বলিউডের ওপর মহামারির বড় ধরণের প্রভাব পড়েছে

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১১, জুন, ২০২১, শুক্রবার
<strong>বলিউডের ওপর মহামারির বড় ধরণের প্রভাব পড়েছে</strong>

ভারতীয় হিন্দি চলচ্চিত্র গত কয়েক বছরে কতোখানি সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছে?

ভারতে জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র শিল্প বলিউড কি গত কয়েক দশকে আরো বেশি প্রগতিশীল হয়ে ওঠেছে?

হ্যাঁ এবং না -এই দুটো উত্তরই পাওয়া গেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিচালিত এক গবেষণা থেকে।

গত ৭০ বছরের শত শত সিনেমা পরীক্ষা করে এই গবেষণাটি চালানো হয়েছে।

দুশো কোটি ডলারেরও বেশি এই চলচ্চিত্র শিল্পে প্রতি বছর শত শত ছবি মুক্তি পায়। ভারতে তো বটেই সারা বিশ্বের ভারতীয়দের মধ্যেও এসব সিনেমার রয়েছে প্রচুর দর্শক।

ভক্তরা সিনেমার তারকাদের গভীরভাবে ভক্তি শ্রদ্ধা করে, তাদের জন্যে প্রার্থনা করে, তাদের জন্য মন্দির নির্মাণ করে, এমনকি তাদের নামে রক্তও দান করে থাকে।

পশ্চাদগামী চিন্তাভাবনার জন্য বলিউডের এসব সিনেমার সমালোচনাও হচ্ছে বহু বছর ধরে- নারীর প্রতি বিদ্বেষ, বর্ণ ও লিঙ্গ বৈষম্য ইত্যাদি কারণে। তবে এসব বিষয়ে বড় ধরনের কোনো গবেষণা হয়নি।

আর একারণেই যুক্তরাষ্ট্রের কারনিগি মেলন ইউনিভার্সিটির কুনাল খাদিলকার এবং আশিকুর খুদাবক্স ১৯৫০ থেকে ২০২০- এই সাত দশকের প্রত্যেকটি দশক থেকে ১০০টি করে ব্যবসা-সফল ছবি বাছাই করে সেগুলোর ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

এই গবেষণায় আরো যারা জড়িত ছিলেন তারা নিজেদের বলিউডের সিনেমার ভক্ত বলে পরিচয় দিয়েছেন। ভাষা বিশ্লেষণ করতে পারে এরকম একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের ভেতরে তারা এসব সিনেমার সাবটাইটেল সরবরাহ করেছেন। এই বিশ্লেষণ থেকে দেখেছেন বলিউডের সিনেমার কখন ও কীভাবে বিবর্তন ঘটেছে।

“সিনেমা সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে এবং মানুষের জীবনের ওপরে এসবের বড় ধরনের প্রভাব পড়ে থাকে। আমাদের গবেষণায় আমরা দেখেছি গত সাত দশকে ভারত কীভাবে বদলে গেছে,”।

বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে তুলনা করার জন্য গবেষকরা হলিউডের আরো ৭০০টি এবং অস্কারের বিদেশি সিনেমা ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পাওয়া আরো ২০০টি ছবি বিশ্লেষণ করে দেখেছেন।

এই গবেষণা থেকে মজার কিছু ফলাফল পাওয়া গেছে- বলিউডের মতো হলিউডের সিনেমাগুলোরও দুর্বলতা রয়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম।

এছাড়াও দেখা গেছে- গত সাত দশকে এই দুটো শিল্পের সিনেমাতে সামাজিক পক্ষপাতও নিয়মিতভাবে হ্রাস পেয়েছে।

“গত ৭০ বছরে আমরা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছি, কিন্তু এখনও আরো অনেক পথ যাওয়ার বাকি,” বলেন মি. খাদিলকার।

গবেষকরা যেসব বিষয়ে জানতে চেয়েছেন তার মধ্যে ছিল – ভারতীয় সমাজে পুত্র সন্তানের প্রতি যে আকাঙ্ক্ষা তাতে কি কোন পরিবর্তন হয়েছে? একই সঙ্গে যৌতুক প্রথাতেও কোনো ধরনের পরিবর্তন এসেছে কিনা!

এবিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে।

“১৯৫০ এবং ৬০ এর দশকে সিনেমাতে যতো শিশুর জন্ম হতো তার ৭৪% ছিল পুত্র সন্তান, কিন্তু ২০০০ সালে এই সংখ্যা ৫৪%-এ নেমে এসেছে। এটা বিশাল পরিবর্তন। তবে এই লিঙ্গ বৈষম্য এখনও রয়ে গেছে,” বলেন মি. খুদাবক্স।

ভারতে পুত্র সন্তানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পেছনে তিনি যৌতুক প্রথাকে দায়ী করেছেন, যদিও ১৯৬১ সালে যৌতুক দেওয়া-নেওয়াকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পরিবারের উদ্যোগে যেসব বিয়ে হয় তাতে কনের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও অর্থ, গহনা কিম্বা উপহার দাবী করা হয়ে থাকে।

ভারতে প্রতি ১০টি বিয়ের মধ্যে নয়টি বিয়েই হয় পরিবারের উদ্যোগে।

এছাড়াও দেখা গেছে যথেষ্ট পরিমাণে যৌতুক না দিতে পারায় প্রতি বছর কয়েক হাজার নারীকে হত্যা করা হয়।

“আমরা যখন এসব বিষয়ে তথ্য খুঁজেছি, আমরা দেখেছি পুরনো দিনের ছবিতে যৌতুকের পাশাপাশি অর্থ, ঋণ, গহনা, ফি, ধার- এসব শব্দও ব্যবহার করা হতো। এসব থেকে এই প্রবণতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক কালের সিনেমাতে সাহস, অস্বীকার – এধরনের শব্দও ব্যবহার করা হয় যার পরিণতিতে বিবাহবিচ্ছেদ, সমস্যা এধরনের শব্দও ব্যবহার করা হয়ে থাকে,” বলেন মি. খুদাবক্স।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে কিছু কিছু পক্ষপাত এখনও সমাজে রয়ে গেছে। সেগুলোতে তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি- যেমন ত্বকের ফর্সা রঙ।

মি. খাদিলকার বিবিসিকে বলেছেন, গবেষকরা যখন শূন্যস্থান পূরণ করার মতো বাক্য ব্যবহার করেছেন, যেমন “একজন সুন্দরী নারীর (শূন্যস্থান) ত্বক থাকতে হবে,” তখন যে শব্দটি উঠে এসেছে তা হচ্ছে ‘ফর্সা’।

হলিউডের সাবটাইটেল থেকেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে, যদিও এধরনের পক্ষপাতের ব্যাপারে খুব একটা কথাবার্তা হয় না।

“গবেষণায় দেখা গেছে বলিউডের সিনেমাতে সবসময়ই সৌন্দর্যের সঙ্গে ফর্সা রঙের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।”

গবেষণায় আরো দেখা গেছে ছবিতে এখনও জাতপাতের বিষয় রয়ে গেছে। সিনেমায় ডাক্তার চরিত্রের নামের পদবী বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে এই নামগুলো উচ্চ-বর্ণের হিন্দুদের।

ছবিতে অন্যান্য ধর্মের লোকজনের প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও ভারতে সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব তাদের জনসংখ্যার হিসেবে বৃদ্ধি পায়নি।

চলচ্চিত্র সমালোচক এবং চলচ্চিত্র সংক্রান্ত বই ‘ফিফটি ফিল্মস দ্যাট চেঞ্জড বলিউড’-এর লেখক শুভ্রা গুপ্তা বলেছেন, “বেশিরভাগ নির্মাতাই উচ্চ বর্ণ, উচ্চবিত্ত শ্রেণি এবং প্রভাবশালী ধর্মের লোকজনের জন্য কাজ করছেন, কারণ তারা একই গ্রুপ থেকে এসেছেন।”

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় মিস গুপ্তা প্রায়শই চলচ্চিত্রে পশ্চাৎপদতা, নারীর প্রতি ঘৃণা এবং পুরুষতান্ত্রিক বিষয়াবলী নিয়ে কলাম লিখে থাকেন। তিনি বলেন, বলিউডের বীর নায়কের নাম অবশ্যই হবে একটি হিন্দু নাম, মুসলিমদের যেভাবে চিত্রিত করা হয় সেটা সীমিত এবং সস্তা ও গতানুগতিক।

ভারতে দর্শকরা পর্দায় জাঁকজমক কিছু দেখতে, গান ও নৃত্যের দৃশ্য উপভোগ করতে সিনেমা দেখতে যান। ফলে চলচ্চিত্র নির্মাতারাও এই পরীক্ষিত কাঠামোর বাইরে যান না।

তিনি বলেন, কখনও সখনও একটি সিনেমা হয়তো পাবেন যা আপনাকে বিস্মিত করবে। তবে বাকি ১০টি ছবিই গতানুগতিক।

তিনি বলেন, “এই শিল্প ঝুঁকি নিতে চায় না। চলচ্চিত্র নির্মাতারা বলেন দর্শকরা যা চায় তারা সেটাই দিচ্ছেন। দর্শকরা তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় কিনা সেটা নিয়েই তারা বেশি উদ্বিগ্ন।”

তবে মিস গুপ্তা বলছেন, করোনাভাইরাস মহামারির সময় যেসব কনটেন্ট ইন্টারনেটে মুক্তি পেয়েছে সেগুলোর জনপ্রিয়তা বিবেচনা করলে “সত্যিকারের পরিবর্তন সম্ভব।”

“মহামারি দেখিয়ে দিয়েছে যে দর্শকরা গতানুগতিকতার বাইরে কিছু দেখতে চায়। আর যখন দর্শকরা বলে আমাদের সেই শক্তি আছে, আমরা ভালো ছবি দেখতে চাই, তখন নির্মাতারাও ভাল চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে বাধ্য হবে। বলিউডকে পরিবর্তন করতে হবে।”

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 4
    Shares