“জিওপলিটিক্স”: ইসলামপন্থিদের জন্য নতুন টপিক

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১৮, জুন, ২০২১, শুক্রবার
<Strong>“জিওপলিটিক্স”: ইসলামপন্থিদের জন্য নতুন টপিক</Strong>

অনলাইন ডেস্কঃ যুব-তরুণরা শুনতে চায় নতুন কিছু, স্বাভাবিকভাবেই এই টপিক বেশ জমে ওঠেছে। তত্ত্বকথা ও তথ্যের ফুলঝুরি, প্রযুক্তির ব্যবহারে স্মার্টলি উপস্থাপনা এবং ধর্মীয় ভাবাবেগ মিশিয়ে যখন পেশ করা হয় তখন এই বয়ান মুসলিম যুব-তরুণরা অত্যন্ত আগ্রহভরেই লুপে নেয়। সন্দেহ নেই যে, প্রাচীনমনা আলেম-ওলামা যারা কথা বলেন সাধু-চলিত মিশিয়ে, যাদের মুখে উরদু-ফারসির প্রাধান্য থাকে, ইহজাগতিক প্রসঙ্গে তথ্যগত অসংগতিও মাঝে মাঝে লক্ষ্যণীয় হয়; তাঁদের তুলনায় আধুনিক শিক্ষিত, বিশুদ্ধ বাংলাভাষী ও চটচট ইংরেজি বলা লোক যখন ধর্মীয় ভাষণ দেয়, নিশ্চয় নতুনত্বের জন্য তা তরুণ-যুবকদের কাছে আকর্ষণীয়তা লাভ করে।

তবে “জিওপলিটিক্স” বলতে গোটা ইসলামপন্থিরা যা চর্চা করে তার প্রধান তথ্য-উৎস হচ্ছে এক তথাকথিত “ষড়যন্ত্রতত্ত্ব”। খোলাসা করে বললে, “ইহুদি-নাসারার ষড়যন্ত্র”, “ইলুমিনিতি” এবং হালের “বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল” এই কয়েকটা জিনিস। আগে যেটাকে আমাদের হুযুর-আসাতেযা একবাক্যে ইহুকি-নাসারাদের ষড়যন্ত্র আখ্যা দিতেন তা হালে সেটা ইলুমিনিতি ও বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল তত্ত্বে নতুন বেশ-ভূষা পেয়েছে। এরপর এটা আকর্ষণীয়তা পেয়েছে যখন এর সাথে গযওয়ায়ে হিন্দ, পেশগুয়িয়ে শাহ নেমাতুল্লাহ অলী (রহ.), দাজ্জাল ও মাহদীতত্ত্বকে গুলিয়ে দেওয়া হয়। এই “গুলিয়ে ফেলার ধরনটা” অনেকটা সিনেমার কাহিনির মতো; দুনিয়ার বাধা-বিপত্তি ও মসিবত উপেক্ষা করে হিরো হিরোইনকে যেভাবে রক্ষা করে অনেকটা সেভাবেই মাহদীর আগমন ঘটে ইসলামপন্থিদের “জিওপলিটিক্স” চর্চায়।

১৯৯২ সালে বাংলাদেশ টিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমদ নাট্যরচিত “কোথাও কেউ নেই” নাটকে বাকের চরিত্রের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল ১৯৯৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮ ঘটিকায়। সেই ঘটনায় সারা দেশে তুমুল হইচই পড়ে গিয়েছিল। নাটকে নয়, বাস্তবেই “বাকের ভাইয়ের ফাঁসি” রুখতে আন্দোলন হয়েছিল। ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধন নগর-শহরে “বাকের ভাইয়ের ‍মুক্তি চাই” শিরোনামে পোস্টারিং হয়েছিল, মিছিল-মিটিংও নাকি সংঘটিত হয়েছিল। একটা নাট্যচরিত্র যেভাবে সেদিন সারা দেশে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল, তথাকথিত ষড়যন্ত্রতত্ত্বনির্ভর এই “জিওপলিটিক্স”ও অনেকটা সেই ধরনের জনপ্রিয়তা পেতে চলেছে।

মানুষ যখন বিপদগ্রস্ত হয়, অসহায়ত্ব বরণ করে এবং নিরুপায় হয়ে পড়ে তখন সে যেকোনো কিছুই অবলম্বন করে, যেকোনো কিছুই বিশ্বাস করে, যেকোনো পরামর্শই সে গ্রহণ করে। এমন অসহায়ত্বের সময়ই মানুষ ধোঁকাবাজদের প্ররোচণায় মাজারে-দরগাহে সিন্নি মান্নত করে, নজর-নেয়াজ দেয়, বাবা-ভণ্ডদের পায়ে লুটিয়ে পড়ে। মুসলিম উম্মাহর অবস্থাও হয়েছে তাই। দুনিয়ার যাবতীয় শক্তি-সামর্থ্য অমুসলিমদের হাতে, সমর-অর্থ-মিডিয়ায় একটি মুসলিম দেশও আত্মমর্যাদবান নয়, বিশ্বের বিভিন্ন পথে-প্রান্তে মুসলমানরা বৈষম্যের শিকার, তা মোকাবেলা করার মতো একটি সামর্থ্যবান মুসলিম শক্তিও নেই, এর মাঝে মুসলিম দেশসমূহ পরস্পর পরস্পরের শত্রু, এর সঙ্গে আবার মুসলিম শাসকরা নিজেরাই নিপীড়ক; নিজের দেশের জনগণকে শোষণ করে, ইসলামকে কঠোর হস্তে দমন করে। এমন অসহায়ত্বের অবস্থায় যখন শীঘ্রই মাহদীর আগমনের প্রচারণা শুনে তখন তা বিশ্বাস না করার কি কোনো উপায় আছে? মাহদী কেন? যেকোনো গুজব, রটনা ও প্রোপাগাণ্ডাই তো একদম অনায়াসেই হজম করা স্বাভাবিক।

ভারত উপমহাদেশে যখন থেকে ব্রিটিশ হানাদারদের দখলদারিত্ব শুরু হয় সেই তখন থেকেই মাহদীর শুভাগমনের কথা শুনে আসছি। মুসলিম উম্মাহ যখনই পরাজিত হয় সেটা মধ্যএশিয়ায় মোঙ্গল আগ্রাসনের সময় হোক বা ভারতে ব্রিটিশ দখলদারিত্বের সময় হোক নিরুপায় হয়ে মুসলমানরা মাহদীর আগমনের অপেক্ষা করেছে। মুসলমানদের এমন অসহায়ত্বের অবস্থাকে পুঁজি করে অনেক টগ-প্রতারকও নিজেদেরকে মাহদী দাবি করে বসে, সমসাময়িককালে তাদের অনেক অনুসারীও জুটেছে। আর এই মাহদীতত্ত্বকে চাল হিসেবে উলটো মুসলমানদের ওপর ছুড়ে দেয় ধুরন্ধর ব্রিটিশরা, গোলাম আহমদ কাদিয়ানিকে পাঠিয়ে।

বস্তুত ভারতে মুসলমানদের উদ্ধারে মাহদীর আগমন ঘটেনি; হযরত সাইয়েদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের রাজনীতি ও ঐক্যবদ্ধ স্বাধীনতা সংগ্রাম ভারতের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। অন্যদিকে হাকীমুল উম্মত হযরত আশরফ আলী থানবী (রহ.)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ হেকমতে আমলি ও কায়েদে আযম হযরত মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (রহ.)-এর দৃঢ়নেতৃত্বগুণ মুসলমানদের জন্য স্বাধীন আবাসভূমি অর্জন করে দিযেছে। গজওয়ায়ে হিন্দ, মাহদী ও দাজ্জাল সত্য; এসবের মাধ্যমে পৃথিবীর দি অ্যান্ড হবে। মুসলমানদের মুক্তি কি এই দি অ্যান্ডেই, এর পূর্বে মুসলমানদের মুক্তির কিংবা বিশ্বশাসনের কোনো চান্স নেই? দি অ্যান্ডের আলোচনা কেন করছি? বিশ্ববিনির্মাণের চিন্তা করছি না কেন?

মুসলিম যুবকরা দলে দলে ঝুকে পড়ছে মালহামার আলোচনায়, মাহদীর আগমন বিষয়ে লেকচারে, গজওয়ায়ে হিন্দের মন্ত্রণায়। এসবের চেযে মুসলমানদের নিয়োজিত হওয়া উচিত ছিল গণিত শিক্ষায়, বিজ্ঞানচর্চায়, বৈজ্ঞানিক আবিস্কারে, সমরশক্তির উন্নয়নে, জাতি হিসেবে অন্যান্য জাতির মোকাবেলায় শক্তিশালী হওয়ার দিকে। আলিমদের উচিত ছিল, মুসলমানদের ঈমান-আমল ও আখলাক এই তিনটি বিষয়ে বেসিক শিক্ষাদান করে তাদেরকে আধুনিক শিক্ষায় উচ্চশিক্ষিত হতে এবং মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে অবদান রাখতে মুসলমানদেরকে উৎসাহিত করা। আমি ভারতের বিখ্যাত আলেমে দীন ও পীর হযরত মাওলানা সাজ্জাদ নু’মানী (সাহেবজাদায়ে আল্লামা মনজুর নু’মানী রহ.), আমীরে জমিয়ত মাওলানা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী, মাওলানা সাইয়েদ সালমান মনসুরপুরী ও ব্যারিস্টার আকবর উদ্দীন ওয়াইসীকে এ বিষয়ে তাগিদ দিতে এবং বিভিন্ন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে শুনেছি।

তুরস্কের মুসলিমানদের রাজনীতিক পুনর্জাগরণের নেতা ড. নাজমুদ্দীন আরবাকান (রহ.) ইঞ্জিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা ও উন্নত কর্মসংস্থানের অভিজ্ঞতা শেষে জার্মানি থেকে যখন দেশে প্রত্যাবর্তন করেন তখন তিনি দেখতে পেলেন, তুরস্ক হচ্ছে একটি কৃষিনির্ভর দেশ। দেশে তখন পানীয় পাম্পের বেশ প্রয়োজন। যেগুলো আবার বিদেশ থেকে আমদানি হয়, এতে দেশের পয়সা চলে যায় বিদেশে। তিনি চিন্তা করলেন, পাম্পগুলো দেশে তৈরি হলে উপকার হতো দেশের, টাকা বাঁচতো, শিল্পোন্নয়ন হতো। বহু বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে বেদেশি পাম্পগুলোর থেকেও উন্নত, সাশ্রয়ী ও কম মূল্যে পাম্প বাজারজাত করেন। তাঁর একজন পীর ছিলেন, একদিন তিনি তাঁর পীরের দরবারে, পীর সাহেব তাঁকে ডেকে বাইরে নিয়ে গেলেন। দরবারের বাইরে সারি সারি মোটরজানগুলো দেখিয়ে বললেন, এগুলোও তৈরি করো, দেশের লাভ হবে, অর্থ বাঁচবে। তুরস্ক যে আজকে অন্যান্য মুসলিম বিশ্বের তুলনায় বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে কিছু এগিয়ে তার পেছনে ওলামায়ে কেরামেরও অবদান আছে।

মুসলিম বিশ্বকে যদি শক্তিশালী হতে হয়, যদি মুসলিমরা বিশ্বশাসন করতে চায় তাহলে তাদের মাঝে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব, জুজুর ভয় ও গুজব ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে তাদের মধ্যে ইলমের উৎসাহ জাগিয়ে দেওয়া উচিত। জ্ঞান-বিজ্ঞানে মুসলমানদের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ওলামায়ে কেরামের উচিত ধর্মীয়ভাবে প্রচারণা চালানো। ঈমান, আমল ও আখলাকের পাশাপাশি জ্ঞান-বিপ্লবের নসিহত, ওয়াজ ও খুতবা প্রচার করা উচিত। প্রাচীনপন্থি আলেমরা না হয় এ বিষয়ে অসচেতন, কিন্তু আধুনিক শিক্ষিত ইসলামি বক্তাদের অবস্থা কি? তারা কেন দরবেশি, ফকিরি ও ভাগ্যনির্ভর আলোচনা করেন? ভাগ্য পরিবর্তনের আত্মপ্রচেষ্টামূলক প্রচারণা না করে ভাগ্যের ওপর নিজেকে ছেড়ে দেওয়ার বয়ান করেন? বিনির্মাণের কথা না বলে মাহদী আগমনের বার্তা শোনাচ্ছেন?

লেখকঃ সাজিদ চৌধুরী

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 2
    Shares