প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং সংস্কার

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ২৮, জুন, ২০২১, সোমবার
<strong>প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং সংস্কার</strong>

সৈয়দ মবনুঃ

প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার;

পৃথিবীর সব জাতির মধ্যে শিক্ষার সূচনা ও বিস্তার ঘটেছে ধর্মের প্রয়োজনে এবং ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে। বাংলা অঞ্চলে শিক্ষার ইতিহাসেও একথা প্রযোজ্য। বাংলা অঞ্চলে শিক্ষা ব্যবস্থার সূচনা ঐতিহাসিকরা মনে করেন পাল যুগে। তখন সংঘারাম ও বিহার কেন্দ্রীক শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাস পাওয়া যায়। তবে বাংলা অঞ্চলে রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্ঞানচর্চার সূচনা বৌদ্ধ যুগে। বৌদ্ধরা তাদের ধর্মশাস্ত্র পাঠের পাশাপাশি ব্যাকরণ, শব্দবিদ্যা, হেতুবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা, চতুর্বেদ, সাংখ্য, সংগীত, চিত্রকলা, মহাযান শাস্ত্র, যোগশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা প্রভৃতি চর্চা করতেন বলে ঐতিহাসিকেরা উল্লেখ করেন। বিক্রমপুরের প্রখ্যাত জ্ঞানতাপস শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর, যার পদষ্পর্শে তিব্বত ও এর আশপাশের সভ্যাতা গড়ে উঠেছে। অতীশ দীপঙ্করের জীবনী পাঠে জানা যায়, তিনি শৈশবে বিক্রমপুর বিহারে, তারুণ্যে রাজাসন বিহারে পড়াশোনা করেছিলেন। এ থেকেই কেউ কেউ অনুমান করছেন, তৎকালিন সময় ঢাকায় সেই সময় শিক্ষার ধারা প্রতিষ্ঠিত ছিল। অতীশ দীপঙ্কর ছিলেন
পাল শাসনযুগের একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধধর্মপ্রচারক। তাঁর জন্ম ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। সেন যুগে টোল শিক্ষা ব্যবস্থার কথাও ইতিহাসে রয়েছে, তবে এতে শুধু ব্রাহ্মণের সন্তানরা পড়তে পারতো। তের শতকের শুরুর দিকে ধীর ধীরে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। সুলতানি এবং মোগল আমল মিলিয়ে আঠারো শতকের মধ্যবর্তি সময় পর্যন্ত মুসলমানদের শাসনে ছিলো। বাংলায় এই সময় সুলতান, সুবাদার ও সুফিসাধকদের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার বিস্তার ঘটতে থাকে। এই সময় প্রত্যেক মসজিদ মক্তব হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মক্তব ছিলো তৎকালিন প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাদরাসা ছিলো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রত্যেক মুসলমানের ছেলেমেয়েদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা ছিল বাধ্যতামূলক।

ইতিহাসে পাওয়া যায়, বিখ্যাত সাধক শরফউদ্দিন আবু তাওয়ামা চৌদ্দ শতকের শুরুতে ঢাকার কাছে সোনারগাঁওয়ে একটি বিশাল মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৫ শতকের মধ্যভাগে ঢাকায় মুসলিম বসতির বিকাশ ঘটে। এ সময় তৈরিকৃত অন্তত তিনটি মসজিদের প্রমাণ ঢাকায় পাওয়া যায়। প্রথমটি পুরান ঢাকার নারিন্দায়, দ্বিতীয়টি বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের পেছনে গিরিদাকিল্লা অঞ্চলে এবং তৃতীয়টি মিরপুরে শাহআলী বোগদাদীর মাজার সংলগ্ন। অতঃপর মোগলযুগে ঢাকায় অনেক মসজিদ নির্মিত হয়েছে। প্রতিটি মসজিদের সাথে মক্তব থাকা আবশ্যক ছিলো। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় ১৫ শতকে ঢাকায় মক্তব প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। সেই সময়ের মুসলিম শাসকেরা শিক্ষা বিস্তারে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভূমি এবং অর্থ দান করতেন। মধ্যযুগে রাষ্ট্রভাষা ছিল ফারসি। জীবিকা নির্বাহের তাগিদে তখনকার হিন্দু-মুসলমান উভয়ে ফারসি ভাষা শিখতেন। তৎকালিন মাদরাসা-মক্তব্যে অনেক হিন্দু পরিবারের ছেলেরাও লেখাপড়া করতেন। রাজা রামমোহন রায় কিংবা কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমূখের পারিবারের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। (চলবে)

লিখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন
  • 2
    Shares