া মাহমুদনগরে নিয়ে আসেন।

নরসিংদীর সেই মাদরাসার দু’ বছরের শিক্ষকতার জীবনে আমি একটিবারও আমার আদর্শের প্রশ্নে আপোষ করিনি। ছাত্রদেরকে বাংলাচর্চার ওপর ব্যাপক উদ্বুদ্ধ করেছি। নিয়মিত দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। দীর্ঘ দু’ যুগ পুরনো সেই প্রতিষ্ঠানে আমার সম্পাদনাতেই সর্বপ্রথম বার্ষিক স্মরণিকা বের করি।
আর জুব্বা নিয়ে তাদের সেই বাড়াবাড়ি আমাকে এতোটাই সংক্ষুদ্ধ করে তোলে যে, আমি সেখানে যতদিন শিক্ষকতা করেছি, একটিবারের জন্যেও জুব্বা পরিনি। অথচ আগে-পরে আমি পাঞ্জাবির পাশাপাশি জুব্বাও পরতাম। কিন্তু তাদের একরোখা মনোভাবে ফাটল ধরানোর জন্যে আমি সবসময় পাঞ্জাবিই পরতাম।

হ্যাঁ, আমার ছাত্রদের বলতাম, ‘তোমরা যেহেতু ছাত্র হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ড্রেসকোড মানতে বাধ্য, এজন্যে কখনো পাঞ্জাবি পরে মাদরাসায় আসবে না। জুব্বা পরেই ক্লাস করবে। প্রতিষ্ঠানের ছোট থেকে ছোট আইনও অমান্য করবে না। বাকি কখনো যেন তোমাদের মাঝে পোশাককেন্দ্রিক উগ্র মনোভাব সৃষ্টি না হয়, এজন্যে আমি নিয়মিত পাঞ্জাবি পরেই ক্লাস করব। তোমরাও মাদরাসার বাইরের পরিবেশে জুব্বার পাশাপাশি পাঞ্জাবি পরবে।’
..
আসলে পোশাককেন্দ্রিক এই বাড়াবাড়ি মনোভাব আমাদের অনেকের মধ্যেই আছে। মুখে মুখে যত উদারতার কথাই বলুক, তারা সবসময় ভিন্ন পোশাককে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতেই দেখে। তারা নির্দিষ্ট কাটিংয়ের পোশাকের মাঝেই ‘নূর’ ‘তাকওয়া’ খুঁজে পায়। এর বাইরের ইসলামি পোশাককে তারা হিন্দুদের পোশাক বলতে কিবা ভাবতেও দ্বিধা করে না।
পোশাক তো খুবই ছোট্ট একটি উদাহরণ। ইসলামের দেওয়া অনেক রাজপথকে তারা সংকীর্ণ গলিপথে রূপান্তরিত করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করে না।

মহান আল্লাহর শুকরিয়া যে, আমাদের মহান উসতাযগণ আমাদেরকে সবসময় এ ধরনের সংকীর্ণ মনোভাবের উর্ধ্বে অবস্থানের শিক্ষাই দিয়েছেন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন