এইরকম গণবিরোধী অবস্থান নিয়ে ওনারা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে? -মুহাম্মদ সাজ্জাদ

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৭, জুন, ২০২১, সোমবার
<strong>এইরকম গণবিরোধী অবস্থান নিয়ে ওনারা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে? -মুহাম্মদ সাজ্জাদ</strong>

অনলাইন ডেস্কঃ‘আমি তখন ভাবি আর হাসি, হাতে হকিস্টিক, রামদা আর চাপাতি নিয়ে হেটে যাওয়া সহমত ভাইদের দেখলে ওনাদের জঙ্গীদের কথা মনে হয় না, অথচ খালি হাতে শুধু মাথায় পাগড়ী দেখলেই ওনাদের বদহজম হয়ে যায়। আর মুক্তিযুদ্ধ ওনারা একাই করলেন, বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক যে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার হায়দারী হাক দিয়ে বউ-বাচ্চা-ঘরবাড়ি রক্ষায় জান হাতে নিয়ে যুদ্ধে গেল, সেটা আর কিছু না। এইরকম গণবিরোধী অবস্থান নিয়ে ওনারা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে…. … …’
দেখেন, আমি আমার চিন্তার জন্য আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে কমিটেড না। কে আমাকে কি ভাবে বা না ভাবে, আমার কাছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। আমি আমার কাজে সৎ কিনা সেটা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আমি আজকে ক্রমেই ইসলামঘেষা, এর প্রধান কারন এই না যে বাংলাদেশের ইসলামিস্টদের নয়নাভিরাম, হৃদয় গলানো দাওয়াতে গলে গিয়ে আমি ইসলামপ্রেমী হয়েছি। আমি ইসলামকে চিনেছি বাংলাদেশের পচা সেক্যুলারদের বিরোধিতা করতে গিয়ে। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লক্ষ্য করলাম, এরা ভীষনভাবে গণবিরোধী, প্রতিক্রিয়াশীল, সাম্প্রদায়িক, হিংস্র, পশ্চাৎপদ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, অসৎ, জড়বুদ্ধিসম্পন্ন এবং অনৈতিক।

যে ১০টা বিশেষন আমি এদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছি, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ১০টার ৮টাই মোটাদাগে একই বা তার বেশি পরিমানে ইসলামিস্টদের মধ্যে উপস্থিত আছে। কোন ৮টা, তা আমি বলবো না। শুধু ২টা ইন্ডিকেটরে ইসলামিস্টরা তাদের চেয়ে এগিয়ে।

অর্থাৎ, আশা করি আমি বোঝাতে পেরেছি, বাংলাদেশের ইসলামপন্থা নিয়ে আমার কোন ফ্যাসিনেশান নাই। আমি যা বুঝি, সাধারন মানুষেরও নাই। কিন্তু সেক্যুলারদের শঠতা, আমাকে ক্রমেই সেক্যুলারদের বিরোধী করে তুলেছে।

আমি ২০১৩ সালে ছিলাম একজন পাড় কনজুমারিস্ট, আধা সেক্যুলার, সিকি বিএনপি, আধা সিকি তৌহিদী জনতা, আধা সিকি রোম্যান্টিক বিপ্লবে বিশ্বাসী।

আমার আইকন ছিল ব্রাউন কালারের জেমস বন্ড, মাসুদ রানা। আমার সব কিছুতে আমি রানাকে কপি করতে চেষ্টা করতাম।

আমার মধ্যে অনেক ভুল ধারনা ছিল দেশ সম্পর্কে।

যেমনঃ
১)ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা জাতির বিবেক
২)সাংবাদিকরা দেশের জন্য অকুতোভয় হয়ে কাজ করে
৩)টক শোতে যারা কথা বলতে যান তারা দেশপ্রেমিক ও রাজনীতিবিদদের চেয়ে ভাল মানুষ
৪)আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে
৫)হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন
৬)হুজুর মানেই আলকায়েদা বা মিনিমাম তালিবান
৭)জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধকে রিপ্রেজেন্ট করেন
৮)নাস্তিকরা ইসলামবিদ্বেষী না
৯)ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে ধর্ম নিয়ে নিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িকতা

এইসব কথা আমি বিশ্বাস করতাম। ইম্যাজিন, হাউ স্টুপিড আই ওয়াজ!!

