শত বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা, গবেষণার চেয়ে রাজনীতির প্রাধান্য

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৬, জুন, ২০২১, শনিবার
শত বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: শিক্ষা, গবেষণার চেয়ে রাজনীতির প্রাধান্য

ন্যাশনাল ডেস্কঃ বাংলাদেশে প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ যখন উদযাপন করা হচ্ছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ব্যক্তিস্বার্থ, অনিয়ম এবং ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব বেড়ে যাওয়ার নানা অভিযোগ আবারও আলোচনায় এসেছে।

বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা বা শিক্ষা কার্যক্রমকে হুমকির মুখে ফেলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা এলেই দাপট দেখা যায় রাজনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকার।

কিন্তু শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন বা অভিযোগের পাল্লা অনেক ভারি হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের সিট পেতে দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

একইসাথে শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের বিভিন্ন পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার অভিযোগ আছে।

মুক্ত চিন্তার জায়গা কমে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা করেছিলেন যারা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশে অবনতি কেন
বাংলা ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম-সহ গণতান্ত্রিক বা জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সব আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইতিহাসবিদদের মতে, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও একটা রাজনৈতিক দিক ছিল।

তারা মনে করেন, বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ১৯০৫ সালে পূর্ববাংলা ও আসামকে নিয়ে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন করা হয়েছিল, সেই বঙ্গভঙ্গ বাতিল করার রাজকীয় ক্ষতিপূরণ হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক এবং পরে পাকিস্তানের শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলেন, সেই ঐতিহাসিক কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে আলোচনা করা হলে শিক্ষা বা গবেষণার বিষয়ের তুলনায় রাজনৈতিক ভূমিকাই প্রাধান্য পেয়ে থাকে।

তবে স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চাশ বছরে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব এবং শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি বা ব্যক্তিস্বার্থের নানা অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পরিস্থিতি দিনে দিনে খারাপ হয়েছে এবং সেটাই উদ্বেগের।

আলোচনায় রাজনীতির প্রাধান্য যে কারণে
লেখক ও গবেষক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ব্রিটিশ এবং পরে পাকিস্তান আমলে এই অঞ্চলের মানুষ যে পিছিয়ে ছিল, সেই অসামঞ্জস্য দূর করার ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।

“ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষদিকে। এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ২৭ বছর পর এদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়েছে। তখন এই অঞ্চল পাশ্চাৎপদ ছিল। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে,” বলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান।

পাকিস্তান-বিরোধী এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভূমিকার কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক খান।

“ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রাম, যেটা পরে ঢাকায় পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হলো। তারপর ২৫ বছরের আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে পরিণত হলো।”

“এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে ভূমিকা রেখেছে, সেটা হলো, একদল উচ্চশিক্ষিত মানুষ তৈরি করেছে। তারা ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে ভূমিকা রেখেছেন” বলেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান।

মি. খানের মতে, পশ্চাৎপদ মুসলমানরা বৈষম্যের শিকার হতে থাকে। সেই প্রেক্ষাপটেই জাতীয় সব আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

“বাংলাদেশ ছিল সম্প্রদায় হিসাবে মুসলমান প্রধান। কিন্তু মুসলমানরা ছিল পশ্চাৎপদ শ্রেণি। এখানে অসামঞ্জস্য ছিল। সেটা দূর করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে” বলেন সলিমুল্লাহ খান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা শিরোনামে একটি গবেষণাধর্মী বই লিখেছেন সাংবাদিক এবং গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ।

তিনি তার বইয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, বাংলা ভাষা আন্দোলন এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাকে ঐতিহাসিক বলে বর্ণনা করেছেন।

“বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় সত্ত্বা পরিচিতি অর্জনের পেছনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের ইতিহাস আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্য” বলে লিখেছেন সৈয়দ মকসুদ।

প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরের মধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশ
সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা যারা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাদের তৈরি করেছে ৫০ বছর ধরে।

“একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে তাকে যাঁরা গঠন ও পরিচালনা করবেন, সেই অনাগত শাসকশ্রেণি তৈরির সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।”

তিনি আরও লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষিত এবং সংস্কৃতিমান মধ্যশ্রেণি গড়ে উঠতে থাকে। যে মধ্যশ্রেণির সদস্যরাই জাতীয় জীবনের সবক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে ভূমিকা রাখতে থাকেন। তাঁদের স্বশাসনের আকাঙ্খাই শুধু জাগ্রত হয়নি, স্বশাসিত হওয়ার যোগ্যতাও তারা অর্জন করেন। তাঁরাই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান মনে করেন, বিশ্বে কম বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, যারা কোন দেশের বা জাতির রাজনীতি-সামাজ এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পেরেছে। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য বা বৈশিষ্ট্য আলোচনায় এলেই রাজনীতি প্রাধান্য পায় এবং সেটাকে তিনি ইতিবাচক হিসাবে দেখেন।

তিনি বলেছেন, “১৯৪৮ সালে যখন পাকিস্তানীরা বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলো, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই প্রথম প্রতিবাদ করে। কারণ সেটা শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি ক্ষতির কারণ হতো।”

“তারই ধারাবাহিকতাতেই ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন এবং ধাপ ধাপে এগিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়। এর প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকরা প্রধান ভূমিকায় ছিলেন” বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক রওনক জাহান।

বাংলাদেশের ৫০ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগের ৫০ বছর এবং পরের ৫০ বছর- এই দুই সময়ের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকাকে দুই ভাগে ভাগ করেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ৫০ বছরে বাংলা ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকাকে ঐতিহ্য হিসাবে দেখেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলেন, পশ্চাৎপদ এই সমাজে তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটা দায়িত্ববোধ থেকে জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এসব আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। যেখানে সংকীর্ণ স্বার্থ ছিল না।

কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিতে দলীয় রাজনীতির প্রভাব অব্যাহতভাবে বেড়েছে। তার নেতিবাচক প্রভাবে ব্যক্তি স্বার্থ, স্বজনপ্রীতি বা অনিয়মের বিস্তার ঘটেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

অধ্যাপক রওনক জাহান বলেছেন, “স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি ক্রমশ নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের মধ্যে ঢুকে পড়লো। দলীয় রাজনীতির প্রভাব বেড়ে যাওয়ার কারণে সেটা হলো। এখন তা প্রকট হয়েছে।”

সৈয়দ আবুল মকসুদের লেখায় এসেছে যে, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়, একটি জনপদের মানুষের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন ও উত্থানের ৫০ বছরের ইতিহাস।”

একইসাথে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরের ৫০ বছরের ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিতে ব্যক্তি স্বার্থ এবং দলীয় প্রভাবের সমালোচনা করেছেন।

“বহু শিক্ষক সুবিধাজনক পদ পেতে দলীয় রাজনীতিতে বেশি সময় দেন। ছাত্ররাজনীতির যে ঐতিহ্য ছিল, তা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলো শুধু রাজনীতি করতো না, তা শ্রেণিকক্ষের বাইরে পাঠ্যবহির্ভূত বিচিত্র বিষয়ে অংশ নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করতো শিক্ষার্থীদের। কিন্তু নিয়মিত সেই ছাত্র সংসদের নির্বাচনই হয় না। স্বাধীনতার পর থেকে বহু ছাত্র দলীয় রাজনীতির শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন”, সৈয়দ মকসুদের লেখা থেকে তার এই মন্তব্য নেয়া হয়েছে।

কেন এত অভিযোগের মুখে ঐতিহ্যের রাজনীতি
অধ্যাপক রওনক জাহান বলেছেন, “পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসকরাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিকে দলীয়করণ করার চেষ্টা করেছে। তবে তখন ছাত্রদের মধ্যে লোভ বা ব্যক্তিস্বার্থ সেভাবে ছিল না। ফলে তখন দলীয় রাজনীতি সুবিধা করতে পারেনি।”

“কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে সেই ছাত্র রাজনীতিতে ঢুকে পড়ে লোভ এবং ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থ। সেজন্য ছাত্র রাজনীতিতে দলীয় আনুগত্য নিয়ে টেণ্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং নানা অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ বেড়ে চলেছে” বলে মনে করেন অধ্যাপক রওনক জাহান।

স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের শুরু থেকেই প্রতিটি সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতিকে দলীয়করণ করার চেষ্টা করেছে। সেই দলীয় রাজনীতির প্রভাব গত কয়েক দশকে প্রকট হয়েছে।

তিনি মনে করেন, দলীয় রাজনীতির প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিতে অবক্ষয় হয়েছে।

“ছাত্র রাজনীতিতে আদর্শের বদলে লোভ, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ বড় বিষয় হয়েছে। সেখানে ছাত্রদের অধিকার রক্ষার ইস্যু নেই। সে কারণে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার করে চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ বাড়ছে” বলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষক রাজনীতিতেও দলীয় রাজনীতির প্রভাব দিনে দিনে প্রকট হয়েছে। সেজন্য শিক্ষকদের অনেকের পদ পাওয়ার লোভ, শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ বেড়েছে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে বিশেষ রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ততার বিষয়কে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এমন অভিযোগ বেড়েই চলেছে।

ক্ষমতার প্রভাবের রাজনীতি
বিশ্লেষকদের অনেকে বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশেও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন।

জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

তখন সব ছাত্র সংগঠন ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।

জেনারেল এরশাদের শাসনের পতনের পর আবার গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়।

কিন্তু তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতির ধরণ পাল্টাতে থাকে।

দলীয় রাজনীতির প্রভাবে বিঘ্ন ঘটে ক্যাম্পাসে ছাত্র সংগঠনগুলোর সহাবস্থানে।

এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার।

বিশ্লেষকরা বলেন, সেই রাজনৈতিক সরকারের সময়ে শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতিতে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি সমর্থক সংগঠনের একচ্ছত্র আধিপত্য বা দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো।

১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে।

তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র রাজনীতিতেও যেন ক্ষমতার পালাবদল হয়। ক্যাম্পাসের আধিপত্য চলে যায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত সংগঠনের কাছে।

দেশের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের সহযোগী ছাত্র সংগঠন দু’টোর মধ্যে তিক্ততা বাড়তে থাকে।

এক পর্যায়ে ছাত্র সংগঠন দু’টি ক্যাম্পাসে সহাবস্থান করতে পারে না।

২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপির জয়লাভের ঘোষণা আসতে থাকে যে রাতে, সেই রাতেই ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে হয়।

আবার ছাত্রদলকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত হতে হয় ২০০৯ সালে।

সেই থেকে এক যুগ ধরে আওয়ামী লীগ টানা ক্ষমতায় রয়েছে।

একইসাথে পুরো সময়টিতে ক্যাম্পাসের সব কিছুই আওয়ামী লীগ সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে।

বিএনপির সংগঠন ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভিড়তে পারছে না।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, বড় ছাত্র সংগঠনগুলো যখন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে থাকে, তখন তাদের কাছে ছাত্রদের সমস্যাগুলো বিবেচনায় আসে না। অন্যদিকে মুক্ত চিন্তার বিকাশ হয় না।

সে প্রেক্ষাপটে অন্য যে কোন প্লাটফর্ম থেকে ছাত্রদের অধিকারের দাবি তোলা হলে তাতে সাধারণ ছাত্রদের সমর্থন পায়।

বিশ্লেষকরা এর উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরেন সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ছাত্র আন্দোলনকে। ছাত্রদের সমর্থনে সেই আন্দোলন পরিণতি পেয়েছিল।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, ছাত্র শিক্ষক রাজনীতির অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও ধস নেমেছে।

“যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্জনগুলো সামনে ছিল, তখন একাডেমিক অর্জনগুলোও সামনে ছিল। কিন্তু এখানে যখন রাজনীতির ক্ষেত্রে অবক্ষয় দেখতে পাই, তখন একাডেমিক ক্ষেত্রেও অবক্ষয় অবধারিতভাবে এসেছে” বলেন মি. সেলিম।

তিনি মনে করেন, ছাত্রদের অধিকার নিয়ে ছাত্র রাজনীতি এবং পড়ালেখা-এই দু’টি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই দু’টি ক্ষেত্রেই সংকটে পড়েছে।

বিজয়বাংলা/এনএম/২৬/৬/২১

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 17
    Shares