ইসলামি দলের আমীর কি খলিফা না দেশের রাস্ট্রপ্রধানের পদমর্যাদার?

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৪, জুন, ২০২১, সোমবার
<strong>ইসলামি দলের আমীর কি খলিফা না দেশের রাস্ট্রপ্রধানের পদমর্যাদার?</strong>

|ফরিদ রেজা|

[ড. আব্দুস সালাম আজাদী ফেইস বুক এবং ইউটিউবে সরব এক দায়ী ইলাল্লাহ।প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি তিনি অধ্যয়ন ও শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে নিজের ইলমকে তাজা রাখতে প্রয়াস পান।
তিনি ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট ফেইসবুকে একটি ছোট্ট স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি ইসলামী ঘরানার মধ্যে প্রচলিত কিছু চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করে কথা রেখেছেন। যারা কুরআন-হাদিস ও ইতিহাস জানেন তারা তাঁর বক্তব্যটি পড়ে দেখতে পারেন।]
_________________________________________________________ ________

ইসলামি দলের আমীর কি খলিফা না দেশের রাস্ট্রপ্রধানের পদমর্যাদার?
**********************************************************************
আমার whatsapp গ্রুপের ক্লাসে এক ভাই প্রশ্ন করলেন, শায়খ, ইসলামি আন্দোলন করি। এই আন্দোলনের যিনি আমীর বা সভাপতি শরীয়াতে তার পদমর্যাদা কি?

আমি ইমাম মালেকের (রা) মত ঘেমে নেয়ে ফেললাম। ইসলামের ইতিহাসের দিকে তাকালাম। খিলাফাতের নেতৃত্বের পরতে পরতে চোখ বুলালাম এবং কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত উলুল আমর বা আমীর, খালিফা বা হাকেম তথা শাসকের পজিশান এর দিকে চোখ রেখে তিনটা সিদ্ধান্তে এলামঃ

১- এরা কেও ইসলামি দেশের আমীর না, খালিফা না, শাসক না, মুসলমানদের সামগ্রিক উলুল আমর না।

২- তাদের হাতে নেয়া বাইয়াত ইসলামি দেশের শাসকের বাইয়াত নয়; তাদের কে মেনে চললে মুসলিম, না মানলে দেশদ্রোহী বা অমুসলিম – এমন নয়।

৩- এদের কোন নির্দেশ অমান্য করলে কবীরা গুনাহ হবেনা, এমনকি এদের কোন নির্দেশ যদি কোন ইসলামি দেশের আইন বিরোধী হয় তা মানা যাবেনা। তবে মুসলিম দেশের ঐ আইনটা যদি শিরক বা কুফরের হয় তা হলে আল্লাহর হুকুমে তা করা যাবেনা, সংগঠনের আমীরের হুকুমে নয়।

এই সিদ্ধান্তে এলাম তার দুইটা কারণ আছেঃ

একঃ একটা মুসলিম দেশের রাস্ট্র ব্যবস্থায় কোন সরকারকে মেনে চলা ফরদ্ব। সেই দেশেই যদি ইসলামী আন্দোলনকে বিকল্প সরকার মনে করা হয়, ও তার আমীরকে খালিফা মনে করে তার দেয়া আদেশ নিষেধ মেনে চলা হয়, তাহলে এক দেশে দুই সরকার থাকা বুঝাবে। যা ইসলাম এ হত্যা যোগ্য অপরাধ।

দুইঃ মুসলিম দেশে যে সরকার আছে, জনগণের উপর তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু যারা ইসলামি আন্দোলন করে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত নেই। কাজেই তাদের দেয়া হুকুম শুধু মাত্র দলের ভেতর ছাড়া কোথাও কার্যকরি হয়না।

কাজেই তাদেরকে শরীয়াত কখনো কর্তৃত্বের দ্বায়িত্ব দেয়না।

আমার বক্তব্যে ছাত্র সংশয়িত হলেন। তিনি বললেনঃ আমাদের আন্দোলনের লিটারেচার গুলোতে বাইয়াতের যে হুকুম লেখা হয়েছে; শ্রবন করা ও আনুগত্য করার যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে; তাতো সব কুরআনের আয়াত ও হাদীস ভর্তি করা দলীল দিয়ে প্রমানিত। ঐ গুলো কি ভুল?

আমি তখন বাইয়াতের হাক্বীকাত, আন্দোলন, সংগঠন ও নেতৃত্বের উপরে বাংলা, উর্দু, আরবী ও ইংলিশে বই গুলোর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

বললামঃ ভাইজান, ঐ বই গুলো একটাও ভুল লেখা না। তবে ঐখানে যে বাইয়াতের কথা বলা হয়েছে, যে শ্রবন করার কথা বলা হয়েছে, যে আনুগত্যের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা আমাদের আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা) রাস্ট্রপ্রধানের ও সরকারের বিভিন্ন দ্বায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য বলে দিয়েছেন। আমি তখন তিনটা উদাহরণ দিলামঃ

সাইয়িদুনা আলী (রা) এর সময় খাওয়ারিজ নামে একটি ইসলামি দলের আবির্ভাব হয়। তারা কুরআন মানতো শক্তভাবে, ইসলামের আরকান আহকাম সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে সুন্দর ভাবে আদায় করতো, চোখ শীতল করা সালাত আদায় করতো তারা। তাদের আমীর ছিলো। কিন্তু খালীফা আলী (রা) তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কারণ ইসলামি দেশে সরকারের অধীনে আরেক সরকার থাকতে পারেনা।

ইসলামী দেশগুলোতে ইসলাহী তথা সংস্কার আন্দোলন বিভিন্ন পর্যায়ে হয়েছে। তারা কেউই এইভাবে আলাদা আমীরের পদ নেন নি। ইমাম গাযযালী তো একাই মুসলিম দেশের শাসকদের অধীনে থেকে তার সংস্কার আন্দোলন করেছেন ও ছাত্র তৈরী করেছেন। তারই ছাত্র ছিলো মুওয়াহহিদ খিলাফাতের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ বিন তাওমার্ত। ইমাম আব্দুল কাদির জিলানী সংঘবদ্ধ আন্দোলন করেছেন, তাও তার নির্দেশ ছিলো স্ব স্ব দেশের সরকারের বিরোধিতা করে না। এমন কি তিনি যখন বায়তুল মাকদিস পুনুরুদ্ধার আন্দোলনের সেনা বাহিনী প্রস্তুত করার নিয়ত করেন, যাদেরকে তিনি মাক্বাদিসাহ নাম দেন, তাদের ও ট্রেইনিং হতো সরকারের আন্ডারে। কাজেই তিনি বাইয়াত, সামা’ ও তা’আতের আয়াত ও হাদীসগুলো নিজের জন্য নেন নি।

ইবনে তাইমিয়্যাহের সময়ে রাস্ট্রপ্রধানরা ইসলাম থেকে অনেক দূরে সরে যায়। তাতারদের হাতে তারা ছিলো পর্যুদস্ত। এমনকি দুষ্ট আলিমদের দিয়ে তারা ছিলো পরিবেষ্টিত। এমন বৈরি পরিবেশে তিনি ইসলামি আন্দোলন ও তাজদীদের কাজ করেছেন। তিনি সংঘবদ্ধ ভাবে দ্বীনের তাজদীদ এর কাজ করেছেন। কুত্রাপিও তিনি বাইয়াত, সামা’ ও তা’আতের আয়াত ও হাদীস গুলো নিজের জন্য নেননি। বরং তিনি নিজেই, যেসব সরকারের জেল খানায় বছরের পর বছর থেকেছেন, তাদের নির্দেশ পালন করেছেন, তাদের আদেশে যুদ্ধ করেছেন তাদেরই কমান্ডে। তিনিই প্রথম মুসলিম স্কলার, যিনি ভেঙে পড়া ইসলামি সম্রাজ্য পুনঃ বিনির্মানের পথ দেখিয়ে সিয়ায়াহ শারইয়্যাহ বা ইসলামি রাজনীতির উপর বই লিখেছেন।

আমার ছাত্র আর তর্কে নামলেন না, তবে তিনি আমার উপর খুশি হলেন না, কারণ পরেক্ষণেই দেখলাম আমার গ্রুপে ২৫৫ জন আছেন, একজন লেফট। আল্লাহ তাকে ভালো রাখুন।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 3
    Shares