তো আমার চোখ খুললো প্রথম থাবা বাবার কাহিনী। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না।

আমার চোখ ভাল করে খুললো যখন দেখলাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা ছাত্রদের পুলিসে দিচ্ছে ছাত্রদল করার কারনে। এক ক্লাসমেট আরেক ক্লাসমেটকে হলের একটা বেডে একা ঘুমাতে শিবির ট্যাগ দিয়ে পিটিয়ে হলছাড়া করছে। আমার চোখ খুললো যখন দেখলাম, দেশের মর মর অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পেটে বোমা মারলেও কিছু বেরোচ্ছে না কিন্তু নিজেদের বেতন-পদমর্যাদার জন্য তারা রাস্তায় নামছেন, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিচ্ছেন।

এরপর আরো চোখ খুললো যখন আমি দেখলাম আমার বন্ধুরা হলের আইডি কার্ড নিবন্ধনের ফি কমানোর দাবীতে আন্দোলন করার ফলে তাদের জেলে পোরা হচ্ছে।

আমি দেখলাম, ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ট্যাগ দিয়ে দেশকে প্রথমে বিরোধীদলশুন্য করা হচ্ছে, এরপর নির্বিচার লুট করে দেশের সমস্তকিছুর চাবি শত্রুরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে।

তো এগুলি আমার চোখের সামনে দেখা।

আরও দেখেছি বিপ্লবের প্রলোভন দেখিয়ে, নারীমুক্তির প্রলোভন দেখিয়ে কোন এক ছাত্রশিক্ষক কেন্দ্রের দোতলায় কিভাবে অবাধ লাগালাগির মোচ্ছব চলে, কিভাবে ছেলেপেলেকে গাজা-ফেন্সি-বাবা ধরানো হয়, কিভাবে টিচার হওয়ার ইদুর দৌড়ে প্রতিদ্বন্দীকে ছিটকে দেয়ার জন্য তার নামে নারী কেলেঙ্কারি-রাজনৈতিক-জঙ্গী সংশ্লিষ্টতার অপবাদ দেয়া হয়।
খুব কাছ থেকে দেখেছি, নারীমুক্তির স্লোগান দেয়া লোকগুলো কিভাবে কারেন্ট জালে জাটকা ধরার মত করে মেয়ে ধরে। দেখেছি দেশে আর্ট-কালচার-মডেলিংয়ের ভাওতা দিয়ে কিভাবে ‘ফুয়াখোর’ কমিউনিটি সুন্দর সুন্দর যুবকদের সাথে পোন্দাপোন্দি করে।

তো এইসব দেখার পর, আমার পক্ষে আর সেক্যুলার থাকা সম্ভব ছিল না। এবং আমার পক্ষে ইসলামিস্ট হয়ে ওঠাও এখনো সেভাবে সম্ভব হয় নাই।

আমার ইসলাম ভাল লাগে, তাই লিখি। সেই ইসলাম এংলো-ইন্ডিয়ান কলোনাইজড ইসলাম না অথবা ওয়েস্টক্সিফাইড-টেইমড ক্যাপিটালিস্ট ইসলামও না, আই ক্যান্ট কানেক্ট উইদ দেম।

ইসলাম আমার ভালোবাসা, সেই ইসলাম, যাকে আমি চিনেছি সীরাত পড়ে। যা ঝরে পড়েছে আমার রাসুল মুস্তাফা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘাম, অশ্রু আর লোহুতে।

আমি দেখি, বৃষ্টি যখন আসমান থেকে পড়ে তখন তা নাস্তিকের জমিতেও পড়ে, মুত্তাকীর জমিতেও পড়ে। আমি এগুলা থেকে শিখি। আবার যখন হক্বের পক্ষে দাড়ানোর প্রয়োজনে ইবনে তাইমিয়া মাহমুদ গাজানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেন, তখন সেখান থেকেও আমি শিখি।

আমি ২০১৬ সালের হোলি আর্টিজানে হওয়া সন্ত্রাসী হামলার পর সিদ্ধান্ত নেই, কালচারালি আমি আর এপলোজেটিক হবো না। আমার অস্তিত্বকে যেখানে একটা ইসেনশিয়াল প্রবলেম আকারে দেখানো হচ্ছে, সেখানে টিকে থাকতে গেলে আমাকে নিজের পরিচয়ে ফিরতেই হবে। আই মাস্ট বিকাম আ রেবেল টু দ্যা কল অফ মডার্নিটি।

তখন থেকেই পাগড়ী পরা শুরু। পরের দেড় বছর পাগড়ী পরে ক্লাস-ক্যাম্পাসে আসার কারনে আমাকে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। যেভাবে ইচ্ছা সেভাবে আমাকে অপমান করার চেষ্টা করা হয়েছে, গায়ে মাখলে মাখতে পারতাম, মাখি নি।

তো আমি আবিষ্কার করলাম, আজকে পাচ বছর পরেও আমার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনেকে আমার পাগড়ী, খোচা খোচা চাপদাড়ি নিয়ে সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেন নাই। আমাকে দেখলে নাকি তাদের জঙ্গীদের কথা মনে পড়ে। এইসব দেখার জন্য নাকি তারা মুক্তিযুদ্ধ করেন নাই।

আমি তখন ভাবি আর হাসি, হাতে হকিস্টিক, রামদা আর চাপাতি নিয়ে হেটে যাওয়া সহমত ভাইদের দেখলে ওনাদের জঙ্গীদের কথা মনে হয় না, অথচ খালি হাতে শুধু মাথায় পাগড়ী দেখলেই ওনাদের বদহজম হয়ে যায়। আর মুক্তিযুদ্ধ ওনারা একাই করলেন, বাংলাদেশের কৃষক-শ্রমিক যে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার হায়দারী হাক দিয়ে বউ-বাচ্চা-ঘরবাড়ি রক্ষায় জান হাতে নিয়ে যুদ্ধে গেল, সেটা আর কিছু না। এইরকম গণবিরোধী অবস্থান নিয়ে ওনারা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন ওনারাই ভাল জানেন।

আমি জানি ওনাদের পেয়ারের কোন না কোন চাটা, যাদের বাপের সোনাদানা ধনদৌলত দুই আড়াই ইঞ্চির বেশি না হওয়ার কারনে মেরুদণ্ডী সন্তানের জন্ম দিতে তিনি সক্ষম হন নাই, সেই চাটারা এই স্ট্যাটাস কপি করে বা স্ক্রিনশট মেরে ওনাদের কাছে পৌছে দেবে।

আপনাদের নিন্দাবাদ আমার রেবেলিয়নকে ঠেকাতে পারবে না। প্রতিবছর বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাগড়ী পরা ছেলের সংখ্যা বাড়বে ইনশা আল্লাহ। আপনারা যখন কালচারালি ডিফিটেড হবেন, তখন আপনারা আইন করে পাগড়ী বন্ধের পথ খুজবেন তা আমি জানি। এগুলো আপনাদের ঐতিহ্য। কিম জং উন-মাও সে তুং-স্ট্যালিন বাবারা এগুলা আপনাদের শিখাইসে।

মানব ইতিহাসের ভয়ংকরতম নরহত্যার উৎসবগুলো সেক্যুলারিজমের কারনে ঘটেছে। সেক্যুলারিজমের দুই ছাও, ক্যাপিটালিজম-কমিউনিজম কেউই এক্ষেত্রে কারো চেয়ে পিছিয়ে নেই।

তো তারা যখন বলে ধার্মিকেরা হিংস্র, উগ্র, পশ্চাৎপদ, অসৎ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, প্রতিক্রিয়াশীল, এটা আসলে তখন আমার কাছে হাসির খোরাকে পরিনত হয়।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন