ছড়া-কবিতা এবং প্রেম-সাহিত্য ইলিয়াস মশহুদ

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ১, জুলাই, ২০২১, বৃহস্পতিবার
<strong>ছড়া-কবিতা এবং প্রেম-সাহিত্য ইলিয়াস মশহুদ</strong>

বিজয় বাংলা অনলাইন | ছড়া ও কবিতা সম্পর্কে যতটুকু জানি, তা হচ্ছে—ছড়ায় ছন্দমিল, অন্ত্যমিল এবং সহজ শব্দে লিখতে হয়; রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছড়ায় যেমনটা দেখতে পাওয়া যায়—
আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে
পার হয়ে যায় গরু, পার হয়ে যায় গাড়ি
দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি।
আর কবিতায় এসবের দরকার নেই। শুধু কবিতার নিয়মগুলো সূক্ষ্মভাবে ফলো করতে হয়, যেমন—
প্রীতি ও প্রেমের পুণ্য বাঁধন যবে মিলি পরস্পরে
স্বর্গ আসিয়া দাঁড়ায় তখন আমার জীবনের অন্দরে।
সময়ের খ্যাতিমান এক কবির সান্নিধ্যে কিছু সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছিল। তিনি একজন জাত-লেখক। কবিতাই তাঁর লেখার প্রাণ। বারকয়েক চেষ্টা করেছি, ছড়া-কবিতার ধাঁচে কিছু লেখতে। এক-দুটি আনাড়ি টাইপ ছড়া লিখে তাঁকে দেখিয়েছি। হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে ফেলার মতো তিনি সাতপাঁচ না ভেবে ‘হয়নি’ বলে দিয়েছেন। সেই থেকে সাহিত্যের প্রাণখ্যাত ছড়া-কবিতার এই জগতে আর কদম ফেলিনি। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি বলা যায়। তবু মাঝে মাঝে চেষ্টা করেছি; কিন্তু হয়নি। কারণ, এই শাখায় আমার পাঠস্বল্পতা।
ছড়া এবং কবিতা—দুটি বিষয়। ছড়ায় থাকে রস, তবে সেটা খুব প্রভাবশালী কোনো উপকরণ নয়। আর কবিতা; এ তো সমাজবিপ্লবের অন্যতম এক মাধ্যম। আমরা জানি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বিপ্লবী কিছু ‘কবিতা’ এ দেশের এক সরকারপতনে বেশ মূখ্য ভূমিকা রেখেছিল। এ ছাড়া যুগে যুগে আন্দোলন-সংগ্রামে মাঠযোদ্ধাদের পাশাপাশি কলমযোদ্ধাদের ভূমিকাও ছিল অনস্বীকার্য। এতে কবিতার আবেদন মোটেও কম নয়।
কবিতা—সাহিত্যের কঠিন একটি শাখা। কবিতারও আবার রকমফের আছে। কবিতা লিখতে গেলে অনেক কিছু জানা থাকতে হয়। ভাষা, বানান, ব্যাকরণের পাশাপাশি কবিতার জন্য আলাদা কিছু নিয়ম-নীতিরও ইলম থাকতে হয়। গদ্য কতিবা, পদ্য কবিতা, সনেট…সহ আরও কী কী! সবমিলিয়ে কবিতা-শিল্প আমার কাছে কঠিন একটি সাহিত্যশাখা মনে হয়।
এ ছাড়া কবিতা লেখা বা কবি হতে হলে মনে ‘প্রেম’ ভাব থাকতে হয়। আমি কবিতাকে প্রেম-সাহিত্যও বলি। কারণ, এককালের চিঠি-সাহিত্যের যুগে প্রেমশিল্পে সফলতার অন্যতম মানদণ্ড ছিলো ছাড়া-কবিতায় প্রেমভাব বা প্রেমের আবেদনরস ফুটিয়ে তোলা। সময়ের আবর্তে এখন সেটা ফেসবুক ম্যাসেঞ্জাস, হোয়াটস অ্যাপ, ইমু, ভাইভারের চ্যাটে এসে ঠেকেছে। তবে সেই চিঠিযুগের মান ও রস এখনকার চ্যাটযুগে প্রায় অনুপস্থিত বলা যায়।
বলা হতো, ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকারা একসময় কবি হয়ে ওঠে। স্বচ্ছ কবিতা উৎপাদনে চরম সুখ বা দিলভাঙা দুঃখ থাকতে হয়। কারণ, একটি কবিতা অব্যক্ত যন্ত্রণার শাব্দিক প্রকাশ। শব্দের ছদ্মাবরণে নিগূঢ় তাৎপর্যপূর্ণ জটিল-কঠিন শব্দমাল্যের গাঁথুনিতে ফুটিয়ে তোলা কিছু সংক্ষিপ্ত বাক্যমালাকে আমি কবিতা মনে করি। কারণ, কিছু কবিতা এমন আছে—গদ্য কবিতা—যেগুলো মূলত কবি এবং উদ্দীষ্ট ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ এর মর্ম বোঝেন না। সামসময়িক অন্য কবিগণও এসব কবিতার দুর্ভেদ্যতা বা মর্মোদ্ধারে কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বলেন—‘কবি এই পংক্তি দ্বারা ‘হয়তো’ এটাই বুঝিয়েছেন বা ‘এমন হতে পারে’। সে হিসেবে ‘ছড়া’ লেখা বেশ সহজবোধ্য। তবে আমি এসবের কিছুই পারি না। চেষ্টা করবো—আল্লাহ তাওফিকদাতা।
2015 সালে আমি বিয়ে করি। এ উপলক্ষে আমার কয়েকজন বন্ধুবান্ধব, সহপাঠী মিলে একটি স্মারক বের করে—‘পালকি’ নামে। সেখােন আমি আমার জীবনসঙ্গীনীকে নিয়ে কয়েক লাইনে হৃদয়ের কিছু ভাববিনিময় করি। এটা কী হয়েছে, সেটা আমি নিজেই জানি না। তবে আমার নিজের কাছে বেশ ভালো লেগেছে। কারণ, এই শব্দগুলোয় আমার মনের ‘ভাব’ ফুঠে ওঠেছে। সুতরাং কবি না হয়েও, কবিতাজ্ঞান না থাকলেও এতে যেহেতু আমার মনের ভাব পরিস্ফূট হয়েছে, এ জন্য এই লাইন কয়টিকে আমি ‘কবিতা’র স্বীকৃতি দিয়েছি। সম্ভবত কবিতা লেখার এটাই আমার শেষ প্রয়াস ছিলো। এর পর আর কখনো এমন কিছু লেখার চেষ্টা করিনি। তবে ছড়া লেখার চেষ্টা করেছি; কিন্তু হয়নি। সেই ভালোবাসার চারণগুলো হচ্ছে—
নিঃস্বার্থ ভালোবাসায়, অন্য রকম ভালো লাগায়
সময়ের গতিপথে যুক্ত হলো নতুন পালকি!
হালের হাওয়ায় পাল ছেড়ে চলছে জীবন তরী—
কে যাত্রী, কে মাঝি?
খুশবু-বদনে সিক্তরা শক্ত হয়ে পোক্ত হচ্ছে
পাপের সাগরে সাঁতরাবার আগে
পবিত্রতার নদীতে স্নান করা—সে এক সৌভাগ্য!
সীমাহীন অপেক্ষার প্রতিফল।
ধৈর্যের প্রতিফলে ফলিত হবে মুক্তেদানার মতো পুষ্পকণা
কণাগুলো বড় হবে, নড়ে ওঠবে
দুলে ওঠবে, কেঁপে ওঠবে, জেগে ওঠবে
দ্যুলোক ভেদিয়া আঁধার রাজ্য জয় করবে!
পুষ্পিত আত্মার চৌপায়া মমতার মোহনায়
মোহিত হবে, স্নিগ্ধ হবে, বৃষ্টি হবে
জোসনা রাতে একপশলা আবেগের বিজয়োল্লাস হবে।
জয় হোক, তবে তা-ই হোক।
দু’হাজার ৮-৯ সাল। তখন আমি ছাত্র। মোটামুটি উপরের ক্লাসে পড়ি। তারও বছর দুয়েক আগ থেকে রোজচনামচা লেখা ও টুকটাক প্রবন্ধ লেখার চেষ্টা করছি। তখন একবার মনে হলো, কবিতা লেখি। কয়েকবার চেষ্টা করলাম, সহপাঠীদের অনেকেই তখন কবিতা লেখে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে তখন ‘লেখালেখি’তে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। পত্রিকা-ম্যাগাজিন পড়তে দেখলে তো নির্ঘাত শাস্তির মুখোমুখি! তবু গোপনে, লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম, লেখতাম। এমনকি, আমাদের একজন উস্তাজের উৎসাহে আমরা ক্লাসভিত্তিক একটা হাতের লেখা ম্যাগাজিন প্রতি মাসে বের করতাম। এর পর সেটা ফটোস্ট্যাট করে কয়েক কপি বানিয়ে রুটিন করে ক্লাসের সবাই পড়তাম। যদিও কয়েক মাসের মাথায় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হলে এটা থেকে আমাদের নিবৃত্ত করে রাখা হয়।
ক্লাস ম্যাগাজিন যখন বন্ধ হয়ে গেল, তখন বিভিন্ন মাসিক পত্রিকা-ম্যাগাজিনে লেখা পাঠাতে শুরু করি। কখনো কখনো ছাপাও হতে থাকে। তো, একবার নিয়ত কলাম—আমি কবিতা লিখব। কিন্তু কবিতার ধারাপাত যে আমার জানা নেই। এখন তাহলে কী করা! বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বানান অভিধান সামনে আনলাম। এবার স্বাভাবিক শব্দে কয়েকটি ছোট ছোট লাইনে ফিট করলাম—দূর থেকে তাকালে অবিকল কবিতার মতো মনে হয়! এরপর সেখান থেকে সহজ শব্দগুলোর আভিধানিক কাঠিন্যতা নিয়ে আসি। অভিধান খোঁজে খোঁজে সহজ শব্দগুলো যখন দুর্ভেদ্য শব্দে রূপান্তর হলো, তখন নতুন একটি কাগজে লিখে পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিই। কিন্তু না, পত্রিকা কর্তৃপক্ষ এটি গ্রহণ করেনি। পরের মাসে মাথায় একটি কুবুদ্ধি খেলে গেল—হুবহু সেই কবিতাটি অজানা এক মহিলা শিক্ষার্থীর নামে একটি আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকা অফিসে পাঠিয়ে দিই। এবার মাস গড়ায়নি, দুদিন পরেই সেই পত্রিকার সাহিত্য পাতায় চমৎকার অঙ্গসজ্জায় কবিতাটি ছাপা হয়ে আসে! আমার সহপাঠীদের যখন পত্রিকার কপিসহ সংবাদটি জানাই, তখন সবাই মিলে কতক্ষণ যে অট্টহাসিতে মেতে ছিলাম…। এরপর থেকে মনে হলো, পুরুষ বলতেই নারীর প্রতি দুর্বল। কবিতা লেখার আগ্রহ সেই থেকে নিজের মনে দাফন করেছি।

eliasmoshud71@gmail.com

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন