শায়খ আব্দুল মান্নান সাহেব (রহ): তা’মিরুল মিল্লাতের এক নিভৃতচারী শায়খের ইন্তেকাল

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১২, জুন, ২০২১, শনিবার
<strong>শায়খ আব্দুল মান্নান সাহেব (রহ): তা’মিরুল মিল্লাতের এক নিভৃতচারী শায়খের ইন্তেকাল</strong>

লেখক: শায়েখ ড, এম. আব্দুস সারাম
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
কোন কিতাব না পড়িয়েও তিনি আমার শিক্ষক। তিনি ছিলেন তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসার শিক্ষক শায়খ আব্দুল মান্নান রাহিমাহুল্লাহ। আমি এ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছি ১৯৮৫ সালে, সে বছর তিনিও এসেছিলেন মিল্লাত পরিবারে। তাকে দ্বায়িত্ব দেয়া হয় ইয়াতিম খানার সুপার হিসেবে।
আমি ভাবতাম, হয়ত লেখা পড়ায় চেহারার মত দ্যুতি নেই বলেই তাকে ঐ নিম্ন মানের কাজে দেয়া হয়। অথবা ভাবতাম তিনি “নিরাই” মানুষ; দাবি করে কিছু আদায় করতে পারেন না বলেই মনে হয় উপরের দিকে উঠতে পারেন নি।
এক মাগরিবের সালাতে দেখলাম আমার লাইনের সামনে আমার চাচা ডঃ ইয়াহইয়ার রহমান। আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম তাকে দেখে। আমার কল্পনায় ও ছিলো না তিনি আমাকে মিল্লাতে দেখতে আসবেন। সালাতের পরে তার সাথে মিল্লাতের গেইটে ঢুকছি। সাথে শায়খ আব্দুল মান্নান ও চাচার সাথে আড্ডা দিতে দিতে ঢুকছেন। আমি চাচাকে আমার রূমে নিতে চাইলাম। পরে তিনি বুঝালেন তিনি তার বন্ধু শায়খ আব্দুল মান্নানের সাথে একান্তে সময় কাটাতে এসেছেন। আমার সাথে দেখা হয়েছে এটাই আমার সৌভাগ্য। আমি তাজ্জব হলাম, ডঃ ইয়াহইয়ার রহমানের বন্ধু এই “নরম শরম” শায়খ। চাচা পরিচয় করিয়ে দিলেন, এই শায়খ বিসিএস ক্যাডার ছিলেন, ছিলেন কবি নজরুল কলেজের ইসালামি স্ট্যাডীজের শিক্ষক। সেইখান থেকেই তিনি আমার চাচার বন্ধু। চাচা আরো পরিচয় করালেন, এই শায়খ আব্দুল মান্নান সাহেব দাওরাহ পাস, কামিল পাস, বিএ অনার্স ও এম এ পাস। বিসিএস এ খুব ভালো ফলাফল করে তিনি শিক্ষা বিভাগে স্থান করে নেন। চাচা পরিচয় করালেন, এই শায়খ যেমন বাংলা জানেন, তেমন ইংরেজি বলেন, আর আরবি উর্দু তার কাছে নস্যি। আমি মুগ্ধ নয়ানে তার দিকে তাকায়ে থাকলাম, শাদা সিমেটিক স্কীন, সারল্যে ভরা আপল রঙা মুখাবয়ব, কপালে সাজদার চিন, আর মখমলে হাত। হাসলে মুক্তোর সারি, কথা বললে শিশুসুলভ মিষ্টি অথচ ঋজু।
আমি বললাম, উনি আরবি- ইংরেজিতে এতো ভালো? চাচা তার স্বভাব সুলভ হা হা হা সশব্দের হাসি উপহার দিলেন। আমার পিঠে চাপড় দিয়ে বললেন, বেটা, তিনি সাঊদী আরবে মিনিস্ট্রী অফ ডিফেন্সে আরবি ও ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে আমার কলীগ ছিলেন। অনেক বছর আমরা রিয়াদে ছিলাম।
একজন মানুষ এতো এলেমের অধিকারী হয়ে এতো ছোট মাদ্রাসায় এলেন?! আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। তখন মাদ্রাসাটি মাত্র ফাজিল ক্লাস পর্যন্ত ছিলো। তাও আবার ইয়াতিম খানার সুপার হিসেবে! আমার কাছে খুব খটকা লাগতো। কিন্তু আজ বুঝি এই ধরণের বিশ্ব মানের শিক্ষকগণ সে সময়ে মিল্লাতে ছিলো বলেই মিল্লাত আজ বিশ্ববাজারে ঠাঁই করে নিয়েছে।
চাচার ঐদিনের পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর থেকে শায়খ আব্দুল মান্নান সাহেব আমার চাচার মত হয়ে গেলেন। তখনকার সময় মিল্লাতে সাধারণ ছাত্রদের চেয়ে ইয়াতিম খানায় খাওয়া ভালো হতো। যে দিন খুব সুন্দর খানা থাকতো, সেদিন তিনি আমাকে ডাকতেন, বলতেন আমার খাওয়ার অংশ থেকে তুমিও কিছু খাও।
তিনি আমাকে পড়াননি। কিন্তু আমি তার কাছে শিখেছি অনেক। আমি শিখেছি কিভাবে বিপদে হাসতে হয়। কিভাবে কেও অপমান করলে প্রত্যুত্তরে চুপ থেকে অপমানের জবাব দিতে হয়। ইয়াতিমদের মাথায় হাত বুলায়ে কিভাবে তাদের বাবা হতে হয় এবং তাদেরকে ভবিষ্যতের দিকে ধাক্কা দিতে হয়। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন কিভাবে জাতি গঠনে আত্মোৎসর্গ করতে হয়। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির সাথে খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন, এবং দ্বীন কায়িমের পথে অনেক বলিষ্ট ভূমিকা রাখতেন। নানামুখি প্রতিভার তিনি ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ।
একদিন জিগালাম উস্তায, এখানের বেতন দিয়ে দিন চলে আপনার? তিনি বললেন, আমার চাওয়া পাওয়া বেশি না তো, তাই যা পাই তাতে চলে, আরো উদবৃত্ত থাকে। আমি জানতাম তিনি কত সামান্য টাকা পেতেন।
একদিন বললাম, হুজুর, আপনার মত এত বড় শিক্ষিত মানুষকে মিল্লাতে জুনিয়র করে রাখাতে আপনার মন খারাপ লাগেনা? তিনি বললেন, ঐ যে মসজিদটা হচ্ছে দেখতো। কত ভালো ভালো ইটগুলো নিচে, একদম মাটির নিচে বসানো হচ্ছে। যখন এই মসজিদটা কয়েক তলা হয়ে যাবে। কেও কোন দিন নিচের এই ইটগুলো দেখবেও না, স্মরণও করবেনা। অথচ এই ইটগুলোই মসজিদটাকে তখনও সোজা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে। আমরা সেই ইট। ফাউন্ডেশনের ইট। মিল্লাত একদিন অনেক বড় হবে। তোমরা হবে এখানের শিক্ষক। আমাদের এই কুরবানী সে দিন তোমাদের উঁচু করে তুলবে।
উস্তাযের ছেলে মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস ছিলো আমার ছাত্র। তার ছেলে আমার কাছে পড়ে বলে তিনি আমাকে শায়খ ডাকা শুরু করলেন। আমি লজ্জায় ম্রিয়মান হয়ে পড়লে তিনি বলতেন, আমার ছেলের শিক্ষক, কাজেই তুমি আমার কাছে শিক্ষকের মর্যাদার। এত বড় দিলের শিক্ষক জীবনে আমি খুব কম পেয়েছি।
ইয়াতিম খানার টাকা মেরে দেয়ার সুযোগ অনেক অনেক। তাদের যা খাওয়া বরাদ্দ তা থেকে দৈনিক ২ হাজার টাকা মারলে টেরও পাওয়ার কথা না। অথচ মিল্লাতের পাই পয়সাটিও তিনি হিসেবে রাখতেন। হারাম একটা দানা তার পেটে যায়নি। বাচ্চাদের পেটেও দেননি। এ এক অনাবিল এবং অসম্ভব রকমের রৌল মডেল ছিলেন তিনি।
তিনি স্বাস্থ্যগত ভাবে অনেক ভালো ছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষের দিকে এসে খুব অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। কয়েকদিন হাস্পাতালে চিকিৎসারত থাকার পর গতকাল তিনি ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ তাআলা তার ভুলগুলো ক্ষমা করে দিন, এবং জান্নাতুল ফেরদাওসের মেহমান বানিয়ে নিন। তার শোক সন্তপ্ত পরিবারে আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন ও তাদেরকে সবর ইখতিয়ার করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন