রক্ত দিয়ে সুরা ফাতিহা লেখা, ফাতাওয়ায়ে শামি থ্রি ইন ওয়ান এবং অন্ধের হস্তি দর্শন

বিজয়বাংলা ডেস্ক
প্রকাশিত ৩, জুলাই, ২০২১, শনিবার
রক্ত দিয়ে সুরা ফাতিহা লেখা, ফাতাওয়ায়ে শামি থ্রি ইন ওয়ান এবং অন্ধের হস্তি দর্শন

রশীদ জামীল।।
হানাফি মাজহাবের সবচে নির্ভরযোগ্য ফতওয়ার কিতাব হলো ফাতাওয়ায়ে শামি। ফাতাওয়ায়ে শামি মূলত থ্রি ইন ওয়ান। মূল কিতাবের নাম তানবিরুল আবসার। তানবিরুল আবসারের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আদ-দুররুল মুখতার। দুররুল মুখতারের টীকাগ্রন্থের নাম রদ্দুল মুহতার, যাকে ফাতাওয়ায়ে শামি বলা হয় আবার হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদিনও বলা হয়। কেউ মুফতি হয়ে গেছেন অথচ ফাতাওয়ায়ে শামি এ টু জি গবেষণা করেননি; হতেই পারে না।

শামিতে বর্ণিত একটি মাসআলাকে নিয়ে গায়রে মুকাল্লিদরা এতো বেশি লাফালাফি করে যে, তাদের হাবভাব প্রমাণ করে, ‘এই পাইছি! এখন দেখি কই যায়!’ নাগাল পায় না কলাগাছের মাথা, তালগাছের মাথা নিয়ে মাথা ঘামায়। সারাবিশ্বের উলামায়ে কেরামের কাছে যে কিতাব গ্রহণযোগ্যতা আদায় করে নিয়েছে, সেই কিতাবে ভুল ধরার চেষ্টা করে বেকুবের দল।

তারা বলে, ‘শামিতে বলা হয়েছে, পেশাব অথবা রক্ত দিয়ে সুরায়ে ফাতেহা লেখা জায়েজ। কত গান্ধা হানাফিদের মানসিকতা। সুরায়ে ফাতেহাকে পেশাব দিয়ে লেখাকে তারা জায়েজ ফতওয়া দেয়’!

অথচ, হানাফি মাজহাব মতে বিনা অজুতে কুরআন শরিফ স্পর্শ করাই জায়েজ নেই। এ কথা খোদ শামিতেই বলা হয়েছে। এছাড়া ফিক্বহে হানাফির মে’ইয়ারি সকল কিতাবেই এ কথা বলা আছে। বাদায়েউস সানায়ের ইবারত হলো এমন,
ولا… من مس المصحف بدون غلافه
(অজু ছাড়া) ‘বিনা গিলাফে কুরআনে কারিম স্পর্শ করাই জায়েজ নেই’। (১/১৪৯)

যেখানে বিনা অজুতে কুরআন ছোঁয়াই নাজায়েজ বলা হচ্ছে, সেখানে পেশাব দ্বারা কুরআনের সবচে মৌলিক সুরাটি লেখা কেমন করে জায়েজ বলা হতে পারে!

আসলে সমস্যা হলো লা-মাজহাবিদের নেটওয়ার্কে। এরা ইন্টারনেটে কিতাব পড়ে, ইউটিউবে ওয়াজ শুনে। ইন্টারনেট হলো একটি অন্যরকম জগত, যেখানে বক্তব্য কাটছাঁট করার সুযোগ থাকে। কিতাব থেকে সুবিধামত অংশ আপলোড বা কোট করা যায়। ফলে সাধারণ মুসলমানকে বিভ্রান্ত করা যায় সহজেই।

অভিযোগকারীদের জবাব দেওয়ার আগে শামির আপত্তিকর (!) বক্তব্যটি সামনে আনি। ফাতওয়ায়ে শামি (১/২১০)’র হুবহু ইবারত হলো এমন,

لو رعف فكتب الفاتحة بالدم على جبهته وأنفه جاز للاستشفاء ، وبالبول أيضا إن علم فيه شفاء لا بأس به ، لكن لم ينقل

এখানে শামি কী বলছে আর লা-মাজহাবিগণ কী বুঝলো! বোঝার ক্ষমতা নেই তাদের, আর পাল্টা অভিযোগ করে শামির উপর। শামিতে আলোচনা চলছিল হারাম কিছু দিয়ে চিকিৎসা গ্রহণ জায়েজ কি না। ইমাম হাসকফি এই অধ্যায়ের শিরোনামই দিয়েছিলেন,
اختلف في التداوي بالمحرم وظاهر المذهب المنع
হারাম বস্তু দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ কি না-সেব্যাপারে ইখতিলাফ। আর শিরোনামেই وظاهر المذهب المنع বা হানাফি মাজহাবের ফতওয়া হলো অবৈধতার উপর’ বলে প্রথমেই ক্লিয়ার করে দেওয়া হয়েছিল হারাম কিছু দ্বারা চিকিৎসা নেওয়া জায়েজ নেই। সাথে নবীজির একটি হাদিসও নিয়ে এসেছেন এর স্বপক্ষে দলিল হিশেবে,
إن الله لم يجعل شفاءكم فيما حرم عليكم.
‘আল্লাহপাক হারাম বস্তুতে তোমাদের জন্য চিকিৎসা রাখেননি।’ (বুখারি-ফাতহুল বারি, ১০/৭৪,

উপরে বর্ণিত শামির ইবারতটুকুর তরজমা করতে গিয়ে আহাফিরা বলে, শামিতে বলা হচ্ছে, কারও যদি নাক দিয়ে ‘রক্তপড়া’ বেমার হয়ে যায়, আর জানতে পারে রক্ত অথবা পেশাব দিয়ে নাক অথবা কপালে সুরায়ে ফাতেহা লিখেলে শিফা মিলবে, তাহলে চিকিৎসার জন্য এমনটা করা জায়েজ আছে’। নবীজি যেখানে পরিষ্কার শব্দে বলে দিচ্ছেন ‘আল্লাহপাক হারাম বস্তুতে চিকিৎসা রাখেননি’ সেখানে হারাম দ্বারা চিকিৎসার বৈধতা কেমন করে দেওয়া জায়েজ হতে পারে? এটা তো সরাসরি হাদিসের বিপরীত।’

আসলে #_গায়কা_মুকাল্লিদগণের এসব প্রশ্নের মূল হলো ইলমি দুনিয়ায় তাদের অজ্ঞতা। তারা জানে না তা’আরুজ বা বৈপরিত্যের হুকুম লাগানোর জন্য শর্ত আছে ৮টি। উলামায়ে মানতিক লিখেছেন, তা’আরুজের জন্য আটটি ব্যাপার জানা জরুরি।
در تناقص هشت وحدت شرط دان
وحدت موضوع و محمول و مکان
وحدت شرط و اضافه ، جزء و کل
قوه و فعل است ، در آخر زمان
(শারহুত তাহজিব, পৃ- ১৪৩। আশানায়ি বাউলুমে ইসলামি ১/৭৮)

হাদিসেপাকে হারাম বলা হয়েছে হালতে এখতিয়ারের কথা বিবেচনায় আর ফিক্বহে হানাফিতে বৈধতার গুঞ্জায়িশ রাখা হয়েছে হালতে ইযতেরারে। হালতে এখতিয়ার মানে স্বাভাবিক অবস্থা। ইযতেরার মানে অপারগতা তথা যখন আর কোনো বিকল্প থাকে না। তাহলে বৈপরিত্য কোথায়!

কারও মনে যদি এই প্রশ্ন আসে, খামাখা এমন মাসআলা বর্ণনা করার দরকার কী ছিল! তাহলে আপনি একটু অপেক্ষা করুন। জবাব পাওয়া যাবে আলোচনার শেষ অংশে।

#_শামিতে_বর্ণিত_মূল_মাসআলা
‘চিকিৎসার জন্য কি রক্ত অথবা পেশাব দিয়ে সুরায়ে ফাতিহা লেখা যাবে’—এই সমস্যার সমাধান দিতে গিয়ে শামিতে বলা হচ্ছে, কারও যদি নাসা ফেটে যায় এবং নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে, আর কোনও কবিরাজ যদি তাকে বলে, রক্ত অথবা পেশাব দিয়ে সুরায়ে ফাতেহা লিখলে সুস্থ হয়ে যাওয়া যাবে—তবুও তেমনটি করা বৈধ হবে না। শামিতে ফতওয়া দেওয়া হচ্ছে নাজায়েজের, আর তারা বলে শামি জায়েজ বলেছে! পাগলামি আর কারে কয়!

যারা একটু আধটু আরবি জানেন, তারা ভাবছেন মূল ইবারতে তো পরিষ্কার ভাষায় লেখা দেখছি, جاز للاستشفاء মানে চিকিৎসার জন্য জায়েজ আছে। তাহলে শামিতে নাজায়েজ বলা হলো কোথায়?

আসলে শামির মতো একটি উচ্চাঙ্গ কিতাবের ইবারত আহাফি তাদের অনু পণ্ডিতদের ঘিলুতে ঢুকার কথাও না। শামি তো আর প্রাইমারি লেভেলের তালিমুল ইসলাম বই না যে, বাচ্চাদের উপযোগী শব্দে প্রশ্নোত্তর আকারে মাসআলা বলা থাকবে।

ইমাম ইবনে আবেদিন ‘শামি’ লিখেছেন আহলে ইলমের জন্য, কটাই মিয়া আর মজর আলিদের জন্য নয়। তাই তাঁর শব্দচয়ন এবং বর্ণনাভঙ্গিও ছিল সেই মানের। তিনি যে মানের ফসাহত এবং বালাগতের ব্যবহার করেছেন তাঁর বর্ণনায়, সেটা বোঝবার জন্য মোটামুটি মানের পাঠক তো হওয়া লাগবে। অন্যদের যে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবার জন্য এক পৃষ্ঠা লিখতে হয়, তিনি সেটা একটিমাত্র শব্দেই ব্যাখ্যা করে দিতে পারতেন। আলোচনারত মাসআলাটিতেও তাই হয়েছে।

لو رعف فكتب الفاتحة بالدم على جبهته وأنفه جاز للاستشفاء ، وبالبول أيضا إن علم فيه شفاء لا بأس به ، لكن لم ينقل

কেউ যদি কনফার্ম হয়ে যায় এটাই তার একমাত্র চিকিৎসা, এছাড়া আর কোনো চিকিৎসা নেই, তাহলে সুরায়ে ফাতেহা দ্বারা এই চিকিৎসা করা যাবে, তবে لكن لم ينقل। আহলে হাদিস ফিরকা যদি এই لكن لم ينقل এর মানেটা বুঝতো, তাহলে আপত্তি তুলে নিজেদের মুর্খতার জানান দিতো না।

শামি বলছে, ইসতেশফার ব্যাপারে কনফার্ম হলে সমস্যা ছিল না; কিন্তু এমন কিছু কুরআন হাদিসেও নেই!

মানে কী?

মানে হলো, চিকিৎসার জন্য সুরায়ে ফাতেহাকে রক্ত বা পেশাব দিয়ে লিখলে রুগি সুস্থ হবে কি না—এটা কনফার্ম হলে এভাবে লেখা জায়েজ হতে পারে। কনফার্মেশনের উপায় হল তিনটি।

১. বিবেক খাটিয়ে জানা।
২. মেডিকেল সাইন্স থেকে জানা।
৩. অথবা কুরআন হাদিসে বর্ণনা থাকা।

সুরায়ে ফাতেহা দিয়ে এই পর্যায়ের চিকিৎসা করা হলে সুস্থ হওয়া কনফার্ম কি না—এটা বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে জানার কোনো সুযোগ নাই। কারণ, এটা বুদ্ধি খাটিয়ে বোঝার মতো বিষয় নয়।

চিকিৎসা বিজ্ঞান দোয়া-দুরুদ বা আমলিয়াতে বিশ্বাসই করে না। বিজ্ঞানের উপকরণ হলো ওষুধ বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা।

তাহলে বাকি থাকে শুধু শরয়ী দলিল। অর্থাৎ, কুরআনে কারিম বা হাদিসেপাকে এ ব্যাপারে কোনো ইনস্ট্রাকশন থাকা। শামি বলছে, লাকিন লাম য়্যুনকাল, এ বিষয়ে কুরআন হাদিসে কিছু বলা নেই।

তাহলে কথা কী দাঁড়ালো? যদি কনফার্ম হওয়া যায়, তাহলে জায়েজ। যেহেতু কনফার্মেশনের কোনো সম্ভাবনাই নাই, সুতরাং…
… সুতরাং শামি জায়েজ বলছে বোঝা গেলো??

#_এখন_প্রশ্নহল_কেন_তারা_প্রশ্ন_ওঠায় ……… জানা যাবে আগামী কাল, ইনশাআল্লাহ।
.
হুমুল্লাজিনা
পৃষ্ঠাঃ ৪৭- ৬৩ (সংক্ষেপিত)
প্রথম প্রকাশঃ একুশের বইমেলা ২০১৯
প্রকাশকঃ কালান্তর প্রকাশনী
================
======================
‘নতুন যোগির তাথে ওঠা’ বলে একটা কথা আছে। অদ্য-পণ্ডিতরা তাদের নাগালের বাইরের বিষয় নিয়ে নতুন করে লাফালাফি করতে চাচ্ছে, অথচ এই কাজ তাদের বাপ-দাদারা তাদের জন্মের আগেই করে দেখেছেন। লাভ হয়নি। আমাদের বাপ-দাদারা সেগুলোর চোয়ালভাঙা জবাব ছুড়ে মেরেছেন তাদের মুখে। সুতরাং, নতুন করে পাথরে মাথা টোকার চেষ্টা মনেহয় না করাই ভালো।

শেয়ার করে ছড়িয়ে দিন