চীন: আমেরিকার বাধা ঠেলে নিজেদের তৈরি মহাকাশ স্টেশনে থাকবেন তিন অভিযাত্রী

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৮, জুন, ২০২১, শুক্রবার
<strong>চীন: আমেরিকার বাধা ঠেলে নিজেদের তৈরি মহাকাশ স্টেশনে থাকবেন তিন অভিযাত্রী</strong>

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ পাঁচ বছর পর মহাকাশে আবারো মানুষ পাঠিয়েছে চীন। তবে ঘুরতে-ফিরতে নয়, থাকতে। এক, দুই বা সাতদিনের জন্য নয়, টানা তিন মাসের জন্য।

বৃহস্পতিবার তিন চীনা নভোচারী – নি হাইসেং, লিই বোমিং এবং ট্যাং হংবো – গোবি মরুভূমির একটি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে ভূপৃষ্ঠ থেকে ৩৮০ কিলোমিটার দূরে তৈরি নূতন মহাকাশ স্টেশনে রওনা হন। সাত ঘণ্টা পর তাদের বহনকারী শেনজু-১২ নামের ক্যাপসুল বা মহাকাশ যানটি মহাকাশ কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছে।

স্টেশনের ভেতর ১৭ মিটার লম্বা আর চার মিটার চওড়া সিলিন্ডার আকৃতির কক্ষে- যেটির নাম দেওয়া হয়েছে তিয়ানে – এই তিন নভোচারী থাকবেন, মহাকাশে হাঁটবেন, দেখবেন এবং গবেষণা করবেন।

রওনা হওয়ার সাত ঘণ্টা পর তাদের পৌঁছুনোর খবর আসার পর অভিযান নিয়ন্ত্রণ কক্ষে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষায় থাকা চীনা বিজ্ঞানীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন।

মহাকাশে নতুন একটি স্টেশন তৈরি এবং সেখানে দীর্ঘ সময়ের জন্য মানুষ পাঠানোর ঘটনা মহাকাশে চীনের উত্তরোত্তর ক্ষমতা বৃদ্ধির আরেকটি নিদর্শন।

গত ছ’মাসে মহাকাশে অসামান্য সব বৈজ্ঞানিক সাফল্য দেখিয়েছে চীন। গত বছর ডিসেম্বরে গত প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম চাঁদ থেকে মাটি ও পাথরের নমুনা নিয়ে এসেছে চীনের পাঠানো একটি রোবট-চালিত মহাকাশযান। মঙ্গলগ্রহে ছয়-চাকার একটি রোবট নামাতে পেরেছে চীন যেটি থেকে নিয়মিত নানা ছবি আসছে। দুটো কাজই ছিল খুবই জটিল।

নভোচারীরা মহাকাশ স্টেশনে কি করবেন?
সেনজাও-১২ নভোযানের কম্যান্ডার নি হাইসেং এবং তার দুই সহযোগীর প্রধান কাজ হবে মহাকাশ কেন্দ্রে তৈরি সাড়ে বাইশ টন ওজনের তিয়ানে মডিউলটিকে সচল করা।

নভোযানে ওঠার আগে মি. নি বলেন, “সেখানে গিয়ে আমাদের অনেক কিছু করার পরিকল্পনা রয়েছে… প্রথমে মহাকাশে আমাদের ঘর বাঁধতে হবে। নতুন কিছু প্রযুক্তিকে সচল করতে হবে। এগুলো কঠিন কাজ এবং সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। তবে এই মিশনের লক্ষ্য পূরণ নিয়ে আমরা তিনজনই যথেষ্ট আশাবাদী।“

সিলিন্ডার আকৃতির তিয়ানে মডিউলটি মহাকাশে পাঠানো হয় এপ্রিলে। চীনের নতুন এই মহাকাশ স্টেশনে প্রথম এবং মূল স্থাপনাটি হবে এই মডিউল। পরে আরো দুটি মডিউল যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের।

ফলে, একসময় এটি ৭০ টন ওজনের একটি বড় মহাকাশ স্টেশনের রূপ নেবে যেটি কক্ষপথে ঘুরতে থাকবে।

এখানে থাকার জায়গা ছাড়াও, বিজ্ঞান ল্যাব এবং মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক হাবল-ক্লাস টেলিস্কোপ থাকবে। আগামী দু’বছর ধরে ধাপে ধাপে নতুন নতুন উপকরণ মহাকাশ স্টেশনটিতে যোগ করা হবে। উপকরণের সাথে যাবে নভোচারীদের বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় রসদ। বদল হতে থাকবে নভোচারী, একদল যাবে, একদল ফিরে আসবে।

কারা এই তিন নভোচারী
শেনজাও-১২ নভোযানের যাত্রীদের পরিচয় চীন বুধবার পর্যন্ত গোপন রাখে। মিশনের নেতা নি হাইসেংয়ের বয়স ৫৬। তিনি চীনের সবচেয়ে অভিজ্ঞ নভোচারী। এর আগে দুবার তিনি মহাকাশে গেছেন। ২০১৩ সালে তিয়াংগং-১ মহাকাশ কেন্দ্রে গিয়ে তিনি ১৫ দিন ছিলেন। ঐ মহাকাশ সেশনটি এখন অকেজো এবং পরিত্যক্ত।

মি. নি এর দুই সহযোগী লিউ বোমিং (৫৪) এবং ট্যাং হংবো (৪৫) তারই মতো একসময় চীনা বিমান বাহিনীতে ছিলেন।

দু’হাজার আট সালে চীনা নভোচারীদের যে দলটি মহাকাশে গিয়ে হাঁটাহাঁটি করেছিলেন, সেই দলের সদস্য ছিলেন লিউ বোমিং। ট্যাং হংবো মহাকাশে একেবারে আনকোরা, অনভিজ্ঞ।

আগামী তিনমাসে যে জ্বালানি, খাবার এবং অন্যান্য উপকরণ এই তিন নভোচারীর লাগবে তা গত মাসে রোবট চালিত একটি মহাকাশযানে করে তিয়ানেতে পাঠানো হয়েছে। মহাকাশে হাঁটা চলার জন্য দুটো স্পেস-স্যুট রয়েছে সেই চালানে। রোবট চালিত মালবাহী নভোযানটি তিয়ানের সাথে সেঁটে।

এই তিন নভোচারী সেখানে গিয়ে থিতু হওয়ার পর সেসব মালামাল, রসদ বের করবেন।

মহাকাশ নিয়ে তাদের উচ্চাকাঙ্খা নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন কোনো রাখ-ঢাক করেনি। বহু টাকা তারা মহাকাশ কর্মসূচিতে ঢেলে চলেছে। সাফল্যও আসছে দ্রুত।

মাত্র ১৭ বছর আগে চীন প্রথম মহাকাশে নভোচারী পাঠায়। তারপর এখন পর্যন্ত ১৪ জন চীনা নভোচারী মহাকাশে গেছেন। এই সংখ্যা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকার পরপরই।

দু’হাজার উনিশ সালে তারা চাঁদের এমন প্রত্যন্ত এলাকায় একটি রোভার নামাতে সক্ষম হয়েছে যেখানে আমেরিকা বা রাশিয়া পৌঁছুতে পারেনি।

তারপর, মহাকাশে নতুন এই স্টেশনটিতে তাদের মহাকাশ কর্মসূচিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোজনা হিসাবে দেখা হচ্ছে।

আমেরিকার আপত্তিতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ প্রকল্পে (আইএসএস) জায়গা না পেয়ে চীন নিজেই এককভাবে একটি মহাকাশ স্টেশন বানাতে উদ্যোগী হয়। রাশিয়া, ইউরোপ, জাপান এবং ক্যানাডার সাথে যৌথ ঐ প্রকল্পে চীনের অংশগ্রহণ কোনোভাবেই মানেনি যুক্তরাষ্ট্র।

তাতে আখেরে লাভই হয়েছে চীনের। একা একাই মহাকাশ প্রযুক্তি অসামান্য সাফল্য অর্জন করে ফেলেছে তারা।

চীন অবশ্য এখন বলছে, তদের নতুন এই মহাকাশ কেন্দ্রে অন্য দেশগুলোর অংশগ্রহনের সুযোগ থাকবে। তাদের মহাকাশে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় অন্যরাও অংশীদার হতে পারবে। যেমন, স্টেশনের প্রথম তিন বাসিন্দা ক্যান্সার নিয়ে যে গবেষণা করবেন তার সাথে নরওয়ে সম্পৃক্ত থাকবে।

এছাড়া, স্টেশনের বাইরে যে টেলিস্কোপ দিয়ে মহাকাশের গভীর থেকে নিঃসরিত অতি-বেগুনি রশ্মি পর্যবেক্ষণ করা হবে সেটি তৈরি হয়েছে ভারতে।

পরে অন্য দেশের নাগরিকরাও মহাকাশ স্টেশনে যেতে পারবেন বলে চীন প্রকাশ্যে বলেছে। মহাকাশ প্রযুক্তিতে শুরুর দিকে যে দেশটি চীনকে সহযোগিতা করেছে, সেই রাশিয়া বলছে ভবিষ্যতে তারা তাদের নভোচারীদের চীনা মহাকাশ কেন্দ্রে পাঠাবে।

বুধবার মিশন শুরুর আগে সংবাদ সম্মেলনে চীনা মহাকাশযান প্রকল্পের জি কিমিং বলেন, “আমাদের প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আমরা স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি মহাকাশ কেন্দ্রটির নির্মাণ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার পর অদূর ভবিষ্যতে চীনা নভোচারীদের সাথে বিদেশী নভোচারীও সেখানে উড়ে যাবে।“

চীনা স্টেশনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মহাকাশ স্টেশনটি পুরনো হয়ে গেছে। বছর তিনেক পরে এটির ঠিকমত কাজ করবে কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। এই অবস্থায় সেখানে চীনের নতুন এই স্টেশনটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চীনারা দাবি করে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই কেন্দ্রটির মেয়াদকাল হবে কমপক্ষে ১০ বছর। ধীরে ধীরে এটির আয়তন বাড়ানো হবে যাতে একসাথে অনেক নভোচারী সেখানে থাকতে পারেন।

তাদের মহাকাশ কর্মসূচি চীন খুবই গর্বিত। দরিদ্র একটি দেশ থেকে গত চার দশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে যে অসামান্য সাফল্য চীন দেখিয়েছে তাদের মহাকাশ প্রকল্পকে তারই একটি জ্বলন্ত প্রতীক হিসাবে চীনারা দেখে।

মহাকাশ বিজ্ঞান প্রকল্পে প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

আগামী মাসে চীনা কম্যুনিস্ট পার্টির শত বার্ষিকী। তার ঠিক আগেই নতুন তৈরি এই মহাকাশ কেন্দ্রে মিশন পাঠানো হলো।

চীনের মহাকাশ কর্মসূচির উদ্দেশ্য নিয়ে আমেরিকা সবসময় সন্দিহান। তারা ভং পায় চীন হয়তো মহাকাশে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্পেস পলিসি ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা জন লগসন বলেন, চীন আসলে কারো সাথে টক্কর দিতে মহাকাশ গবেষণা করছে না। বরং নিজেদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা থেকেই চীন এতো কিছু করছে।

যুক্তরাজ্যের রয়্যাল অ্যারোনোটিকেল সোসাইটির ফেলো অধ্যাপক কেইথ হেওয়ার্ডও মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, চীনেরও লক্ষ্য একই। তিনি বলেন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সামর্থ্য জানা দেওয়ার জন্য মহাকাশ প্রকল্প একটি দারুণ উপায়।তাছাড়া, সন্ধান মেলেনি এমন অমূল্য বস্তু বা জ্বালানীর সন্ধান মহাকাশে অনেক দেশের মত চীনও করছে।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন