টিকা আমদানিতে মধ্যস্বত্ব বিলোপের আহবান

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৯, জুন, ২০২১, বুধবার
টিকা আমদানিতে মধ্যস্বত্ব বিলোপের আহবান

ন্যশনাল ডেস্কঃ বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের টিকা আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের বাইরে কোন বেসরকারি কোম্পানির ভূমিকা রাখার প্রশ্নটি আবার আলোচনায় এসেছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-সমর্থক বুদ্ধিজীবী হিসাবে পরিচিত ১৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক এক যুক্ত বিবৃতিতে টিকা আমদানিতে, তাদের ভাষায়, “অন্য কোন মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা” বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবিও এক বিবৃতিতে বলেছে, কথিত মধ্যস্বত্বভোগীর কারণে এখন টিকা নিয়েই সংকট তৈরি হয়েছে।

তবে স্বাস্থ্য বিভাগ বলেছে, ভারত থেকে টিকা আনার ক্ষেত্রে সরকারের বাইরের কোম্পানির ভুমিকা থাকলেও – সেই অভিজ্ঞতার পর – এখন চীন বা রাশিয়া থেকে টিকা আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সরকার নিজেই সরাসরি আলোচনা চালাচ্ছে।

দেশে করোনাভাইরাসের টিকা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি মহল সক্রিয় হয়ে উঠেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে ১৮ জন নাগরিকের বিবৃতিতে। তারা এ ব্যাপারে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ চেয়েছেন।

তাদের মুল বক্তব্য হচ্ছে, টিকা আমদানির ক্ষেত্রে সরকারের বাইরে বেসরকারি কোন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার বিরুদ্ধে। তারা সেটাকে মধ্যস্বত্বভোগী হিসাবে বর্ণনা করেছেন।

যারা এই বিবৃতি দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন, আবদুল গাফফার চৌধুরী, হাসান আজিজুল হক, রামেন্দু মজুমদার, শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, মফিদুল হক, কামরুল হাসান খান এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফ।

এখন কেন এই বক্তব্য তুলে ধরার প্রয়োজন হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেছেন, সরকারের সাথে সরাসরি চুক্তি না হওয়ায় ভারত থেকে সংকটের সময় চাহিদা অনুযায়ী টিকা পাওয়া যায়নি। সেজন্য এখন অন্য দেশ থেকে টিকার আমদানির ক্ষেত্রে সরকার যেন সতর্ক থাকে, সেটাই তারা বলতে চাইছেন বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

“আমরা এই যে নিকট অতীতে ভারতে মহামারি ভয়াবহ আকার ধারন করার কারণে আমদানির টিকাটা পেলাম না। যেহেতু পাচ্ছি না, সেহেতু সেখানে মধ্যস্বত্বভোগী (বেসরকারি কোম্পানি) কোন রকম ভূমিকা পালন করতে কিন্তু ব্যর্থ হয়।এটা মানবিকতার উর্ধ্বে গিয়ে কিন্তু ব্যবসায়িক স্বার্থ সবার থাকে” বলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ।

“আমাদের কথা হচ্ছে, এটা এতই মানবিক একটা বিপর্যয় যে এখানে যেন মধ্যস্বত্বভোগী কেউ না থাকে।”

মি. ইউসুফ উল্লেখ করেন যে, তারা দেশে টিকা উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে চান।

“আমরা বলছি, মানবিক কারণে টিকার ফর্মূলাটা সারাবিশ্বে সবার কল্যাণে যেন হয়, সেটা আমরা চাই। সে প্রেক্ষাপটে এই টিকা দেশে উৎপাদন করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাকে আমরা সমর্থন করি,” বলেন মি: ইউসুফ।

বাংলাদেশ সরকার, বেসরকারি কোম্পানি বেক্সিমকো এবং ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউটের মধ্যে অ্যাস্ট্রজেনেকার টিকা আনার ব্যাপারে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল।

তিন কোটি ডোজ টিকা কেনার সেই চুক্তি অনুযায়ী বেক্সিমকোর মাধ্যমে প্রতি মাসে ৫০ লাখ ডোজ করে টিকা আসার কথা ছিল।

কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী টিকা এসেছিল ৭০ লাখ ডোজ। এর সাথে ভারত থেকে উপহারের টিকার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ টিকা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছিল।

কিন্তু এক পর্যায়ে ভারত টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়ায় বাংলাদেশ আর টিকা পায়নি। তখন টিকা নিয়ে সংকটের দায় কার-এই প্রশ্নে বেক্সিমকো এবং সরকার থেকে একে অপরকে দোষারোপ করতে দেখা গেছে।

দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা টিআইবি’ নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, টিকা আমদানিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সেই সুযোগ দেয়ার বিষয়টিই নিয়ম অনুযায়ী হয়নি বলে তারা মনে করেন।

“আইন অমান্য করে এবং অস্বচ্ছ্বভাবে তৃতীয় পক্ষকে এখানে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তাদের লাভবান করে দেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। জনগণকে তার বোঝা বইতে হচ্ছে” বলে মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, “এমন একটি পক্ষ ছিল টিকা আনার কাজে, যেখানে একাধিক কর্ণধার রয়েছেন জনপ্রতিনিধি। কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক থাকার কথা নয়।”

বেক্সিমকোর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কোম্পানিটির একজন কর্মকর্তা শুধু এটুকু বলেছেন, টিকা আমদানিতে নিয়ম বা আইনের বাইরে কিছুই হয়নি।

অন্যদিকে টিকার জন্য শুধুমাত্র একটি সোর্সের ওপর নির্ভর করার কারণে টিকার সংকটে পড়তে হয়েছে-এমন সমালোচনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা বলেছেন, “সিরামের সাথে যেটা হয়েছে, সরকার যদি সরাসরি চুক্তি করতো, তাহলে হয়তো এধরনের সংকট হতো না।”

“এখন চায়না বা রাশিয়ার সাথে যে চুক্তি হতে যাচ্ছে, সেটা সরকারের সাথে সরাসরি চুক্তি হওয়া উচিত।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশিদ আলম বলেছেন, “আমরাও মধ্যস্বত্বভোগী চাই না। সেজন্য আমরা বিভিন্ন দেশের সাথে যে কথা বলছি, সেটা আমরা সরাসরি করছি। আমরা কারও মাধ্যমে কথা বলছি না”।

“এখন যে আমরা চীন এবং রাশিয়ার সাথে কথা বলছি, এখানেতো কোন মিডলম্যান নাই। আমরা সরাসরি বলছি। বাংলাদেশের যে রাষ্ট্রদূত ওখানে আছে, সে ওখানে লোকজনের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছে এবং ওখানকার সরকারের সাথে আলোচনা হচ্ছে, জিটুজি আলোচনা হচ্ছে” বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

সিরামের সাথে সরাসরি চুক্তি না হওয়া নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, সে ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরও বলেছেন, “ভারতের যেটা হয়ে গেছে, সেটার ব্যাপারে আমিতো এখন কিছু করতে পারবো না বা বলতেও পারবো না।এখন কতঅ হলো যে ভবিষ্যতেরটা বা সমানে যাতে না হয়, সেই চেষ্টাতেই আমরা আছি।”

কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, রাশিয়ার টিকা দেশে উৎপাদনের জোর তৎপরতা সরকার চালাচ্ছে।

এখন সরকার সরাসরি টিকার আনার চেষ্টা করছে রাশিয়া এবং চীন থেকে।

বিজয়বাংলা/এনএম/৯/৮/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন