২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেট নিয়ে ছাত্রশিবিরের প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তাবনা

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৮, জুন, ২০২১, মঙ্গলবার
<strong>২০২১-২২ অর্থ বছরের বাজেট নিয়ে ছাত্রশিবিরের প্রতিক্রিয়া ও প্রস্তাবনা</strong>

শিক্ষায় ভ্যাট বাতিল ও শিক্ষাবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। চলমান বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারিতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ খাতে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু ২০২১-২২ সালের প্রস্তাবিত বাজেটেও শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না রেখে গতানুগতিক বাজেট পেশ করা হয়েছে। তার উপর বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে যা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ও প্রস্তাবনা পেশ করে বিবৃতি প্রদান করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।

এক যৌথ বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী ও সেক্রেটারি জেনারেল রাশেদুল ইসলাম বলেন, বিশ্বব্যাপী চলমান বিপর্যয়ের কারণে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বিশেষভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে সেখানে বাংলাদেশে ২০২১-২২ সালের বাজেট গতানুগতিকভাবেই পেশ করা হয়েছে। আসলে ভোটারবিহীন অনির্বাচিত সরকার কখনো জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারেনা তা ২০২১-২২ সালের বাজেটের মাধ্যমে আবারো প্রমাণ হয়েছে। এ বাজেটে সরকারের চরম অযোগ্যতারও বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। জনগণকে ধোঁকা দিতে সরকার বিশাল ঘাটতির ঋণনির্ভর ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে। এই অবাস্তব ও অতি উচ্চাভিলাষী বাজেটকে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বাজেট বলে অভিহিত করেছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদগণ। কেননা প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি হবে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ঘাটতি। বিশাল অংকের ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে জনগণের ঘাড়ে করের বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। দেশে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র জাতিকে প্রতিনিয়ত দেখতে হচ্ছে। এ দুর্নীতির মাধ্যমে যেমন জনগণের অধিকার হরণ করা হয় তেমনি অগ্রগতির ধারাও ব্যহত হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে পাহাড়সম টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যা দুর্নীতিকে সরাসরি প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল। এ বাজেট জনগণের নয় বরং দলীয় দুর্নীতিবাজদের জনগণের অধিকার হরণের রাস্তা সহজ করে দেওয়ার নামান্তর। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন না ঘটিয়ে ধনীকে আরো ধনী ও গরীবকে আরো গরীব করায় সহায়ক হবে। আর দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের লুটপাটের দরজা খুলে দেওয়া হবে। জনগণের দ্বারা নির্বাচিত না হওয়ায় এই সরকারের বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। এ বাজেট যে রাজনৈতিক, গণবিরোধী ও দুর্নীতি বান্ধব তাতে কোন সন্দেহ নেই।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বাজেটের আকার বড় করলেও এবারও বাজেটে শিক্ষাখাতকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপির অনুপাতে সামান্যই। আর আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী একটি দেশের শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বা বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দকে আদর্শ ধরা হয়। চলমান করোনা বিপর্যয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ছিল শিক্ষাখাতে অনুপাতিক হারে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। কিন্তু এখানেও গতানুগতিক ধারা বজায় রাখা হয়েছে। উল্টো বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। সারাবিশ্বে যেখানে শিক্ষাকে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের দোর গোড়ায় পৌছে দিচ্ছে, সেখানে আমাদের দেশে শিক্ষার উপর ভ্যাট নির্ধারণ করে শিক্ষাকে পণ্য বানানো হয়েছে। এই হটকারী সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়বে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উপর। ফলে তাদের বেতন, ভর্তি ও সেমিস্টার ফি অনেক বৃদ্ধি পাবে। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি বিরাট অংশ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। এই সিদ্ধান্তের ফলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন হুমকির সম্মুখীন হবে। কিন্তু সরকার এসব কথা চিন্তা না করে শিক্ষাকে পণ্য ও ছাত্রদেরকে ক্রেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পণ্যের দাম কমানো হলেও শিক্ষা উপকরণের দাম কমানো হয়নি। প্রয়োজন ক্রমবর্ধমান থাকলেও আলাদা পরীক্ষার হল নির্মাণ ও শিক্ষাখাতে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়নি। আগের মতই প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সুকৌশলে ধর্মীয় শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নে পর্যাপ্ত বাজেট দেওয়া হয়নি। শিক্ষা নিয়ে বড় বড় কথা বললেও তার উন্নয়নে কার্যকর পরিকল্পনা নেই বরং শিক্ষাখাতে বৈষম্যকেই বহাল রাখা হয়েছে। এই বাজেট শিক্ষাখাতে যথাযথ গুরুত্ব প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, শিক্ষা একটি জাতির দর্পণস্বরূপ। দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন অনেকাংশেই শিক্ষাব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত বার বার এ খাতটি উপেক্ষিত হচ্ছে। ইতোমধ্যেই এই গণবিরোধী বাজেট বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ, সংস্থা, দল ও জনগণের পক্ষ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এ বাজেট সংশোধন করতে হবে।

দেশের বৃহত্তম ছাত্রসংগঠন হিসেবে আমাদের প্রস্তাবনা হলো-
১. অবিলম্বে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিশ্চিত করার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২. সকল প্রকার শিক্ষা সামগ্রীর উপর ভ্যাট বাতিল করতে হবে।
৩. মোট বাজেটের কমপক্ষে ২০ শতাংশ এবং জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দ শিক্ষাখাতে দিতে হবে। শিক্ষার উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
৪. শিক্ষাখাতে করোনাভাইরাসের প্রভাব পুনরুদ্ধারের জন্য সুস্পষ্ট কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সকল শিক্ষার্থীদের করোনার টিকা প্রদানের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে।
৫. প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা কেন্দ্রের সাথে করোনা ইউনিট সংযুক্ত করতে বরাদ্দ রাখতে হবে।
৬. করোনাকালীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ছাত্র-শিক্ষক, কর্মচারী-কর্মকর্তাদের যাতায়াতের জন্য নতুন করে যানবাহনের ব্যবস্থাকরণে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।
৭. ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক সংকট এর মত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষাদান পদ্ধতি নির্ধারণ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রণয়নে বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে।
৮. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে।
৯. শিক্ষায় যা বরাদ্দ হবে তার ৬০ শতাংশ শিক্ষা উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে।
১০. শিক্ষাখাতের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষার ক্ষেত্রে বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে।
১১. নতুন জাতীয়করণকৃত ও বিদ্যমান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
১২. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সেই সাথে গবেষণাগুলোকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে।
১৩. শিক্ষাখাতে দুর্নীতি বন্ধ করে বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হবে।
১৪. উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ বাড়িয়ে ছাত্রদের শিক্ষাব্যয় ও উপকরণের দাম কমাতে হবে।
১৫. বিনা মূল্যে সর্বস্তরে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করতে হবে।
১৬. আলাদা পরীক্ষা হল নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখতে হবে।
১৭. বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিকে ডিজিটালাইজড করতে হবে। সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরসহ ইন্টারনেট সংযোগ দিতে হবে।
১৮. দেশের বিরাজমান করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন স্কুল ও কলেজের ক্লাস বন্ধ থাকায়, শিক্ষার গুণগত মানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ ও শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
১৯. শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখি করতে সকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা সঠিকভাবে কার্যকর করতে হবে।
২০. সকল শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য হুইল চেয়ার, ক্রাচ ও হেয়ারিং সুইচ প্রভৃতি সরবরাহ করতে হবে।
২১. মাদরাসা শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে পর্যাপ্ত বরাদ্ধ দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২২. সকল প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে কওমি ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার করোনাকালীন ক্ষতি সারিয়ে উঠার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখতে হবে।
২৩. ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির শিশুদের জন্য বাংলার পাশাপাশি নিজস্ব বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও শিক্ষক নিয়োগ করা জরুরী।
২৪. সর্বোপরি, কাঙ্খিত নাগরিক তৈরির লক্ষ্যে পাঠ্যসূচি, পাঠ্যপুস্তক ও মেধা যাচাই পদ্ধতিসহ সামগ্রীক শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। সেসব নিশ্চিত করার জন্য চাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও যথেষ্ট পরিমাণ বরাদ্দ।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন